দুর্গাপূজা: উৎসবের আনন্দ, সংখ্যালঘুর নিরাপত্তা ও মানবিক রাষ্ট্রের দায়

বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক

প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৩৬ এএম

বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা কেবল পূজা-অর্চনা, আচার-অনুষ্ঠান কিংবা মণ্ডপের আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ নয়। কালক্রমে এটি বাঙালির সাহিত্য, সংগীত, শিল্পকলা ও সামষ্টিক সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। তাই দুর্গাপূজাকে অনেকেই শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, বাঙালির শারদীয় সাংস্কৃতিক উৎসব হিসেবেও দেখেন। আগমনী সংগীত, কাশফুলের দোলা, শরতের নীল আকাশ আর মায়ের আগমনের প্রতীক্ষা মিলিয়ে এই উৎসবের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আবেগ, ঐতিহ্য ও মানবিকতার গভীর বন্ধন।

কিন্তু উৎসবের এই চিরচেনা আনন্দের পাশাপাশি যখন নিরাপত্তাহীনতা, আতঙ্ক, বৈষম্য ও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা মানুষের মনে জায়গা করে নেয়, তখন প্রশ্ন জাগে—দুর্গাপূজা কি সবার জন্য সমান আনন্দের উপলক্ষ হয়ে উঠতে পারছে? নাকি এক শ্রেণির মানুষের কাছে উৎসবের দিনগুলোও উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠার সময় হয়ে উঠছে?

এই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। কারণ, একটি উৎসবের প্রকৃত সার্থকতা শুধু আয়োজনের আড়ম্বর কিংবা মণ্ডপের সংখ্যায় নয়; বরং মানুষ কতটা নিরাপদে, নির্ভয়ে ও মর্যাদার সঙ্গে তাতে অংশ নিতে পারছে, তার ওপর নির্ভর করে।

 

উৎসবের আনন্দ যখন বিষাদের ছায়ায়

দুর্গা বাঙালি হিন্দুদের কাছে মা। মায়ের প্রতীকী অর্থ কেবল ধর্মীয় বিশ্বাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আশ্রয়, সুরক্ষা, সাহস ও নিঃশর্ত মমতা। বিপদের মুখে মা যেমন সন্তানকে আগলে রাখেন, তেমনি সমাজ ও রাষ্ট্রেরও দায়িত্ব হলো বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়ানো।

প্রকৃতির জগতে মাতৃত্বের শক্তি ও আত্মত্যাগের অসংখ্য দৃষ্টান্ত রয়েছে। নিজের সন্তানের নিরাপত্তার জন্য মা যে অসীম সাহস দেখাতে পারেন, তা শক্তির প্রচলিত সংজ্ঞাকেও নতুন করে ভাবতে শেখায়। দুর্গার অসুরবধের প্রতীকী তাৎপর্যও এখানেই—অশুভের বিরুদ্ধে শুভের সংগ্রাম, অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের অবস্থান এবং দুর্বলকে রক্ষার অঙ্গীকার।

কিন্তু বাস্তব সমাজে যখন ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে কোনো মানুষকে আতঙ্কে দিন কাটাতে হয়, উপাসনালয়ের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকতে হয় কিংবা নিজের বসতভিটা ও সম্পদের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত হতে হয়, তখন উৎসবের অন্তর্নিহিত তাৎপর্যই প্রশ্নের মুখে পড়ে।

বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগকে তাই নিছক একটি সম্প্রদায়ের সমস্যা হিসেবে দেখার অবকাশ নেই। এটি নাগরিক অধিকার, আইনের শাসন ও রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্বের প্রশ্ন। কোথাও হামলা, ভয়ভীতি, উপাসনালয়ে ভাঙচুর কিংবা সম্পত্তি দখলের অভিযোগ উঠলে তার নিরপেক্ষ তদন্ত, অপরাধীর বিচার এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং নির্দোষ কাউকে হয়রানি না করাও ন্যায়বিচারের অপরিহার্য অংশ।

