সংঘাতের প্রভাব যুদ্ধক্ষেত্র ছাড়িয়ে জ্বালানি, খাদ্য, পরিবহন ও বিশ্ব অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ছে; সবচেয়ে বেশি চাপে দরিদ্র জনগোষ্ঠী

যুদ্ধের বিস্তার ও বৈশ্বিক বৈষম্য নিয়ে সতর্কবার্তা জাতিসংঘ মহাসচিবের

বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক

প্রকাশ: ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ১২:২৭ এএম

বিশেষ প্রতিনিধিঃ সঞ্জয় মজুমদার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬

বিশ্বজুড়ে চলমান যুদ্ধের বিস্তার, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক বৈষম্য নিয়ে সতর্ক করেছেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। ২২ অক্টোবর নিউইয়র্কে সাংবাদিকদের সঙ্গে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বৈষম্য মোকাবিলা করতে হবে এবং যুদ্ধের বিস্তার ঠেকাতে হবে, যাতে বিশ্ব আরও নিরাপদ হয়। মধ্যপ্রাচ্য, ইউক্রেন ও সুদানের সংঘাতের প্রভাব যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরে জ্বালানি বাজার, নৌপরিবহন, সরবরাহব্যবস্থা ও আর্থিক খাতেও ছড়িয়ে পড়ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

জাতিসংঘের প্রকাশিত বক্তব্য অনুযায়ী, ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে মানুষের অসন্তোষ বাড়ছে। খাদ্য, জ্বালানি ও অন্যান্য মৌলিক পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। সুদের হার বেড়ে যাওয়ায় ব্যক্তি ও রাষ্ট্র উভয়ের ঋণের ব্যয়ও বাড়ছে। বিশেষ করে তরুণদের জন্য উন্নত ভবিষ্যৎ গড়ার সুযোগ ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে বলে মন্তব্য করেন গুতেরেস।

তিনি বলেন, বিক্ষোভের সময় সহিংসতা ও ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড গ্রহণযোগ্য নয় এবং অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। তবে সহিংসতার নিন্দা করতে গিয়ে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের বাস্তব ও ন্যায্য অভিযোগ উপেক্ষা করা উচিত নয়। তাঁর মতে, মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে অসন্তোষকে বিশ্বজুড়ে চলমান অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতার সঙ্গে মিলিয়ে বুঝতে হবে।

যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে জাতিসংঘ মহাসচিব বলেন, সংঘাতের ক্ষতি কেবল যুদ্ধরত দেশগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন, নৌপথে অনিশ্চয়তা এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থায় চাপের কারণে দূরবর্তী দেশগুলোর বাজারেও এর প্রভাব পড়ে। মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা বাড়লে জ্বালানি পরিবহন ও বাণিজ্যের ব্যয় বেড়ে যেতে পারে, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তার ওপর পড়ে।

গুতেরেস মধ্যপ্রাচ্য, ইউক্রেন ও সুদানের পরিস্থিতি উল্লেখ করে বলেন, এসব সংঘাতে বেসামরিক মানুষ ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বাড়িঘর, হাসপাতাল, বিদ্যালয়, বিমানবন্দর, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও জ্বালানি স্থাপনায় হামলার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। আন্তর্জাতিক মানবিক আইন অনুযায়ী বেসামরিক মানুষ ও বেসামরিক স্থাপনার ওপর হামলা নিষিদ্ধ উল্লেখ করে তিনি এসব হামলা বন্ধের আহ্বান জানান।

জাতিসংঘ মহাসচিবের বক্তব্যে বৈশ্বিক বৈষম্যের বিষয়টিও বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। তাঁর মতে, অর্থনৈতিক ধাক্কা এমন এক বিশ্বে আঘাত হানছে, যেখানে সব দেশ ও পরিবারের সংকট মোকাবিলার সামর্থ্য সমান নয়। উচ্চ আয়ের ব্যক্তি ও দেশ বাড়তি ব্যয় সামাল দিতে তুলনামূলকভাবে সক্ষম হলেও দরিদ্র পরিবারকে খাদ্যসহ মৌলিক চাহিদা পূরণে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়। একইভাবে, কিছু দেশ কম সুদে ঋণ নিয়ে অর্থনীতি ও জনকল্যাণমূলক খাতকে সহায়তা করতে পারে; অন্যদিকে ঋণগ্রস্ত উন্নয়নশীল দেশগুলোকে ঋণ পরিশোধ এবং স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও উন্নয়নে ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে হয়।

গুতেরেসের মতে, যুদ্ধ বৈশ্বিক বৈষম্যের একমাত্র কারণ নয়, তবে এটি বিদ্যমান বৈষম্যকে আরও বাড়িয়ে দেয় এবং দুর্বল জনগোষ্ঠীকে বেশি ঝুঁকির মুখে ফেলে। ফলে সংঘাত বন্ধের কূটনৈতিক উদ্যোগের পাশাপাশি অর্থনৈতিক সুযোগের অসমতা কমানো এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য ন্যায্য অর্থায়নের সুযোগ বাড়ানোও জরুরি।

বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য এ পরিস্থিতি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বা পরিবহন ব্যয় বাড়লে দেশের আমদানি ব্যয়, উৎপাদন খরচ এবং পণ্যের বাজারদরের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা রপ্তানি বাণিজ্য, বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ এবং প্রবাসী কর্মীদের কর্মসংস্থানের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। তবে এসব প্রভাবের মাত্রা নির্ভর করবে সংঘাতের বিস্তার, আন্তর্জাতিক বাজারের প্রতিক্রিয়া এবং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার ওপর।

বিশেষ করে জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের আন্তর্জাতিক সরবরাহে বিঘ্ন দেখা দিলে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো তুলনামূলকভাবে বেশি চাপে পড়তে পারে। এ অবস্থায় আমদানি ব্যয় ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারদর পর্যবেক্ষণ, সরবরাহব্যবস্থা সচল রাখা এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য কার্যকর সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা নীতিনির্ধারকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

জাতিসংঘ মহাসচিবের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, যুদ্ধ, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও বৈষম্যকে আলাদা সমস্যা হিসেবে দেখলে সংকটের পূর্ণ চিত্র বোঝা কঠিন। সংঘাতের বিস্তার রোধে কূটনৈতিক উদ্যোগ, আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলা এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনৈতিক চাপ কমাতে কার্যকর সহযোগিতা প্রয়োজন। এসব ক্ষেত্রে অগ্রগতি না হলে যুদ্ধের সরাসরি ক্ষতির বাইরেও বিশ্বজুড়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বাড়তে পারে।

যোগাযোগের ঠিকানা:

বাংলাদেশ বার্তা টুডে

৫৬, চানখারপুল লেন, নাজিমুদ্দিন রোড, বংশাল, ঢাকা-১১০০

ইমেইল: info@bangladeshbartatoday.com