শারদীয় দুর্গোৎসব: সম্প্রীতি, ঐতিহ্য ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের প্রত্যাশা
বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ১০:২৬ পিএম
শরতের নীল আকাশ, সাদা কাশফুল, শিশিরভেজা ঘাস আর শিউলির স্নিগ্ধ সুবাস—প্রকৃতির এই চিরচেনা আয়োজন বাঙালির মনে শারদীয় দুর্গোৎসবের আগমনী বার্তা নিয়ে আসে। ঢাকের বাদ্য, শঙ্খধ্বনি, মণ্ডপের আলোকসজ্জা এবং মানুষের আনন্দ-উচ্ছ্বাসে মুখর হয়ে ওঠে চারপাশ। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা বাঙালি হিন্দুদের ধর্মীয় বিশ্বাস, সংস্কৃতি ও আবেগের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। তবে এর আবেদন ধর্মীয় পরিসর ছাড়িয়ে বাঙালির লোকজ ঐতিহ্য, সামাজিক বন্ধন ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের মধ্যেও বিস্তৃত।
দুর্গোৎসবের মূল তাৎপর্য অশুভ শক্তির বিনাশ এবং শুভ শক্তির প্রতিষ্ঠা। কিন্তু এই বার্তা কেবল পৌরাণিক কাহিনির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অন্যায়, অবিচার, হিংসা, বিদ্বেষ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর যে নৈতিক শিক্ষা দুর্গোৎসব ধারণ করে, তা সব ধর্মের মানুষের জন্যই প্রাসঙ্গিক। তাই শারদীয় দুর্গোৎসবকে শুধু একটি ধর্মীয় আয়োজন হিসেবে দেখলে এর সামাজিক ও মানবিক তাৎপর্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ অনালোচিত থেকে যায়।
পৌরাণিক বিশ্বাসে অশুভের বিনাশ, মানবিকতায় কল্যাণের আহ্বান
হিন্দু পুরাণ অনুসারে, মহিষাসুর নামের এক অসুরের অত্যাচারে দেবতারা বিপর্যস্ত হয়ে পড়লে তাঁদের সম্মিলিত শক্তি থেকে দেবী দুর্গার আবির্ভাব ঘটে। দেবী মহিষাসুরকে বধ করে অশুভ শক্তির পরাজয় এবং শুভ শক্তির বিজয় প্রতিষ্ঠা করেন। এই পৌরাণিক আখ্যানের মধ্য দিয়ে দুর্গা হয়ে ওঠেন শক্তি, সাহস, ন্যায় ও কল্যাণের প্রতীক।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাসে দেবী দুর্গা দুর্গতিনাশিনী, জগজ্জননী ও মাতৃশক্তির প্রতীক। তাঁর দশভুজা রূপ বহুমুখী শক্তি ও প্রতিকূলতা মোকাবিলার সামর্থ্যকে স্মরণ করিয়ে দেয়। দেবীর হাতে থাকা বিভিন্ন অস্ত্র অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়। অন্যদিকে তাঁর মাতৃরূপ আশ্রয়, মমতা, সুরক্ষা ও কল্যাণের ধারণাকে ধারণ করে।
এই প্রতীকী তাৎপর্য থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক শিক্ষা পাওয়া যায়—অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে বিজয় কেবল বাহ্যিক সংঘাতের মধ্য দিয়ে আসে না; মানুষের ভেতরের লোভ, অহংকার, নিষ্ঠুরতা, অসহিষ্ণুতা ও বিদ্বেষকে পরাজিত করার মধ্য দিয়েও তা অর্জিত হয়। যে সমাজ অন্যায়ের প্রতিবাদ করে, দুর্বলের পাশে দাঁড়ায় এবং মানুষের মর্যাদা রক্ষা করে, সেই সমাজেই শুভ শক্তির প্রকৃত প্রতিষ্ঠা ঘটে।
ইতিহাসের বিবর্তনে দুর্গাপূজা, বাংলার নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয়
দুর্গাপূজার ইতিহাস দীর্ঘ ও বহুমাত্রিক। এর পৌরাণিক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বিকাশের বিভিন্ন স্তর রয়েছে। দেবী দুর্গার পরিচিতি ও উপাসনার বিকাশ প্রাচীন ভারতীয় ধর্মীয় ঐতিহ্য, মাতৃকা উপাসনা এবং শক্তিসাধনার বিভিন্ন ধারার সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে এসব ধারার মধ্যে সরাসরি যোগসূত্রের সব ক্ষেত্রেই ঐতিহাসিক প্রমাণ সমানভাবে সুস্পষ্ট নয়।
দেবী দুর্গার সুসংহত পৌরাণিক পরিচিতি বিশেষভাবে প্রতিষ্ঠা পায় মার্কণ্ডেয় পুরাণের অন্তর্ভুক্ত দেবীমাহাত্ম্য অংশে, যা সাধারণভাবে খ্রিষ্টীয় পঞ্চম থেকে ষষ্ঠ শতকের মধ্যে রচিত বলে বিবেচিত হয়। সেখানে মহিষাসুর বধসহ দেবীর বিভিন্ন বিজয়গাথা বর্ণিত হয়েছে। পরবর্তী সময়ে পুরাণ, ধর্মীয় আচার, সাহিত্য, ভাস্কর্য ও লোকবিশ্বাসের মধ্য দিয়ে দুর্গার উপাসনা নানা রূপে বিস্তার লাভ করে।