 

মাৎস্যন্যায়ের ছায়া: বড়র দাপটে ছোটর নিরাপত্তাহীনতা

রাষ্ট্র ও সমাজে যখন ক্ষমতাবানরা দুর্বলদের অধিকার উপেক্ষা করে, যখন প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিচার হয় না কিংবা ভয় দেখিয়ে কাউকে ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়, তখন সেখানে মাৎস্যন্যায়ের আশঙ্কা তৈরি হয়। বড় মাছ ছোট মাছকে গিলে খাওয়ার যে উপমা, তা কেবল প্রাচীন রাজনৈতিক ধারণা নয়; ক্ষমতার অপব্যবহার ও বিচারহীনতার বাস্তবতাও এর মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায়।

ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ক্ষেত্রে এই আশঙ্কা আরও গভীর হয়ে ওঠে, যখন তারা মনে করেন—বিপদের সময় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কিংবা রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছ থেকে প্রত্যাশিত সুরক্ষা পাওয়া যাবে কি না, তা অনিশ্চিত। এই অনিশ্চয়তা মানুষের মনে ভীতি তৈরি করে, সামাজিক আস্থাকে দুর্বল করে এবং নাগরিকদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি বাড়ায়।

তবে এ কথাও মনে রাখতে হবে, কোনো একটি জনগোষ্ঠীর সব মানুষকে একই অভিজ্ঞতা বা অবস্থানের মধ্যে ফেলে বিচার করা যায় না। বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে ধর্মীয় সম্প্রীতি, পারস্পরিক সহযোগিতা ও প্রতিবেশীর পাশে দাঁড়ানোর ইতিবাচক দৃষ্টান্তও রয়েছে। সংকটের আলোচনা করতে গিয়ে সেই বাস্তবতাকে অস্বীকার করা যেমন ঠিক নয়, তেমনি বিচ্ছিন্ন ইতিবাচক উদাহরণ দেখিয়ে নিরাপত্তাহীনতার অভিযোগ উপেক্ষা করাও দায়িত্বশীলতার পরিচয় নয়।

প্রয়োজন হলো, কোথায় কী ঘটেছে, কারা দায়ী, প্রশাসন কী পদক্ষেপ নিয়েছে এবং বিচার কত দূর এগিয়েছে—এসব প্রশ্নের জবাব তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে খুঁজে বের করা। অপরাধীর পরিচয় যা-ই হোক, অপরাধের দায় ব্যক্তির; কোনো ধর্মীয় সম্প্রদায়ের নয়।

 

পূজা কমানোর পরামর্শ, নাকি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়?

দুর্গাপূজার মণ্ডপের সংখ্যা, আয়োজনের পরিধি কিংবা নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা নিয়ে রাষ্ট্র ও প্রশাসনের বাস্তব পরিকল্পনা থাকতে পারে। সীমিত সম্পদ, জনবল ও নিরাপত্তা-ঝুঁকি বিবেচনায় দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষের সমন্বিত উদ্যোগও প্রয়োজন। কিন্তু সেই পরিকল্পনার ভাষা ও উদ্দেশ্য হতে হবে নাগরিকের অধিকার সুরক্ষা, কোনো সম্প্রদায়ের ধর্মীয় স্বাধীনতা সংকুচিত করা নয়।

কোনো উৎসবের আয়োজন কমানোর পরামর্শ যদি নিরাপত্তা-সংকটের বাস্তব সমাধানের পরিবর্তে আক্রান্ত বা আশঙ্কাগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর ওপরই দায় চাপিয়ে দেয়, তাহলে তা মানুষের মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি করবে। নিরাপত্তার ঘাটতি থাকলে তার সমাধান হলো নিরাপত্তা জোরদার করা, ঝুঁকি চিহ্নিত করা, অপরাধ প্রতিরোধ করা এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া। ধর্মীয় স্বাধীনতা ভোগ করার অধিকারকে ভয় বা চাপের মুখে সীমিত করে দেওয়া কোনো স্থায়ী সমাধান হতে পারে না।

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্মীয় উৎসব যেমন নির্বিঘ্নে পালনের অধিকার রয়েছে, তেমনি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালনের অধিকারও সমানভাবে সুরক্ষিত হওয়া উচিত। এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের দায়িত্ব কারও প্রতি অনুগ্রহ দেখানো নয়; বরং সংবিধান ও আইনের আলোকে প্রত্যেক নাগরিকের অধিকার নিশ্চিত করা।

 

ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে নাগরিকের মর্যাদা

ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনায় প্রায়ই রাজনৈতিক পরিচয়, দলীয় অবস্থান কিংবা অতীতের ক্ষমতার সমীকরণ সামনে চলে আসে। কিন্তু নাগরিকের নিরাপত্তা কোনো রাজনৈতিক দলের আনুকূল্যের ওপর নির্ভর করতে পারে না। কেউ কোনো দলের সমর্থক কি না, অতীতে কোন রাজনৈতিক অবস্থানে ছিলেন কিংবা বর্তমান ক্ষমতার বিন্যাসে তাঁর অবস্থান কী—এসবের ভিত্তিতে তাঁর নিরাপত্তা ও অধিকার নির্ধারিত হওয়া উচিত নয়।

কোনো রাজনৈতিক শক্তি দুর্বল হয়ে পড়লে তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে বিবেচিত সাধারণ মানুষের ওপর প্রতিশোধমূলক আচরণ, হামলা কিংবা হয়রানি চালানোও গ্রহণযোগ্য নয়। রাজনৈতিক বিরোধের বিচার রাজনৈতিক ও আইনসম্মত প্রক্রিয়ায় হতে পারে; কিন্তু তার দায় কোনো ধর্মীয় জনগোষ্ঠী কিংবা সাধারণ নাগরিকের ওপর চাপানো যায় না।

একইভাবে, ধর্মীয় পরিচয়কে ব্যবহার করে কেউ যদি ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিল, সম্পত্তি দখল, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা কিংবা সামাজিক আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করে, তবে তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে বিচার এবং ভুক্তভোগীর ক্ষতিপূরণ—এসব নিশ্চিত না হলে ন্যায়বিচারের প্রতি মানুষের আস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে না।

ইতিহাসের শিক্ষা হলো, ক্ষমতার দম্ভ স্থায়ী নয়। অন্যায় করে কেউ চিরকাল পার পেয়ে যায় না—এমন নৈতিক প্রত্যাশা সমাজকে সাহস জোগায়। কিন্তু শুধু নিয়তির বিচারের অপেক্ষায় থাকলে চলবে না। মানুষের তৈরি অন্যায়ের প্রতিকার করতে হবে মানুষের গড়া ন্যায়বিচারের ব্যবস্থার মধ্য দিয়েই।

 

রাষ্ট্রের দায়িত্ব: আশ্বাস নয়, দৃশ্যমান পদক্ষেপ

উৎসবের আগে নিরাপত্তার আশ্বাস দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। তবে আশ্বাসের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো তার বাস্তবায়ন। পূজামণ্ডপ, মন্দির, হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা এবং ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ, পূজা উদ্‌যাপন কমিটি ও জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন।

কোথাও হামলার আশঙ্কা দেখা দিলে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। অপরাধ সংঘটিত হলে মামলা গ্রহণ, নিরপেক্ষ তদন্ত, অভিযুক্তদের আইনের আওতায় আনা এবং বিচারপ্রক্রিয়ার অগ্রগতি সম্পর্কে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে হবে। একই সঙ্গে গুজব, উসকানিমূলক বক্তব্য ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রতিরোধে দায়িত্বশীল ভূমিকা জরুরি।

