আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে জয়পুরহাটের পরিত্যাক্ত হাঁসের পালক
বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ১২ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০১ পিএম
জয়পুরহাট প্রতিনিধি: আব্দুল কাদের
জয়পুরহাটে ফেলে দেওয়া হাঁসের পালক হয়ে উঠেছে বৈদেশিক বাণিজ্যের পণ্য। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সংগ্রহ করা পালক নানা প্রক্রিয়ায় বাছাই ও পরিশোধন করে রপ্তানি করা হচ্ছে চীন, ভিয়েতনাম, তাইওয়ান ও ভারতসহ বিভিন্ন দেশে।
সেখানে এসব পালক ব্যবহার করে তৈরি হচ্ছে জ্যাকেট, কম্বল, চাদর, বালিশ ও ব্যাডমিন্টনের ফেদারের ককসহ বিভিন্ন পণ্য। এমন উদ্যোগে কর্মসংস্থান হয়েছে দরিদ্র-অসহায় নারীসহ বেকার যুবকদের। এ বিষয়ে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগ।
জানা গেছে, একসময় হাঁসের মাংস সংগ্রহের পর ফেলে দেওয়া হতো পালক। সেই পরিত্যক্ত পালকই জয়পুরহাটে খুলে দিয়েছে সম্ভাবনার দুয়ার। ২০১৪ সালে হাঁসের পালক নিয়ে কাজ শুরু করেন শেরপুর জেলার বাসিন্দা তরুণ উদ্যোক্তা আলতাব হোসেন।
সে সময় সফলতা না পেয়ে ২০১৫ সালে চীনে চলে যান। সেখানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করে পালক নিয়ে একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন এক বছর। ২০২২ সালে চীন থেকে অত্যাধুনিক মেশিন নিয়ে দেশে আসেন।
এরপর জয়পুরহাটের আক্কেলপুর উপজেলায় তিলকপুর বাজারে কয়েকজনের সহযোগিতায় প্রায় ৪ কোটি টাকা ব্যয়ে তৈরি করেন পালক প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা।
যার নাম দিয়েছেন ‘সারাবাংলা ডাউন প্রোডাক্ট’। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে প্রতিমাসে ২৫ থেকে ৩০ টন পালক সংগ্রহ করে এখানে নিয়ে আসা হয়। এরপর রোদে শুকিয়ে বাছাই ও অত্যাধুনিক মেশিনে নানা প্রক্রিয়ায় প্রস্তুত করে পাঠানো হচ্ছে চীন, ভিয়েতনাম, তাইওয়ান ও ভারতসহ বিভিন্ন দেশে।
আর সেখানেই এসব পালক ব্যবহার করে তৈরি হচ্ছে জ্যাকেট, কম্বল, চাদর, বালিশ, জাহাজের সোফা, ব্যাডমিন্টনের ফেদারের কক ও শীতের বিভিন্ন পোশাকসহ নানা ধরনের পণ্য। এই উদ্যোগের মাধ্যমে এখানে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে দরিদ্র-অসহায় নারীসহ বেকার যুবকদের।
নারী শ্রমিক মীম খাতুন বলেন, ‘পালকগুলো নিয়ে আসার পর রোদে দিই। এরপর বস্তায় করে কারখানায় পাঠাই। এখান থেকে যে টাকা পাই তা দিয়ে সংসার চালানোর পাশাপাশি আমার ছেলেমেয়ের পড়াশোনার খরচ চালাই।’
সামেনা বেগম নামে একজন বলেন, ‘আমার পরিবারে ৮ জন সদস্য। আমার স্বামী মারা গেছে ৮ বছর আগে। স্বামী মারা যাওয়ার পর পরিবার চালাতে অনেক কষ্ট হতো। পরে এই কারখানা হওয়ার পর এখানে কাজ পাই। প্রতিমাসে ১০ হাজার টাকা বেতন পাই। ওভারটাইম করলে আরও বেশি হয়। এখন আমার পরিবার ভালো চলে।’
কারখানার ম্যানেজার সোহেল রানা বলেন, ‘সারা দেশ থেকে হাঁসের পালক সংগ্রহ করি। পালকগুলো একটু ভেজার মতো থাকায় এখানে নিয়ে আসার পর প্রথমে রোদে শুকাতে হয়। এরপর বস্তায় করে নিয়ে এসে মেশিনে দেওয়া হয়। তারপর কয়েকটি প্রক্রিয়া শেষে পালক প্রস্তুত করা হয়।
ছোট পালক দিয়ে জ্যাকেট, কম্বল, জাহাজের সোফা, চাদর, বালিশসহ শীতের বিভিন্ন পোশাক তৈরি হয়। আর পাখার পালক দিয়ে কক তৈরি হয়। এগুলো বিদেশে পাঠানো হয়। আমাদের এখানে ১৬ জন শ্রমিক কাজ করেন।’
উদ্যোক্তা আলতাব হোসেন বলেন, ‘২০১৪ সালে ছোট পরিসরে হাঁসের পালক নিয়ে কাজ করি। কিন্তু বিষয়টি ভালোভাবে বুঝতে না পেরে আমি লাভবান হতে পারিনি।
এরপর আমি স্কলারশিপ নিয়ে চীনে গিয়ে পড়াশোনা শেষ করে পালক নিয়ে একটি প্রতিষ্ঠানে ১ বছর কাজ করি। ছোট থেকেই আমার ইচ্ছা ছিল আমি ব্যবসা করব। এরপর চীন থেকে মেশিন নিয়ে এসে ২০২২ সালে জয়পুরহাটের তিলকপুরে কারখানা শুরু করি। যার এক বছর পর থেকে আমি সফলতা পাচ্ছি। এই পালক চীন, ভিয়েতনাম, তাইওয়ান ও ভারতে পাঠাচ্ছি। যেসব দেশে শীত বেশি, সেখানে এর চাহিদা অনেক।’
তিনি আরও বলেন, আমার এই কারখানা করতে ৪ থেকে ৫ কোটি টাকা খরচ হয়েছে। আমরা যদি এই পালক থেকে দেশেই এসব পণ্য তৈরি করতে পারি, তাহলে বিদেশে রপ্তানি করে আরও টাকা আয় করা সম্ভব হবে। কিন্তু এর পূর্ণাঙ্গ সেটাপ করতে প্রায় ১৫ কোটি টাকা প্রয়োজন। সরকার যদি আমাদের সহযোগিতা করে বা স্বল্প সুদে ঋণ দেয়, তাহলে সম্ভব হবে এমন উদ্যোগ নেওয়ার।
জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের ট্রেনিং অফিসার কল্পনা রানী রায় জানান, ‘একসময় যে পালক ফেলে দেওয়া হতো, সেই পালক সারা দেশ থেকে সংগ্রহ করে এখানে প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাছাই করে বিদেশে পাঠানো হচ্ছে।
ফেলে দেওয়া পালক অনেক সম্ভাবনাময় একটা পণ্য হয়ে উঠেছে। আমরা প্রাণিসম্পদ দপ্তর থেকে ওই কারখানা ভিজিট করেছি। আমরা তাদের বিভিন্ন শর্ত পূরণ করতে বলেছি, তাহলে সরকার থেকে পদকের জন্য নাম পাঠানো হবে।
এ ছাড়া তাদের বিভিন্ন কারিগরি পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি এখানে যদি বিনিয়োগ বাড়ে, তাহলে পালক থেকে এখানেই সব পণ্য তৈরি করা সম্ভব হবে। এতে করে যেমন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, তেমন বৈদেশিক মুদ্রা আয় হবে।’