বাংলায় দুর্গাপূজার বিকাশও এক দিনে ঘটেনি। মধ্যযুগের ধর্মীয় সাহিত্য ও পূজাবিধিতে দুর্গার উপাসনার উল্লেখ পাওয়া যায়। পরবর্তী সময়ে জমিদার ও অভিজাত পরিবারগুলোর পৃষ্ঠপোষকতায় দুর্গাপূজা জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনে পরিণত হয়। বাংলায় শারদীয় দুর্গাপূজার প্রসারে রাজশাহীর তাহিরপুরের রাজা কংসনারায়ণের নাম বিশেষভাবে আলোচিত। তবে বাংলায় দুর্গাপূজার সূচনা ও বিস্তার নিয়ে বিভিন্ন ঐতিহাসিক বর্ণনা থাকায় একক কোনো সালকে এর চূড়ান্ত সূচনাকাল হিসেবে বিবেচনা করা সতর্কতার দাবি রাখে।
অভিজাত পরিবারের গণ্ডি পেরিয়ে দুর্গাপূজা ক্রমে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণে সর্বজনীন উৎসবের রূপ পায়। আঠারো শতকের শেষভাগে পশ্চিমবঙ্গের গুপ্তিপাড়ায় বারোয়ারি পূজার প্রচলন এই বিকাশের ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। পরবর্তী সময়ে সর্বজনীন পূজার বিস্তার দুর্গোৎসবকে আরও বেশি মানুষের অংশগ্রহণের সুযোগ করে দেয়।
এই বিবর্তন প্রমাণ করে, একটি ধর্মীয় উৎসব সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কীভাবে সমাজ, অর্থনীতি, সাহিত্য, শিল্পকলা ও জনজীবনের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে। দুর্গাপূজা আজ বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যার মধ্যে ধর্মীয় আচার ও লোকজ ঐতিহ্য পাশাপাশি অবস্থান করছে।
কৃষিভিত্তিক বাংলার জীবন ও দুর্গোৎসবের লোকজ অনুষঙ্গ
বাংলার দুর্গোৎসবের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো প্রকৃতি ও কৃষিজীবনের সঙ্গে এর নিবিড় সংযোগ। নবপত্রিকা, ধান, ফলমূল, ফুল, পাতা এবং বিভিন্ন প্রাকৃতিক উপাদানের ব্যবহার উৎসবটিকে বাংলার কৃষিভিত্তিক সমাজের জীবনধারার সঙ্গে যুক্ত করেছে।
নবপত্রিকায় কলাগাছসহ বিভিন্ন উদ্ভিদের ব্যবহার, পূজার উপকরণে ধান-দূর্বা-ফলমূলের উপস্থিতি এবং শরতের প্রকৃতিকে ঘিরে উৎসবের আবহ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, মানুষের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক চর্চা প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। কৃষি, ঋতুচক্র ও গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে মানুষের যে গভীর সম্পর্ক, তা নানা লোকাচারের মধ্য দিয়ে উৎসবে প্রতিফলিত হয়েছে।
বাংলার দুর্গাপ্রতিমার আরেকটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য হলো দেবীকে সন্তানদের সঙ্গে একই কাঠামোয় উপস্থাপন করা। লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশকে নিয়ে সপরিবারে দেবীর এই রূপ বাঙালির পারিবারিক অনুভূতি ও সাংস্কৃতিক কল্পনার সঙ্গে বিশেষভাবে সম্পর্কিত। প্রতিমাশিল্প, মণ্ডপসজ্জা, ঢাক, আলপনা, শঙ্খধ্বনি, আরতি ও ধুনুচি নাচ—সব মিলিয়ে দুর্গোৎসব হয়ে ওঠে ধর্মীয় আচার, লোকশিল্প ও সামাজিক মিলনের সম্মিলিত প্রকাশ।
বর্তমানে বাংলাদেশ, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, আসামসহ বিভিন্ন অঞ্চলে দুর্গাপূজা উদযাপিত হয়। প্রবাসী বাঙালিরাও বিশ্বের নানা দেশে এই উৎসবের আয়োজন করেন। সময়ের সঙ্গে মণ্ডপসজ্জা, প্রতিমাশিল্প ও সাংস্কৃতিক আয়োজনের ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে। ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিক শিল্পভাবনার সমন্বয়ে দুর্গোৎসব আজ আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক পরিসরেও পরিচিতি পেয়েছে।
নারীশক্তির প্রতীক দুর্গা: উৎসবের শিক্ষা বাস্তব জীবনে কতটা প্রতিফলিত?