তবে নিরাপত্তার নামে কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে সার্বক্ষণিক সন্দেহের চোখে দেখা কিংবা তাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা সংকুচিত করা গ্রহণযোগ্য নয়। নিরাপত্তা ব্যবস্থার লক্ষ্য হবে মানুষের ভয় দূর করা, ভয়কে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া নয়।

রাজনৈতিক নেতৃত্বেরও এখানে বিশেষ দায়িত্ব রয়েছে। ধর্মীয় সম্প্রীতির কথা শুধু বক্তৃতায় বললে হবে না; বাস্তবে আক্রান্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে। অপরাধীর রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রভাব বিবেচনা না করে আইন প্রয়োগ করতে হবে। কারণ, অপরাধী যদি পরিচয় ও প্রভাবের কারণে দায়মুক্তি পায়, তবে বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ক্রমেই ক্ষয় হবে।

 

দুর্গোৎসবের সাংস্কৃতিক তাৎপর্য: সবার আনন্দ, সবার অংশগ্রহণ

দুর্গাপূজার বিশেষত্ব হলো, এটি ধর্মীয় বিশ্বাসের পরিসর অতিক্রম করে বাঙালির সাংস্কৃতিক জীবনেও গভীরভাবে প্রোথিত হয়েছে। আগমনী গান, শরতের প্রকৃতি, প্রতিমাশিল্প, আলোকসজ্জা, মণ্ডপের সৃজনশীলতা এবং মানুষের পারস্পরিক যোগাযোগ—সব মিলিয়ে দুর্গোৎসব একটি বৃহত্তর সামাজিক আবহ তৈরি করে।

এই উৎসবের আনন্দে বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষের অংশগ্রহণ বাংলাদেশের বহুত্ববাদী সমাজের সৌন্দর্যকে প্রকাশ করে। একজন মুসলমান প্রতিবেশী যখন হিন্দু প্রতিবেশীর পূজার শুভেচ্ছা জানান, কোনো তরুণ স্বেচ্ছাসেবক যখন মণ্ডপের নিরাপত্তায় সহযোগিতা করেন, কিংবা বিপদের সময় এক সম্প্রদায়ের মানুষ অন্য সম্প্রদায়ের পাশে দাঁড়ান—তখনই সম্প্রীতি বাস্তব অর্থ লাভ করে।

সম্প্রীতি মানে মতভেদহীন সমাজ নয়; বরং মত ও বিশ্বাসের পার্থক্য সত্ত্বেও পরস্পরের অধিকারকে সম্মান করার সংস্কৃতি। কারও ধর্মীয় বিশ্বাস নিজের বিশ্বাসের মতো না হলেও তার মর্যাদা ও নিরাপত্তার অধিকারকে স্বীকার করাই মানবিকতার প্রকৃত পরীক্ষা।

এ কারণেই দুর্গাপূজাকে শুধু হিন্দু সম্প্রদায়ের উৎসব হিসেবে দেখলে এর বৃহত্তর সাংস্কৃতিক তাৎপর্য অসম্পূর্ণ থেকে যায়। এটি একই সঙ্গে বাংলাদেশের সমাজের সামনে একটি প্রশ্নও তুলে ধরে—আমরা কি এমন একটি দেশ গড়তে পারছি, যেখানে প্রত্যেকে নিজের বিশ্বাস ও পরিচয় নিয়ে মর্যাদার সঙ্গে বাঁচতে পারবেন?

 

অসুরবধের শিক্ষা: অন্যায়ের বিরুদ্ধে সম্মিলিত অবস্থান

দুর্গার অসুরবধের কাহিনি ধর্মীয় বিশ্বাসে অশুভ শক্তির বিনাশের প্রতীক। এর সামাজিক তাৎপর্যও গভীর। সমাজের অসুর শুধু কোনো পৌরাণিক চরিত্র নয়; অন্যায়, লোভ, হিংসা, প্রতিহিংসা, বৈষম্য, নিপীড়ন ও ক্ষমতার অপব্যবহারও মানুষের জীবনকে অন্ধকার করে তোলে।

