একতারা-দোতারার সুরে মাতোয়ারা ছেঁউড়িয়া, দ্বিতীয় দিনে চলছে লালন স্মরণোৎসব
বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৪৬ পিএম
তানভীর আজাদ, কুষ্টিয়া প্রতিনিধি :
কুষ্টিয়ার কুমারখালীর ছেঁউড়িয়ায় বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহের ১৩৬তম তিরোধান দিবস উপলক্ষে আয়োজিত তিন দিনব্যাপী স্মরণোৎসবের দ্বিতীয় দিনে সাধু, বাউল, ভক্ত ও দর্শনার্থীদের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠেছে লালন আখড়াবাড়ি। রোববার (১৮ অক্টোবর) দেশের বিভিন্ন প্রান্ত ও বিদেশ থেকে আসা হাজারো মানুষের উপস্থিতিতে উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়েছে পুরো ছেঁউড়িয়া এলাকায়।
সরেজমিনে দেখা যায়, আখড়াবাড়ি প্রাঙ্গণে একতারা, দোতারা ও ঢোলের তালে তালে বাউল সাধকদের কণ্ঠে পরিবেশিত হচ্ছে লালন সাঁইয়ের মরমি গান। মূল মঞ্চের পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানে চলছে সাধুসঙ্গ, ভাবসাধনা ও ঐতিহ্যবাহী আচার-অনুষ্ঠান। লালনের মানবতাবাদী দর্শন ও অসাম্প্রদায়িক চেতনায় একত্র হয়েছেন নানা বয়স ও শ্রেণি-পেশার মানুষ।
উৎসবের দ্বিতীয় দিন সকালে অনুষ্ঠিত হয় ‘বাল্যসেবা’। দুপুরে বিশেষ খিলাফত গ্রহণের মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয় ‘পূর্ণসেবা’। এসব ধর্মীয় ও ঐতিহ্যবাহী রীতির মাধ্যমে শিষ্যত্ব প্রদান এবং লালন সাঁইয়ের মানবপ্রেম, সাম্য ও সম্প্রীতির দর্শন ছড়িয়ে দেওয়ার প্রয়াস চলে।
আলোচনা সভায় লালন দর্শনের গুরুত্ব তুলে ধরেন বক্তারা
স্মরণোৎসবের দ্বিতীয় দিনে লালন আখড়াবাড়ির মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় বর্ণাঢ্য আলোচনা সভা। এতে সভাপতিত্ব করেন কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক ও লালন একাডেমির সভাপতি মো. তৌহিদ বিন-হাসান। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন খুলনা বিভাগের বিভাগীয় কমিশনার (অতিরিক্ত সচিব) মো. আবদুল্লাহ হারুন। গেস্ট অব অনার হিসেবে বক্তব্য দেন বিশিষ্ট কবি, লেখক ও চিন্তক ফরহাদ মজহার।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন খুলনা রেঞ্জের ডিআইজি মো. রেজাউল করিম, কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার মো. আমিনুল ইসলাম, ৪৭ বিজিবি কুষ্টিয়ার অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল রাশেদ কামাল রনি (পিএসসি), কুষ্টিয়া জেলা পরিষদের প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা সোহরাব উদ্দিন এবং কুষ্টিয়া জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কুতুব উদ্দিন আহমেদ।
মুখ্য আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন প্রাবন্ধিক অধ্যাপক ড. শেখ খালিদ হাসান। স্বাগত বক্তব্য দেন কুমারখালী উপজেলার ভারপ্রাপ্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাভিদ সারওয়ার।
আলোচনায় বক্তারা লালনের মানবধর্ম, জাতপাত ও ধর্মীয় বিভেদের ঊর্ধ্বে মানুষের আত্মিক পরিচয় এবং সমকালীন বিশ্বে লালন দর্শনের প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। তাঁরা লালনের গান ও দর্শনের মধ্য দিয়ে মানবিক মূল্যবোধ, সাম্য, সহনশীলতা এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনা বিকাশের গুরুত্ব তুলে ধরেন।
রাতভর লালনগীতি, বসেছে ঐতিহ্যবাহী লোকজ মেলা
আলোচনা সভা শেষে মূল মঞ্চে শুরু হয় লালনগীতি ও মরমি সংগীতানুষ্ঠান। লালন একাডেমি ও দেশের বরেণ্য শিল্পীদের পরিবেশনায় রাতভর চলে সংগীতের আয়োজন। এতে অংশ নেন টুনটুন বাউল, সুনীল কর্মকার, রওশন ফকির ও লতিফ শাহসহ দেশের পরিচিত লালনশিল্পীরা।
অন্যদিকে, আখড়াবাড়ির মূল মঞ্চের বাইরে কালী নদীর তীর ঘেঁষে বসেছে ঐতিহ্যবাহী লোকজ মেলা। মেলার বিভিন্ন স্টলে রয়েছে গ্রামীণ তৈজসপত্র, একতারা ও ডুগডুগির মতো লোকজ বাদ্যযন্ত্র, লালনবিষয়ক বই এবং বিভিন্ন লোকশিল্পসামগ্রী। দর্শনার্থীদের পদচারণায় মেলাপ্রাঙ্গণও হয়ে উঠেছে প্রাণবন্ত।
নিরাপত্তায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিশেষ ব্যবস্থা
স্মরণোৎসব ও মেলাকে ঘিরে আখড়াবাড়ি এবং আশপাশের এলাকায় নেওয়া হয়েছে কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা। সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্য মোতায়েনের পাশাপাশি র্যাব-১২-এর বিশেষ কন্ট্রোল রুম স্থাপন করা হয়েছে।
তিন দিনব্যাপী এ স্মরণোৎসব ও লোকজ মেলা আগামী সোমবার (১৯ অক্টোবর) শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। লালন সাঁইয়ের মরমি গান, সাধুসঙ্গ ও মানবতাবাদী দর্শনকে কেন্দ্র করে আয়োজিত এ উৎসব দেশ-বিদেশের বাউলপ্রেমী, সাধু-ভক্ত ও দর্শনার্থীদের মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে।