টুপটুপ রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১০ জনের মৃত্যু, আহত আরও কয়েকজন
বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:১০ পিএম
বিশেষ প্রতিনিধি কামরুল ইসলাম, টেকনাফ, কক্সবাজার:
কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীর পাটুয়ারটেক এলাকায় মেরিন ড্রাইভসংলগ্ন টুপটুপ রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। আগুনে পুড়ে যাওয়া রিসোর্টের সামনে স্বজনদের খোঁজে মানুষের আহাজারি, ছোটাছুটি আর কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে চারপাশের পরিবেশ। এরই মধ্যে এক নারীর হৃদয়বিদারক আকুতি মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে যাচ্ছে। তিনি বারবার বিলাপ করে বলছেন, ‘আমার সাইফকে আইন্না দাও, আমি কারে নিয়া বাঁ’চুম।’
শনিবার (১৭ অক্টোবর) সকালে ঘটে যাওয়া এই অগ্নিকাণ্ডে সর্বশেষ পাওয়া তথ্যে ১০ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। আহত হয়েছেন আরও কয়েকজন। নিহতদের মধ্যে শিশুও রয়েছে বলে জানা গেছে। তাঁদের মধ্যে ছয়জনের পরিচয় শনাক্ত হওয়ার খবরও প্রকাশিত হয়েছে। তবে নিখোঁজ ব্যক্তিদের সর্বশেষ অবস্থা এবং হতাহতদের পূর্ণাঙ্গ পরিচয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
স্বজনের খোঁজে আহাজারি, চারদিকে ধ্বংসস্তূপ
অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে যাওয়া রিসোর্টের সামনে দাঁড়িয়ে ওই নারীর কান্না উপস্থিত মানুষের হৃদয় ভারী করে তুলেছে। চারদিকে পোড়া কাঠ, ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনা এবং স্বজনদের খোঁজে উদ্বিগ্ন মানুষের ছোটাছুটি। এর মধ্যেই তাঁর কণ্ঠে বারবার ভেসে আসছে প্রিয় মানুষটিকে ফিরে পাওয়ার আকুতি—‘আমার সাইফকে আইন্না দাও, আমি কারে নিয়া বাঁ’চুম।’
সাইফের সঙ্গে ওই নারীর সম্পর্ক কী—তিনি তাঁর স্বামী, সন্তান নাকি পরিবারের অন্য কেউ—তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে প্রিয়জনকে হারানোর আশঙ্কায় তাঁর অসহায় কান্না ঘটনাস্থলের শোকাবহ পরিস্থিতিকে আরও বেদনাদায়ক করে তুলেছে।
হয়তো পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কিছু আনন্দঘন সময় কাটানোর আশায় কক্সবাজারে বেড়াতে এসেছিলেন তাঁরা। সমুদ্র দেখা, একসঙ্গে সময় কাটানো এবং সুন্দর স্মৃতি নিয়ে বাড়ি ফেরার স্বপ্ন ছিল। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যে সেই আনন্দযাত্রা পরিণত হয়েছে ভয়াবহ দুঃস্বপ্নে।
দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে আগুন
স্থানীয়ভাবে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, শনিবার সকালে উখিয়ার ইনানীর পাটুয়ারটেক এলাকায় মেরিন ড্রাইভসংলগ্ন টুপটুপ রিসোর্টে আগুন লাগে। কাঠের তৈরি স্থাপনায় আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করে।
খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণ ও উদ্ধারকাজ শুরু করেন। উদ্ধার তৎপরতার মধ্যেই হতাহতের খবর সামনে আসতে থাকে। একের পর এক মরদেহ উদ্ধারের খবরে স্বজনদের মধ্যে শোক ও উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়ে।
নিহতদের মধ্যে শিশু থাকার খবর ঘটনাটিকে আরও মর্মান্তিক করে তুলেছে। অনেকেই এখনো স্বজনদের খোঁজে উদ্বিগ্ন। নিখোঁজদের বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন তাঁদের পরিবারের সদস্যরা।
অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন
এই মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ডের পর পর্যটনকেন্দ্রিক রিসোর্টগুলোর অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এসব প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম, কার্যকর জরুরি বহির্গমনপথ এবং প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা জরুরি।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, পুড়ে যাওয়া রিসোর্টটির অগ্নিনিরাপত্তা লাইসেন্স ছিল না বলে জানানো হয়েছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য, লাইসেন্সের অবস্থা এবং নিরাপত্তাব্যবস্থার প্রকৃত পরিস্থিতি যাচাই করা প্রয়োজন।
