বিশ্ব অস্টিওপোরোসিস দিবস: নীরবে ক্ষয়ে যাচ্ছে হাড়, সচেতনতা কতটা?
বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ২০ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৪০ এএম
প্রতি বছর ২০ অক্টোবর পালিত হয় বিশ্ব অস্টিওপোরোসিস দিবস। হাড়ের স্বাস্থ্য সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, অস্টিওপোরোসিস বা হাড়ক্ষয় প্রতিরোধ এবং সময়মতো রোগ শনাক্তকরণে মানুষকে উৎসাহিত করাই দিবসটির মূল উদ্দেশ্য। ২০২৬ সালের প্রচারণার মূল বার্তা—জীবনের জন্য হাড় গড়ে তুলুন, সুরক্ষিত রাখুন এবং শক্তিশালী করুন। এই আহ্বান আমাদের মনে করিয়ে দেয়, হাড়ের যত্ন কেবল বার্ধক্যের বিষয় নয়; শৈশব থেকে জীবনের প্রতিটি পর্যায়েই এর গুরুত্ব রয়েছে।
মানবদেহের কাঠামো গঠন, চলাফেরা, ভারসাম্য রক্ষা এবং দৈনন্দিন কাজকর্মে হাড়ের ভূমিকা অপরিসীম। অথচ হাড়ের স্বাস্থ্য নিয়ে আমরা সাধারণত তখনই উদ্বিগ্ন হই, যখন সামান্য আঘাতে হাড় ভেঙে যায়, দীর্ঘদিনের পিঠব্যথা দেখা দেয় কিংবা স্বাভাবিক চলাফেরা ব্যাহত হয়। তার আগ পর্যন্ত হাড়ের ভেতরে যে ধীরে ধীরে ক্ষয় চলতে পারে, সে বিষয়ে অনেকেরই সচেতনতা থাকে না। এ কারণেই অস্টিওপোরোসিসকে বলা হয় ‘নীরব রোগ’।
বাংলাদেশেও হাড়ক্ষয় একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য উদ্বেগ। বাংলাদেশ অর্থোপেডিক সোসাইটির বরাতে প্রচারিত তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রায় ৬০ লাখ মানুষ এ রোগে আক্রান্ত। এই সংখ্যার জাতীয় পর্যায়ের ভিত্তি ও হালনাগাদ তথ্যসূত্র যাচাই করা প্রয়োজন হলেও, হাড়ের স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। বিশেষ করে নারীদের মধ্যে এ রোগের ঝুঁকি, মধ্যবয়সে হাড়ের ঘনত্ব কমে যাওয়া এবং হাড় ভাঙার পর দীর্ঘমেয়াদি জটিলতা—সবকিছুই বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার দাবি জানায়।
সমস্যাটি শুধু ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বয়স্ক মানুষের চলাফেরার স্বাধীনতা, পারিবারিক নির্ভরতা, চিকিৎসাব্যয় এবং সামগ্রিক জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে এর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। তাই বিশ্ব অস্টিওপোরোসিস দিবসের তাৎপর্য কেবল একটি দিবস পালন নয়; বরং হাড়ের স্বাস্থ্যকে ব্যক্তিগত সচেতনতা ও জনস্বাস্থ্য পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।
১. নীরব ক্ষয়, ভয়াবহ পরিণতি
অস্টিওপোরোসিস এমন একটি অবস্থা, যেখানে হাড়ের ঘনত্ব ও গঠনগত শক্তি কমে যায়। ফলে হাড় ভঙ্গুর হয়ে পড়ে এবং সামান্য পড়ে যাওয়া বা তুলনামূলক কম আঘাতেও ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। সাধারণত কবজি, কোমরের হাড় ও মেরুদণ্ডে এ ধরনের ভাঙন বেশি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
