জুলাই যোদ্ধা সাজিয়ে ৮০ লাখ টাকার সরকারি খরচে থাইল্যান্ডে চিকিৎসা, নিচ্ছেন ভাতাও!

বোমা বানাতে গিয়ে হাত উড়ল রায়হানের: হয়ে গেলেন ‘জুলাই যোদ্ধা’

বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক

প্রকাশ: ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:০২ পিএম

নাজমুল হাসান, মাদারীপুর:

মাদারীপুরের কালকিনিতে স্থানীয় দুই পক্ষের সংঘর্ষে বোমার বিস্ফোরণে হাত উড়ে যাওয়া এক যুবককে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে আহত দেখিয়ে 'জুলাই যোদ্ধা' হিসেবে গেজেটভুক্ত করার চাঞ্চল্যকর ঘটনা সামনে এসেছে। মো. রায়হান নামের ওই যুবকের থাইল্যান্ডে চিকিৎসাবাবদ সরকারের ব্যয় হয়েছে প্রায় ৮০ লাখ টাকা। শুধু তা-ই নয়, সরকারি গেজেটে নাম ওঠায় তিনি নিয়মিত ভাতা সুবিধা ভোগ করছেন। জালিয়াতির বিষয়টি প্রকাশ পাওয়ার পর এলাকা ছেড়ে গা-ঢাকা দিয়েছেন অভিযুক্ত রায়হান।

​অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট মাদারীপুরের কালকিনি পৌর এলাকার চর ঠেঙ্গামারা গ্রামে স্থানীয় দুটি পক্ষের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, সংঘর্ষ চলাকালে রায়হানের হাতে একটি বোমা ছিল। প্রতিপক্ষের ছোড়া ইটের আঘাত লাগলে তার হাতে থাকা বোমাটি বিস্ফোরিত হয় এবং তিনি গুরুতর আহত হন। পরে তাকে ঢাকার জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে (নিটোর) ভর্তি করা হয়। স্থানীয় দাঙ্গাবাজির সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে এলাকায় তিনি 'বোমা রায়হান' নামেই সমধিক পরিচিত।

​দক্ষিণ রাজদী গ্রামের অধিবাসী জাহাঙ্গীর মোল্লা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "রায়হান আহত হলো গ্রামের নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষ আর মারামারির সময়, আর রাতারাতি হয়ে গেল 'জুলাই যোদ্ধা'! এটা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।"

​তবে রায়হানের পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট মাদারীপুর শহরের শকুনি লেকের পাড়ে পুলিশ ও সাবেক ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের সংঘর্ষে রায়হান আহত হয়েছিলেন। এই দাবির ওপর ভিত্তি করেই তার নাম 'জুলাই যোদ্ধা' গেজেটে অন্তর্ভুক্ত করানো হয়।

​পরিবারের এই দাবিকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও মনগড়া বলে উড়িয়ে দিয়েছেন গণ-অভ্যুত্থানের স্থানীয় সংগঠকরা। মাদারীপুর জেলা ছাত্রদলের সদস্য সচিব ও জুলাই আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী কামরুল হাসান নিশ্চিত করে জানান, ৫ আগস্ট মাদারীপুর শহরের শকুনি লেক এলাকায় ছাত্রলীগ কিংবা পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের কোনো ঘটনাই ঘটেনি। চিকিৎসা নথিতেও দেখা যায়, রায়হান ৮ আগস্ট নিটোরে ভর্তি হন। আন্দোলনের শেষ দিন ৫ আগস্ট যদি তিনি আহত হতেন, তবে তিন দিন পর ৮ আগস্ট কেন হাসপাতালে ভর্তি হলেন—তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

​চাপের মুখে রায়হানের স্বজনরাও সত্য মেনে নিতে বাধ্য হয়েছেন। রায়হানের মা জাহেদা বেগম প্রথমে ৫ আগস্টের কথা বললেও পরবর্তীতে ৮ আগস্টের সংঘর্ষের বিষয়টি স্বীকার করেন। রায়হানের বাবা বাদশা হাওলাদার নিজেদের ভুল স্বীকার করে জানান, ছেলে পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর কোন প্রক্রিয়ায় ও কীভাবে সরকারি খরচে বিদেশে চিকিৎসায় গেল, তা তারা বিস্তারিত জানেন না।

​অভিযোগ উঠেছে, তালিকা যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ার গাফিলতিতেই এমন তুঘলকি কাণ্ড ঘটেছে। তৎকালীন সময়ে আহতদের তালিকা যাচাই কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন জেলা প্রশাসক এবং সদস্য সচিব ছিলেন সিভিল সার্জন। কমিটিতে দুজন ছাত্র প্রতিনিধিও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।

​যাচাই প্রক্রিয়ার ত্রুটি সম্পর্কে জানতে চাইলে সিভিল সার্জন ও সংশ্লিষ্ট যাচাই কমিটির সদস্য সচিব ড. শরীফুল আবেদীন কামাল দায় এড়িয়ে বলেন, "ঢাকা থেকে তালিকা অনলাইনে আপলোড করা হয়েছিল, আমরা স্থানীয়ভাবে শুধু স্বাক্ষর করে দিয়েছি।"

​অন্যদিকে জেলা যাচাই কমিটির ছাত্র প্রতিনিধি হাফেজ হাসিবুল্লাহ জানান, "উপজেলা থেকে যে তথ্য যাচাই করে পাঠানো হয়েছিল, তার ওপর নির্ভর করেই জেলা পর্যায়ে স্বাক্ষর করা হয়। এছাড়া এনএসআই, ডিজিএফআই ও ডিএসবিসহ গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও এর তদন্তের দায়িত্বে ছিল।"

​সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার বিষয় হলো, এমন একজন অযোগ্য ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে আহত ব্যক্তির চিকিৎসায় জাতীয় রাজস্বের ৮০ লাখ টাকা ব্যয় হয়ে গেছে থাইল্যান্ডের উন্নত হাসপাতালে। বর্তমানে জালিয়াতির তথ্য ফাঁস হয়ে পড়ায় রায়হান মোবাইল বন্ধ করে আত্মগোপনে রয়েছেন।

​এ বিষয়ে কালকিনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কিশোর কুমার দাশ জানান, তিনি উপজেলায় নতুন যোগদান করেছেন এবং বিষয়টি সম্পর্কে পূর্বে অবগত ছিলেন না। তবে ঘটনাটির সুনির্দিষ্ট তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি আশ্বস্ত করেন।

 

 

যোগাযোগের ঠিকানা:

বাংলাদেশ বার্তা টুডে

৫৬, চানখারপুল লেন, নাজিমুদ্দিন রোড, বংশাল, ঢাকা-১১০০

ইমেইল: info@bangladeshbartatoday.com