এই অসুরদের পরাজিত করতে হলে শুধু উৎসবের কয়েকটি দিন আনন্দ করলেই চলবে না। পরিবারে, সমাজে, প্রশাসনে ও রাষ্ট্রে ন্যায়বোধ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। অন্যায় দেখেও নীরব থাকার প্রবণতা কাটাতে হবে। ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়ানো হলে তার প্রতিবাদ করতে হবে; দুর্বল মানুষের অধিকার লঙ্ঘিত হলে দল-মত-ধর্ম নির্বিশেষে পাশে দাঁড়াতে হবে।

একটি সমাজের মানবিক শক্তি বোঝা যায় তার দুর্বলতম মানুষের অবস্থান দেখে। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ নিরাপদে আছেন—এটুকুই রাষ্ট্রের সাফল্যের পূর্ণ মাপকাঠি নয়। সংখ্যালঘু, প্রান্তিক ও অসহায় মানুষও যদি সমান নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার ও মর্যাদা পান, তবেই রাষ্ট্রের শক্তি অর্থবহ হয়ে ওঠে।

 

উৎসব ফিরে পাক তার প্রকৃত আনন্দ

দুর্গাপূজা আনন্দের, মমতার, সৌন্দর্যের এবং অশুভের বিরুদ্ধে শুভশক্তির বিজয়ের বার্তা বহন করে। কিন্তু সেই আনন্দ তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন কোনো পরিবারকে ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে আতঙ্কে দিন কাটাতে হবে না; কোনো পূজামণ্ডপের আয়োজককে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে হবে না; কোনো মানুষকে নিজের ভিটেমাটি, উপাসনালয় কিংবা ভবিষ্যৎ হারানোর ভয় নিয়ে বাঁচতে হবে না।

রাষ্ট্রের দায়িত্ব কেবল উৎসবের আনুষ্ঠানিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা নয়; এমন পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে মানুষ উৎসবের বাইরেও নিরাপদে বসবাস করতে পারেন। কারণ, কয়েক দিনের নিরাপত্তা দিয়ে দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা দূর করা যায় না। এর জন্য প্রয়োজন আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ, অপরাধের বিচার, সামাজিক সচেতনতা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা।

বাংলাদেশের পরিচয় তার বহুত্বে, মানুষের পারস্পরিক সহাবস্থানে এবং নানা বিশ্বাসের মানুষের একসঙ্গে পথ চলার ঐতিহ্যে। এই ঐতিহ্য রক্ষা করা কোনো একক সম্প্রদায়ের দায়িত্ব নয়; এটি আমাদের সবার দায়।

সবাই মিলে নিরুপদ্রবে, নির্ভয়ে এবং নিজের বিশ্বাস অনুযায়ী দুর্গোৎসব উদ্‌যাপন করতে পারলেই উৎসব তার প্রকৃত তাৎপর্য ফিরে পাবে। মানুষ উৎসব থেকে নতুন করে সাহস, আশাবাদ ও জীবনের শক্তি সংগ্রহ করবে। সংসার ও সমাজের অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর প্রেরণা পাবে।

দুর্গাপূজার প্রকৃত শিক্ষা এখানেই—অশুভের পরাজয়, শুভের প্রতিষ্ঠা এবং মানুষের প্রতি মানুষের মমতা। যে উৎসব মানুষের মনে ভয় নয়, সাহস জাগায়; বিভেদ নয়, সম্প্রীতি গড়ে তোলে; আর আধিপত্য নয়, মর্যাদার বার্তা দেয়—সেই উৎসবই সত্যিকার অর্থে শারদোৎসব।

উৎসব সবার, নিরাপত্তা সবার, বাংলাদেশও সবার।

লেখক: মোহাম্মদ হাসান, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

যোগাযোগের ঠিকানা:

বাংলাদেশ বার্তা টুডে

৫৬, চানখারপুল লেন, নাজিমুদ্দিন রোড, বংশাল, ঢাকা-১১০০

ইমেইল: info@bangladeshbartatoday.com