রোগটির সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো, প্রাথমিক পর্যায়ে অনেক সময় কোনো সুস্পষ্ট লক্ষণ দেখা যায় না। একজন মানুষ স্বাভাবিকভাবেই হাঁটাচলা ও দৈনন্দিন কাজ করতে পারেন, অথচ তাঁর হাড়ের শক্তি ক্রমেই কমতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে সামান্য পড়ে গিয়ে হাড় ভাঙার পরই অস্টিওপোরোসিসের বিষয়টি সামনে আসে।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এ রোগের ঝুঁকি বাড়ে। বিশেষ করে নারীদের মেনোপজ বা মাসিক স্থায়ীভাবে বন্ধ হওয়ার পর ইস্ট্রোজেন হরমোনের মাত্রা কমে যাওয়ায় হাড়ের ক্ষয় দ্রুত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তবে অস্টিওপোরোসিস কেবল নারীদের রোগ নয়; পুরুষেরাও এতে আক্রান্ত হন। বয়স্ক পুরুষদের পাশাপাশি কম বয়সী মানুষের মধ্যেও কিছু স্বাস্থ্যগত অবস্থা, পুষ্টির ঘাটতি কিংবা নির্দিষ্ট ওষুধের দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারের কারণে হাড় দুর্বল হয়ে যেতে পারে।
বাংলাদেশের নারীদের নিয়ে পরিচালিত একটি গবেষণায় উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। ১৬ থেকে ৪৫ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে ৫.৫ শতাংশের অস্টিওপোরোসিস এবং ৪৩.৬ শতাংশের অস্টিওপেনিয়া পাওয়া যায়। অন্যদিকে ৪৬ থেকে ৬৫ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে অস্টিওপোরোসিসের হার ছিল ৪১.৮ শতাংশ এবং অস্টিওপেনিয়ার হার ৪০.৭ শতাংশ। গবেষণাটি ঢাকার একটি তৃতীয় পর্যায়ের হাসপাতালের বহির্বিভাগে চিকিৎসাসেবা নিতে আসা ৫০০ নারীর ওপর পরিচালিত হয়েছিল। ফলে এসব হারকে দেশের সব নারীর ক্ষেত্রে সরাসরি প্রযোজ্য জাতীয় হার হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। তবে বয়স বাড়ার সঙ্গে হাড়ের ঘনত্ব কমে যাওয়ার ঝুঁকি সম্পর্কে এটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দেয়।
এখানে অস্টিওপোরোসিস ও অস্টিওপেনিয়ার পার্থক্য বোঝা জরুরি। অস্টিওপেনিয়া হলো হাড়ের ঘনত্ব স্বাভাবিকের চেয়ে কমে যাওয়ার একটি পর্যায়, যা অস্টিওপোরোসিসের তুলনায় কম গুরুতর। তবে এটি থাকলেই যে ভবিষ্যতে অস্টিওপোরোসিস হবে, তা নয়। ব্যক্তিগত ঝুঁকি ও অন্যান্য শারীরিক অবস্থার ভিত্তিতে চিকিৎসকের মূল্যায়ন প্রয়োজন।
দীর্ঘদিনের পিঠব্যথা, উচ্চতা কমে যাওয়া কিংবা মেরুদণ্ডের আকৃতিতে পরিবর্তন কখনো কখনো হাড়ের ভাঙন বা অস্টিওপোরোসিসের ইঙ্গিত দিতে পারে। তবে এসব লক্ষণ থাকলেই রোগটি নিশ্চিত হয় না। প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের মূল্যায়ন ও পরীক্ষা জরুরি।
একটি হাড় ভাঙা অনেক সময় দীর্ঘমেয়াদি দুর্ভোগের সূচনা করে। বিশেষত বয়স্ক ব্যক্তির কোমরের হাড় ভাঙলে অস্ত্রোপচার, পুনর্বাসন, দীর্ঘদিনের পরিচর্যা এবং স্বাভাবিক চলাফেরায় ফিরে আসার ক্ষেত্রে নানা জটিলতা দেখা দিতে পারে। কেউ কেউ আগের মতো স্বনির্ভর জীবনেও ফিরতে পারেন না। তাই হাড় ভাঙার পর চিকিৎসার পাশাপাশি ভবিষ্যতে আবার ভাঙন ঠেকানোর ব্যবস্থাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
২. হাড়ের স্বাস্থ্য রক্ষায় খাদ্য, ব্যায়াম ও জীবনযাপন
হাড়ের শক্তি গড়ে ওঠার ভিত্তি তৈরি হয় শৈশব ও কৈশোরে। এ সময় পর্যাপ্ত পুষ্টি, নিয়মিত শারীরিক কার্যকলাপ এবং সুস্থ জীবনযাপন ভবিষ্যতের হাড়ের স্বাস্থ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বয়স বাড়ার পরও এসব অভ্যাস হাড়ের শক্তি ও পেশির সক্ষমতা বজায় রাখতে সহায়তা করে।
হাড়ের স্বাস্থ্যের জন্য ক্যালসিয়াম, ভিটামিন ডি ও প্রোটিন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার, ছোট মাছ, শাকসবজি, ডাল, ডিম এবং অন্যান্য পুষ্টিকর খাবার সুষম খাদ্যতালিকার অংশ হতে পারে। তবে সব খাবারে ক্যালসিয়ামের পরিমাণ সমান নয়; ব্যক্তির বয়স, খাদ্যাভ্যাস ও শারীরিক অবস্থার ভিত্তিতে খাবার নির্বাচন করা প্রয়োজন।