অগ্নিকাণ্ডের কারণ, নিরাপত্তাব্যবস্থায় কোনো অবহেলা ছিল কি না এবং ভবনটির অনুমোদন ও পরিচালনাসংক্রান্ত বিধিবিধান যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি না—এসব বিষয় নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা জরুরি। তদন্তে কোনো অনিয়ম বা অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল।
১০ জনের মৃত্যু, অসংখ্য পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতি
একটি দুর্ঘটনায় ১০ জনের মৃত্যু মানে শুধু ১০টি প্রাণের অবসান নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে অসংখ্য মানুষের স্বপ্ন, ভালোবাসা ও ভবিষ্যৎ।
কোনো মা হয়তো সন্তানের ফিরে আসার অপেক্ষায় থাকবেন, কোনো সন্তান হয়তো বাবার পথ চেয়ে থাকবে, আবার কোনো পরিবারকে হয়তো সারাজীবন বয়ে বেড়াতে হবে প্রিয়জন হারানোর অসহনীয় শোক।
নিখোঁজ স্বজনের সন্ধানে অপেক্ষমাণ পরিবারগুলোর জন্য প্রতিটি মুহূর্তই যেন দীর্ঘ যন্ত্রণার। তাঁদের প্রয়োজন সহমর্মিতা, মানসিক সমর্থন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য তথ্য।
বিশেষ করে সাইফের খোঁজে ওই নারীর আকুতি মনে করিয়ে দেয়, প্রতিটি নিখোঁজ মানুষের পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, একটি সম্পর্ক এবং অসংখ্য স্বপ্ন। তাই হতাহত ও নিখোঁজদের বিষয়ে দ্রুত তথ্য প্রকাশের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া জরুরি।
পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি
কক্সবাজার দেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র। প্রতিবছর অসংখ্য মানুষ পরিবার-পরিজন নিয়ে সমুদ্রসৈকত ও আশপাশের পর্যটন এলাকায় বেড়াতে আসেন। তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রিসোর্ট কর্তৃপক্ষ, প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
পর্যটনকেন্দ্রের হোটেল, মোটেল ও রিসোর্টগুলোতে নিয়মিত অগ্নিনিরাপত্তা পরিদর্শন, অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জামের কার্যকারিতা পরীক্ষা, জরুরি বহির্গমনপথ সচল রাখা এবং কর্মীদের অগ্নিকাণ্ড মোকাবিলায় প্রশিক্ষণ দেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি অনুমোদন ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিধিবিধান মানা হচ্ছে কি না, তা নিয়মিত তদারকি করা জরুরি।
যাতে ভবিষ্যতে এমন মর্মান্তিক ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সে জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে।
শেষ আকুতি—প্রিয়জনকে ফিরে পাওয়ার অপেক্ষা
ইনানীর পোড়া রিসোর্টের সামনে আজ শোক, উদ্বেগ আর অনিশ্চয়তা। সেই শোকের ভেতর থেকে বারবার ভেসে আসছে এক নারীর আকুতি—‘আমার সাইফকে আইন্না দাও।’
সাইফের কী হয়েছে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। ওই নারী শেষ পর্যন্ত তাঁর প্রিয় মানুষটিকে ফিরে পাবেন কি না, সেটিও অজানা। তাই অনুমানের পরিবর্তে প্রয়োজন সঠিক তথ্য, দ্রুত অনুসন্ধান এবং পরিবারের পাশে দাঁড়ানো।
এই অগ্নিকাণ্ডে নিহতদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করছেন স্বজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা। আহতদের দ্রুত সুস্থতা এবং নিখোঁজদের বিষয়ে পরিবারগুলোর কাছে দ্রুত নিশ্চিত খবর পৌঁছানোর প্রত্যাশা সবার।
কক্সবাজারে বেড়াতে এসে আর কোনো পরিবারকে যেন প্রিয়জন হারানোর এমন ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে না হয়। আনন্দের ভ্রমণ শেষে সবাই যেন নিরাপদে ঘরে ফিরতে পারেন—এটাই এখন সবার প্রত্যাশা,,,,