দুর্গাপূজার অন্যতম গভীর তাৎপর্য নারীশক্তির বন্দনা। দেবী দুর্গা শক্তি, সাহস, আত্মমর্যাদা ও প্রতিরোধের প্রতীক। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যে সমাজ দেবীর শক্তির আরাধনা করে, সেই সমাজে বাস্তব নারীর নিরাপত্তা, স্বাধীনতা ও মর্যাদা কতটা নিশ্চিত?
নারীর প্রতি সহিংসতা, যৌতুক, পারিবারিক নির্যাতন, যৌন হয়রানি, বাল্যবিবাহ, কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য এবং সামাজিকভাবে নারীর কণ্ঠ রুদ্ধ করার প্রবণতা এখনো নানা মাত্রায় বিদ্যমান। দেবীকে শক্তির প্রতীক হিসেবে পূজা করার পাশাপাশি জীবিত নারীর অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারলে সেই আরাধনার সামাজিক তাৎপর্য অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
দুর্গোৎসবের শিক্ষা তাই প্রতীকী বন্দনায় সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। নারীকে মানুষ হিসেবে সমান মর্যাদা দেওয়া, তাঁর সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, সহিংসতার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া এবং শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে সমান সুযোগ প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। নারীর প্রতি সম্মান কেবল উৎসবের বক্তব্য নয়; এটি প্রতিদিনের পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় আচরণের অংশ হওয়া প্রয়োজন।
দেবী দুর্গার শক্তির প্রতীকী অর্থ তখনই বাস্তব হয়ে উঠবে, যখন কোনো নারী অন্যায়ের শিকার হলে সমাজ তাঁর পোশাক, চলাফেরা কিংবা ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে প্রশ্ন না তুলে অপরাধীর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে এগিয়ে আসবে। নারীর নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষাই হোক নারীশক্তির আরাধনার অন্যতম সামাজিক অঙ্গীকার।
ধর্মীয় উৎসব থেকে সামাজিক সম্প্রীতি
বাংলাদেশের সমাজ বহুধর্মীয় ও বহুসাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ। মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টানসহ বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষের দীর্ঘদিনের সহাবস্থান এ দেশের সামাজিক বাস্তবতার গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। এই সহাবস্থানের ইতিহাসে সহযোগিতা, সৌহার্দ্য ও পারস্পরিক নির্ভরতার বহু ইতিবাচক দৃষ্টান্ত রয়েছে। একই সঙ্গে সাম্প্রদায়িক সংঘাত, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা এবং পারস্পরিক অবিশ্বাসের ঘটনাও আমাদের সামনে কঠিন প্রশ্ন তুলে ধরে।
দুর্গাপূজা উপলক্ষে বিভিন্ন ধর্মের মানুষের শুভেচ্ছা বিনিময়, পূজামণ্ডপে স্বেচ্ছাসেবামূলক সহযোগিতা, নিরাপত্তায় পাশে দাঁড়ানো এবং উৎসবের আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার মধ্য দিয়ে সামাজিক সম্প্রীতির প্রকাশ ঘটে। এসব উদ্যোগ কেবল সৌজন্যের নিদর্শন নয়; বরং নাগরিক দায়িত্ববোধ ও পারস্পরিক আস্থারও প্রকাশ।
তবে সম্প্রীতি মানে শুধু উৎসবের কয়েকটি দিনের সৌহার্দ্য নয়। সম্প্রীতির প্রকৃত অর্থ হলো, বছরের প্রতিটি দিন প্রত্যেক মানুষ নিজের ধর্ম পালন, মত প্রকাশ ও মর্যাদা নিয়ে নিরাপদে বসবাস করতে পারবেন। কারও ধর্মীয় পরিচয় যেন তাঁর নাগরিক অধিকার, নিরাপত্তা কিংবা সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়।
‘ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার’—এই ধারণাকে বাস্তবে প্রতিষ্ঠা করা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ধর্মীয় আচার পালনের অধিকার যেমন প্রত্যেক নাগরিকের রয়েছে, তেমনি অন্যের ধর্মীয় বিশ্বাস ও উপাসনালয়ের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করাও নাগরিক দায়িত্বের অংশ। কোনো ধর্মের মানুষকে তাঁর পরিচয়ের কারণে হেয় করা, ভয় দেখানো কিংবা আক্রমণ করা সভ্য সমাজের মূল্যবোধের পরিপন্থী।