ভিটামিন ডি শরীরে ক্যালসিয়াম শোষণে সহায়তা করে। সূর্যালোকের সংস্পর্শ, খাবার এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শে সাপ্লিমেন্টের মাধ্যমে এর ঘাটতি পূরণ করা যেতে পারে। কিন্তু নির্বিচারে উচ্চমাত্রার ভিটামিন ডি কিংবা ক্যালসিয়ামের বড়ি গ্রহণ নিরাপদ নয়। অতিরিক্ত সাপ্লিমেন্ট গ্রহণেরও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে। তাই কারও ঘাটতি রয়েছে কি না এবং তাঁর জন্য কী মাত্রা উপযুক্ত, তা চিকিৎসকের পরামর্শে নির্ধারণ করা উচিত।
হাড় ও পেশি শক্তিশালী রাখতে নিয়মিত ব্যায়ামের বিকল্প নেই। দ্রুত হাঁটা, সিঁড়ি বেয়ে ওঠা, উপযুক্ত প্রতিরোধমূলক ব্যায়াম এবং ভারসাম্য রক্ষার অনুশীলন উপকারী হতে পারে। ব্যায়াম শুধু হাড়ের স্বাস্থ্যে নয়, পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমাতেও সাহায্য করে। তবে যাঁদের অস্টিওপোরোসিস রয়েছে, আগে হাড় ভেঙেছে কিংবা ভারসাম্য রক্ষায় সমস্যা আছে, তাঁদের ব্যায়ামের ধরন ও তীব্রতা চিকিৎসক বা প্রশিক্ষিত ফিজিওথেরাপিস্টের পরামর্শে নির্ধারণ করা উচিত।
ধূমপান পরিহার, পর্যাপ্ত পুষ্টি গ্রহণ, অতিরিক্ত মদ্যপান থেকে বিরত থাকা এবং স্বাস্থ্যকর শরীরের ওজন বজায় রাখাও হাড়ের সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা হাড় ও পেশির সক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে বয়স ও শারীরিক সামর্থ্য অনুযায়ী নিয়মিত সক্রিয় থাকা দীর্ঘমেয়াদে উপকার বয়ে আনে।
অর্থাৎ হাড়ের স্বাস্থ্য রক্ষায় কোনো একটি খাবার, বড়ি কিংবা ব্যায়ামের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। প্রয়োজন সুষম খাদ্য, নিয়মিত শরীরচর্চা, ক্ষতিকর অভ্যাস পরিহার এবং ব্যক্তিগত ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতার সমন্বিত চর্চা।
৩. ঝুঁকি শনাক্তকরণ ও সময়মতো চিকিৎসা
অস্টিওপোরোসিস প্রতিরোধের প্রথম ধাপ হলো নিজের ঝুঁকি সম্পর্কে জানা। বয়স, মেনোপজ, পারিবারিক ইতিহাস, পূর্বে সামান্য আঘাতে হাড় ভাঙার ঘটনা, কম ওজন, দীর্ঘদিনের শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা এবং কিছু দীর্ঘস্থায়ী রোগ হাড়ের ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
রিউম্যাটয়েড আর্থ্রাইটিস, কিছু হরমোনজনিত সমস্যা, দীর্ঘস্থায়ী কিডনি বা লিভারের রোগ এবং পুষ্টি শোষণে বাধা সৃষ্টি করে এমন কিছু রোগও হাড়ের স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলতে পারে। দীর্ঘদিন কর্টিকোস্টেরয়েডসহ নির্দিষ্ট কিছু ওষুধ ব্যবহারেও হাড় দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধ বন্ধ করা উচিত নয়। বরং ওষুধের সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করা প্রয়োজন।
অস্টিওপোরোসিসের ঝুঁকি মূল্যায়নে চিকিৎসক রোগীর বয়স, চিকিৎসার ইতিহাস, পারিবারিক ইতিহাস, পূর্ববর্তী হাড় ভাঙার ঘটনা এবং অন্যান্য ঝুঁকির বিষয় বিবেচনা করেন। প্রয়োজন অনুযায়ী হাড়ের ঘনত্ব পরিমাপের পরীক্ষা, বিশেষ করে ডিএক্সএ (DXA) স্ক্যান, করার পরামর্শ দেওয়া হতে পারে। কার পরীক্ষা প্রয়োজন, তা ব্যক্তির ঝুঁকি ও চিকিৎসাগত পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে।
