সিঁদুর খেলায় বিদায়ের আবহ, বিসর্জনে শেষ হচ্ছে চট্টগ্রামের শারদীয় দুর্গোৎসব
বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০১:৫২ পিএম
চট্টগ্রাম থেকে বিশেষ প্রতিনিধি মোহাম্মদ হাসান:
ঢাকের বাদ্য, শঙ্খধ্বনি আর উলুধ্বনিতে মুখর পূজামণ্ডপ। পাঁচ দিনের আনন্দোৎসবের শেষলগ্নে আজ বিজয়া দশমী। সিঁদুর খেলা, দেবীবরণ ও নানা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে দেবী দুর্গাকে বিদায় জানাতে প্রস্তুত সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে শারদীয় দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিকতা।
ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী, বিজয়া দশমীতে দেবীর বিদায়কালীন পূজা, দর্পণ বিসর্জন ও অপরাজিতা পূজা অনুষ্ঠিত হয়। দশ উপচারে বিহিত পূজা শেষে ভক্তরা দেবীর চরণে পুষ্পাঞ্জলি নিবেদন করেন। এরপর আয়নায় দেবীর প্রতিবিম্ব দর্শনের মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয় দর্পণ বিসর্জনের আনুষ্ঠানিকতা।
দেবীকে বিদায় জানানোর আগে বিভিন্ন পূজামণ্ডপে বিবাহিত নারীরা সিঁদুর খেলায় অংশ নেন। সিঁদুর, পান-সুপারি, ধান-দূর্বা ও মিষ্টি দিয়ে দেবীকে বরণ করার পর একে অপরের কপালে সিঁদুর পরিয়ে উৎসবের আনন্দ ভাগাভাগি করেন তাঁরা। সনাতন ধর্মীয় বিশ্বাসে সধবা নারীদের কাছে এ রীতি সৌভাগ্য ও দীর্ঘায়ুর প্রতীক হিসেবে বিবেচিত।
সম্প্রীতি ও শুভশক্তির জয়ের বার্তা
শাস্ত্রীয় পঞ্জিকা ও সনাতন ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, এ বছর দেবী দুর্গার মর্ত্যে আগমন হয়েছে ঘোটকে বা ঘোড়ায় এবং কৈলাসে গমন হবে নৌকায়।
চেরাগী পাহাড় পূজামণ্ডপের পুরোহিত মানু রঞ্জন ভট্টাচার্য বলেন, “বিজয়া দশমী অশুভ শক্তির বিনাশ এবং শুভ শক্তির জয়ের বার্তা নিয়ে আসে। শারদীয় দুর্গোৎসব শুধু ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য, ভালোবাসা ও মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করার উৎসব।”
তিনি আরও বলেন, দেবী দুর্গার কাছে প্রার্থনা—পৃথিবী থেকে হিংসা, হানাহানি ও বিভেদ দূর হোক। সব ধর্মের মানুষ পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা নিয়ে একসঙ্গে বসবাস করুক।
চট্টগ্রামে ২ হাজার ৫৬৮ মণ্ডপে দুর্গাপূজা
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এ বছর চট্টগ্রাম মহানগরী ও জেলা মিলিয়ে মোট ২ হাজার ৫৬৮টি মণ্ডপে শারদীয় দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর মধ্যে মহানগরীতে প্রতিমা ও ঘট পূজাসহ ২৯৪টি মণ্ডপ রয়েছে। জেলার ১৬ উপজেলায় প্রতিমা পূজা হয়েছে ১ হাজার ৬৫৫টি মণ্ডপে এবং ঘট পূজা হয়েছে ৬১৯টি মণ্ডপে। এ বছর নতুন করে প্রায় ৪০০টি মণ্ডপ যুক্ত হয়েছে।
নগরীর চার স্থানে প্রতিমা বিসর্জন
বিজয়া দশমী উপলক্ষে চট্টগ্রাম মহানগরীর চারটি নির্ধারিত স্থানে প্রতিমা বিসর্জনের আয়োজন করা হয়েছে। স্থানগুলো হলো—পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত, ফিরিঙ্গিবাজারের অভয়মিত্র ঘাট, কালুরঘাট এবং উত্তর কাট্টলীর রানী রাসমণি ঘাট।
পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে বিকেল ৩টায় প্রতিমা বিসর্জন অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করার কথা রয়েছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনের।
কর্ণফুলী নদীর তীরে ফিরিঙ্গিবাজারের অভয়মিত্র ঘাটে পাথরঘাটা, ফিরিঙ্গিবাজার, কোতোয়ালী ও আশপাশের এলাকার প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হবে। চান্দগাঁও, মোহরা ও কালুরঘাট এলাকার প্রতিমা বিসর্জন হবে কালুরঘাটসংলগ্ন নদীতীরে। অন্যদিকে উত্তর কাট্টলী ও আশপাশের এলাকার প্রতিমা বিসর্জনের অন্যতম স্থান রানী রাসমণি ঘাট।
নগরীর বাইরে আনোয়ারার পারকি সমুদ্রসৈকত, সীতাকুণ্ড ও বাঁশখালীর উপকূলীয় এলাকা এবং পটিয়া ও বোয়ালখালীর বিভিন্ন নদী ও ঘাটে প্রতিমা বিসর্জনের আয়োজন রয়েছে।
নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলায় গুরুত্ব
বিজয়া দশমীর শোভাযাত্রায় প্রতিমা বিসর্জনস্থলে নিয়ে গিয়ে দেবী দুর্গাকে বিদায় জানাবেন ভক্তরা। উৎসবের আনন্দের পাশাপাশি থাকবে বিদায়ের আবেগও। বিসর্জন ঘিরে জনসমাগমের কারণে শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। নির্বিঘ্নে বিসর্জন সম্পন্ন করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুসরণের আহ্বান জানানো হয়েছে।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) পতেঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. পারভেজ বাংলানিউজকে বলেন, প্রতিবারের মতো এবারও পতেঙ্গায় প্রতিমা বিসর্জনের আয়োজন রয়েছে। ভক্তরা যাতে নির্বিঘ্নে প্রতিমা বিসর্জন দিতে পারেন, সে জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। কোনো ধরনের সমস্যা ছাড়াই বিসর্জন কার্যক্রম সম্পন্ন হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে এবারের শারদীয় দুর্গোৎসব। তবে উৎসবের আবহ পেরিয়ে বিজয়া দশমী রেখে যাবে সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য ও শুভশক্তির জয়ের প্রত্যাশা।