একটি ধর্মীয় উৎসব সর্বজনীন সাংস্কৃতিক আনন্দের উপলক্ষ হতে পারে; কিন্তু সেই সর্বজনীনতার অর্থ এই নয় যে কোনো সম্প্রদায়ের নিজস্ব ধর্মীয় পরিচয়কে আড়াল করতে হবে। বরং প্রত্যেকে নিজের বিশ্বাস ও স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখেই অন্যের আনন্দে অংশ নিতে পারবেন—এটাই বহুত্ববাদী সমাজের সৌন্দর্য।
সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা: সম্প্রীতির পরীক্ষায় রাষ্ট্র ও সমাজ
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নিয়ে গর্ব করার পাশাপাশি এর বাস্তব ভিত্তি কতটা শক্তিশালী, তা নিয়েও আত্মসমালোচনা প্রয়োজন। ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপাসনালয়, বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান কিংবা ব্যক্তিগত নিরাপত্তা যখন হুমকির মুখে পড়ে, তখন শুধু সম্প্রীতির বাণী উচ্চারণ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন দ্রুত প্রতিরোধ, নিরপেক্ষ তদন্ত, অপরাধীর বিচার এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের নিরাপত্তা ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করা।
দুর্গাপূজার সময় নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। তবে নিরাপত্তাকে কেবল উৎসবকেন্দ্রিক দায়িত্ব হিসেবে দেখলে চলবে না। ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা সারা বছরের বিষয়। কোনো এলাকায় হামলার আশঙ্কা দেখা দিলে প্রশাসনকে আগাম তথ্যের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নিতে হবে। গুজব, উসকানিমূলক বক্তব্য ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিদ্বেষ ছড়ানোর প্রবণতা মোকাবিলায় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার পাশাপাশি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, ধর্মীয় নেতা, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজকেও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট থাকা প্রয়োজন—কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা দিয়ে একটি সম্পূর্ণ ধর্মীয় সম্প্রদায়কে বিচার করা যেমন অন্যায়, তেমনি কোনো হামলাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে এড়িয়ে যাওয়াও দায়িত্বহীনতা। অপরাধীর পরিচয় যা-ই হোক, অপরাধের বিচার হতে হবে প্রমাণ ও আইনের ভিত্তিতে। কোনো গোষ্ঠীর প্রতি সামষ্টিক বিদ্বেষ নয়, বরং ব্যক্তির দায় নির্ধারণ এবং আইনের সমান প্রয়োগই ন্যায়বিচারের পথ।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব নাগরিকদের সমান নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের সামাজিক দায়িত্বও গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিবেশীর বিপদে পাশে দাঁড়ানো, উপাসনালয়ের নিরাপত্তায় সহযোগিতা করা এবং কোনো সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে উসকানি ছড়ালে তার প্রতিবাদ করা মানবিকতা ও নাগরিক দায়িত্বের পরিচয়। সম্প্রীতি কেবল রাষ্ট্রের নীতিতে নয়, মানুষের দৈনন্দিন আচরণেও প্রতিষ্ঠিত হতে হয়।
উৎসবের আনন্দ সবার, ধর্মীয় আচার নিজস্ব বিশ্বাসের
দুর্গাপূজার ধর্মীয় আচার সনাতন ধর্মাবলম্বীদের নিজস্ব বিশ্বাস ও উপাসনার অংশ। অন্যদিকে এর সাংস্কৃতিক আয়োজন, মেলা, শিল্পকলা, সংগীত ও সামাজিক মিলনমেলা বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করে। এই দুইয়ের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই। বরং নিজস্ব ধর্মীয় পরিচয়ের প্রতি শ্রদ্ধা বজায় রেখেই অন্যের উৎসবে সৌহার্দ্যপূর্ণ অংশগ্রহণ পারস্পরিক আস্থা বাড়াতে পারে।
বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক চেতনা কোনো ধর্মকে অস্বীকার করার নাম নয়; বরং সব ধর্মের মানুষের সমান মর্যাদা ও অধিকার স্বীকার করার নাম। অসাম্প্রদায়িকতা মানে ধর্মীয় বিশ্বাসের স্বাধীনতা, অন্যের বিশ্বাসের প্রতি শ্রদ্ধা এবং ধর্মের নামে বৈষম্য ও সহিংসতার প্রত্যাখ্যান।
কাজী নজরুল ইসলামের ‘মোরা একই বৃন্তে দুটি কুসুম, হিন্দু-মুসলমান’ পঙ্ক্তি বাঙালির মিলিত ঐতিহ্য ও সহাবস্থানের এক শক্তিশালী স্মারক। এই চেতনার পরিধি আরও বিস্তৃত করে সব ধর্ম, জাতিগোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের মানুষের জন্য সমান মর্যাদার সমাজ গড়ে তোলাই আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত।
আমাদের মনে রাখতে হবে, সামাজিক সম্প্রীতি কোনো একক সম্প্রদায়ের অনুগ্রহের ওপর নির্ভরশীল হতে পারে না। এটি পারস্পরিক সম্মান, সমান অধিকার, ন্যায়বিচার ও আইনের শাসনের ওপর প্রতিষ্ঠিত হতে হয়। যে দেশে একজন নাগরিক তাঁর ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে ভয় পান, সে দেশে সম্প্রীতির ভিত্তি দুর্বল থাকে। আর যে দেশে মানুষ অন্যের বিশ্বাসকে সম্মান করে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সম্মিলিতভাবে দাঁড়ায়, সে দেশই প্রকৃত অর্থে মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়ে ওঠে।
শারদীয় দুর্গোৎসব হোক মানবিক বাংলাদেশের অঙ্গীকার
দুর্গাপূজার ইতিহাস আমাদের দেখায়, সময়ের সঙ্গে একটি ধর্মীয় উৎসব কীভাবে বৃহত্তর সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ হয়ে উঠতে পারে। পৌরাণিক আখ্যান থেকে লোকজ ঐতিহ্য, জমিদারবাড়ির আয়োজন থেকে সর্বজনীন পূজা, বাংলার গ্রামীণ সমাজ থেকে প্রবাসী বাঙালির বিশ্বজনীন মিলন—দুর্গোৎসবের এই দীর্ঘ পথচলা আমাদের সাংস্কৃতিক অভিযাত্রারই একটি অধ্যায়।
কিন্তু উৎসবের জাঁকজমক, আলোকসজ্জা কিংবা মণ্ডপের সৌন্দর্যই এর সাফল্যের একমাত্র মাপকাঠি নয়। উৎসবের প্রকৃত সার্থকতা তখনই, যখন এর মানবিক বার্তা সমাজে প্রতিফলিত হয়। অশুভ শক্তির বিনাশের শিক্ষা যদি অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে রূপ নেয়, মাতৃশক্তির আরাধনা যদি নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখে এবং সম্প্রীতির বাণী যদি সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অঙ্গীকারে পরিণত হয়, তবেই দুর্গোৎসবের সামাজিক তাৎপর্য পূর্ণতা পাবে।
এই শারদীয় দুর্গোৎসবে আমাদের প্রত্যাশা—প্রতিটি পূজামণ্ডপ হোক আনন্দ, নিরাপত্তা ও সম্প্রীতির কেন্দ্র; প্রতিটি নাগরিকের অধিকার হোক সমানভাবে সুরক্ষিত; ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে কেউ যেন বৈষম্য, ভয় কিংবা সহিংসতার শিকার না হন। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় নেতৃত্ব, গণমাধ্যম, প্রশাসন ও নাগরিক সমাজ সম্মিলিতভাবে বিদ্বেষের পরিবর্তে সহমর্মিতা এবং বিভাজনের পরিবর্তে সহযোগিতার সংস্কৃতি গড়ে তুলুক।
দেবী দুর্গার আরাধনায় যে শুভ শক্তির বিজয় কামনা করা হয়, সেই শুভ শক্তি প্রতিষ্ঠিত হোক আমাদের চিন্তা, আচরণ ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায়। ধর্মীয় উৎসবের আনন্দ ছড়িয়ে পড়ুক মানুষের হৃদয়ে; শক্তিশালী হোক পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও আস্থার বন্ধন।
শারদীয় দুর্গোৎসব হোক শুধু আনন্দের নয়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর, নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠার এবং অসাম্প্রদায়িক, মানবিক ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার।
লেখক: মোহাম্মদ হাসান, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।