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা জরুরি—সামান্য পড়ে গিয়ে হাড় ভেঙে গেলে সেটিকে শুধু দুর্ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করে থেমে থাকা ঠিক নয়। বিশেষত বয়স্ক ব্যক্তির কবজি, কোমর বা মেরুদণ্ডে এমন ভাঙন হলে হাড়ের স্বাস্থ্য মূল্যায়নের প্রয়োজন আছে কি না, তা চিকিৎসকের কাছে জানতে হবে। কারণ প্রথম ভাঙনের পর ভবিষ্যতে আরেকটি ভাঙনের ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে।
অস্টিওপোরোসিস শনাক্ত হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ, পুষ্টি, উপযুক্ত ব্যায়াম এবং পড়ে যাওয়া প্রতিরোধের ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। চিকিৎসার উদ্দেশ্য শুধু হাড়ের ঘনত্ব বাড়ানো নয়; হাড় ভাঙার ঝুঁকি কমানো এবং মানুষের স্বাভাবিক চলাফেরা ও স্বাধীনতা বজায় রাখাও এর গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য।
চিকিৎসা শুরু করার পর নিয়মিত ফলোআপ প্রয়োজন। এতে চিকিৎসার কার্যকারিতা, সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, নতুন কোনো ঝুঁকি এবং চিকিৎসা পরিকল্পনায় পরিবর্তনের প্রয়োজন রয়েছে কি না, তা মূল্যায়ন করা যায়। হাড় ভাঙার পর প্রাথমিক চিকিৎসা সম্পন্ন হলেও ভবিষ্যতের ঝুঁকি মোকাবিলায় ধারাবাহিক পরিচর্যা গুরুত্বপূর্ণ।
৪. পরিবার থেকে রাষ্ট্র—সচেতনতাই হোক প্রতিরোধের ভিত্তি
বাংলাদেশে অস্টিওপোরোসিস মোকাবিলায় ব্যক্তিগত সচেতনতার পাশাপাশি পরিবার, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্রের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। রোগটি অনেক সময় নীরবে অগ্রসর হয়, কিন্তু এর পরিণতি পরিবার ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
বাংলাদেশ অর্থোপেডিক সোসাইটির বরাতে প্রচারিত তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রায় ৬০ লাখ মানুষ হাড়ক্ষয় রোগে ভুগছেন বলে ধারণা করা হয়। এ সংখ্যাকে মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩ শতাংশ হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে। তবে জাতীয় পর্যায়ের এই অনুমানের ভিত্তি, তথ্য সংগ্রহের সময়কাল এবং রোগ নির্ণয়ের পদ্ধতি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশের আগে যাচাই করা প্রয়োজন। নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান ছাড়া রোগের প্রকৃত ব্যাপ্তি নির্ধারণ কঠিন হলেও, বয়সজনিত হাড়ের ক্ষয় ও ভঙ্গুরতাজনিত হাড় ভাঙন প্রতিরোধকে জনস্বাস্থ্য আলোচনায় গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
নারীদের মধ্যে ঝুঁকি বেশি হওয়ার পেছনে মেনোপজ-পরবর্তী হরমোনের পরিবর্তন একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। তবে পুষ্টির ঘাটতি, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, কম ওজন এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যগত সমস্যাও বিবেচনায় নিতে হবে। আক্রান্তদের মধ্যে নারীর অনুপাত সম্পর্কে প্রচারিত পরিসংখ্যানকে জাতীয় পর্যায়ের নিশ্চিত হার হিসেবে উপস্থাপনের আগে তার মূল উৎস ও গবেষণার পরিধি যাচাই করা প্রয়োজন।
পরিবারের বয়স্ক সদস্যদের চলাফেরার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রতিরোধের একটি বাস্তব পদক্ষেপ। ঘরের মেঝেতে আলগা কার্পেট বা পিচ্ছিল বস্তু সরিয়ে রাখা, চলাচলের পথ পরিষ্কার রাখা, সিঁড়ি ও বাথরুমে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী হাতল ও পিচ্ছিলরোধী পৃষ্ঠ ব্যবহার করা উচিত। দৃষ্টিশক্তির সমস্যা, মাথা ঘোরা কিংবা ওষুধের কারণে তন্দ্রা ও ভারসাম্যহীনতা তৈরি হচ্ছে কি না, সেটিও খেয়াল রাখা দরকার।
একই সঙ্গে গণসচেতনতা কার্যক্রমে হাড়ের স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দিতে হবে। স্কুল, কর্মক্ষেত্র, স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও সামাজিক সংগঠনের উদ্যোগে পুষ্টি, ব্যায়াম, ঝুঁকি শনাক্তকরণ এবং পড়ে যাওয়া প্রতিরোধ নিয়ে আলোচনা হতে পারে। চিকিৎসকদের পরামর্শে ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও চিকিৎসার সুযোগ বাড়ানোও জরুরি।
অস্টিওপোরোসিস ভবিষ্যতে বাংলাদেশের অসংক্রামক রোগের বোঝা আরও বাড়াতে পারে—এমন আশঙ্কাকে গুরুত্ব দিয়ে প্রতিরোধমূলক উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। তবে রোগটি আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে অসংক্রামক রোগগুলোর শীর্ষ পাঁচে উঠে আসবে—এ ধরনের পূর্বাভাসকে নিশ্চিত ভবিষ্যৎ হিসেবে তুলে ধরতে হলে তার পক্ষে নির্ভরযোগ্য গবেষণা বা বিশেষজ্ঞদের প্রকাশিত মূল্যায়ন থাকা দরকার।
জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থায় অস্টিওপোরোসিসকে গুরুত্ব দেওয়ার অর্থ হলো, শুধু হাড় ভাঙার পর চিকিৎসা নিশ্চিত করা নয়; বরং ভাঙন ঘটার আগেই ঝুঁকি শনাক্ত ও প্রতিরোধের সুযোগ তৈরি করা। প্রাথমিক মূল্যায়ন, প্রয়োজনীয় পরীক্ষার সহজলভ্যতা, রোগীকে চিকিৎসা সম্পর্কে যথাযথ তথ্য দেওয়া এবং চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে পরামর্শ—এসব উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে মানুষের জীবনমান রক্ষায় সহায়ক হতে পারে।
বিশ্ব অস্টিওপোরোসিস দিবসে তাই আমাদের অঙ্গীকার হওয়া উচিত—হাড়ের স্বাস্থ্যকে অবহেলা নয়, দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করা। বয়স বাড়লে হাড় দুর্বল হওয়াকে অনিবার্য পরিণতি ভেবে বসে থাকার সুযোগ নেই। সঠিক পুষ্টি, উপযুক্ত ব্যায়াম, ঝুঁকি মূল্যায়ন, সময়মতো চিকিৎসা এবং নিরাপদ পরিবেশের মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রেই হাড় ভাঙার ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
শেষ পর্যন্ত, হাড়ের ক্ষয় নীরবে ঘটলেও এর পরিণতি নীরব থাকে না। একটি ভাঙা হাড় মানুষের চলাফেরা, আত্মনির্ভরতা ও পারিবারিক জীবনে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে। তাই প্রথম ভাঙনের জন্য অপেক্ষা না করে আজ থেকেই হাড়ের যত্ন নেওয়া প্রয়োজন। কারণ শক্তিশালী হাড় শুধু সুস্থ শরীরের ভিত্তি নয়, সুস্থ, সক্রিয় ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনেরও অন্যতম শর্ত।
বিশ্ব অস্টিওপোরোসিস দিবস আমাদের সেই কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়—হাড় গড়ার সময় শৈশব, হাড় রক্ষার সময় সারাজীবন, আর সচেতন হওয়ার সময় এখনই।
লেখক: মোহাম্মদ হাসান, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।