ধর্ম-বর্ণের ঊর্ধ্বে বাংলাদেশি পরিচয়, সম্প্রীতির বাংলাদেশ গড়ার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক

প্রকাশ: ২০ অক্টোবর ২০২৬, ১১:০৫ পিএম

চট্টগ্রাম থেকে বিশেষ প্রতিনিধি, মোহাম্মদ হাসান:

ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত করে শান্তিপূর্ণ, বৈষম্যহীন ও সম্প্রীতির বাংলাদেশ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, ধর্মীয় পরিচয় যার যার ব্যক্তিগত বিষয়, কিন্তু রাষ্ট্রের কাছে সব নাগরিকের অধিকার সমান। সংখ্যাগরিষ্ঠ কিংবা সংখ্যালঘু পরিচয় নয়, একজন নাগরিক হিসেবে প্রত্যেকের সমান মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত করাই রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) রাতে চট্টগ্রাম নগরের জেএম সেন হলের শারদীয় দুর্গাপূজামণ্ডপ পরিদর্শন শেষে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ, বিভিন্ন সময়ে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে মানুষ ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে অংশ নেননি। সবার লক্ষ্য ছিল দেশকে স্বাধীন করা, গণতন্ত্র রক্ষা করা এবং জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা।

তিনি বলেন, “আমরা মুসলমান হই, হিন্দু হই, বৌদ্ধ হই কিংবা খ্রিষ্টান হই—ধর্ম আমাদের নিজস্ব বিষয়। কিন্তু আমরা প্রত্যেকেই বাংলাদেশের নাগরিক। যে ধর্মেরই অনুসারী হই না কেন, এই দেশে আমাদের জন্ম, এই দেশেই আমরা বেড়ে উঠছি। তাই আমাদের সবচেয়ে বড় পরিচয়—আমরা বাংলাদেশি।”

মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, ১৯৭১ সালে লাখ লাখ মানুষ দেশকে স্বাধীন করার জন্য মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। তাঁদের অনেকে শহীদ হয়েছেন। সেদিন কেউ বিবেচনা করেননি কে মুসলমান, কে হিন্দু, কে বৌদ্ধ কিংবা কে খ্রিষ্টান। ধর্মীয় পরিচয় নয়, দেশকে স্বাধীন করার আকাঙ্ক্ষাই ছিল সবার কাছে মুখ্য।

তিনি বলেন, পরবর্তী সময়ে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও জনগণের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনেও মানুষ ধর্মীয় পরিচয় ভুলে ঐক্যবদ্ধভাবে রাজপথে নেমেছেন। এসব আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা নিশ্চিত করা।

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ওই সময় স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লাখ লাখ মানুষ রাজপথে নেমে এসেছিলেন। নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর ও তরুণসহ বিভিন্ন বয়স ও শ্রেণি-পেশার মানুষ সেই আন্দোলনে অংশ নেন। গুলিবিদ্ধ কিংবা আহত ব্যক্তির পাশে দাঁড়ানোর আগে কেউ তাঁর ধর্মীয় পরিচয় জানতে চাননি। হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়ার ক্ষেত্রেও ধর্মীয় পরিচয় বিবেচনা করা হয়নি।

তারেক রহমান বলেন, “আমার ভাই শহীদ হয়েছেন, আমার ভাই আহত হয়েছেন। অন্যরা তাঁদের ধরে হাসপাতালে নিয়ে গেছেন। কেউ জিজ্ঞাসা করেননি, তাঁর ধর্মীয় পরিচয় কী। এসব ঘটনা প্রমাণ করে, মানুষের অধিকার ও মানবিকতার প্রশ্নে ধর্মীয় পরিচয় কখনোই মুখ্য নয়।”

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, সংখ্যাগরিষ্ঠ কিংবা সংখ্যালঘু পরিচয়ের ভিত্তিতে কোনো নাগরিকের অধিকার ও মর্যাদা নির্ধারণ করা উচিত নয়। রাষ্ট্রের চোখে সব নাগরিক সমান—এই নীতিই প্রতিষ্ঠিত হওয়া প্রয়োজন।

নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, রাজনৈতিক কারণে তাঁকে দীর্ঘদিন বিদেশে অবস্থান করতে হয়েছে। বাংলাদেশে তিনি সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্মের অনুসারী হলেও লন্ডনে অবস্থানের সময় সেই পরিচয় তাঁকে সংখ্যাগরিষ্ঠ করেনি। এ অভিজ্ঞতা থেকে বোঝা যায়, সংখ্যাগরিষ্ঠ বা সংখ্যালঘু পরিচয়ের চেয়ে একজন মানুষ কোন দেশের নাগরিক, সেটিই অধিক গুরুত্বপূর্ণ।

তারেক রহমান বলেন, দেশের আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। রাষ্ট্রের ওপর প্রত্যেক নাগরিকের সমান অধিকার রয়েছে। রাষ্ট্র একজন নাগরিককে যে অধিকার ও সুযোগ দেবে, অন্য নাগরিকও তা পাবেন। ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে কারও অধিকার খর্ব করা যাবে না।

মুক্তিযুদ্ধ, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলন ও জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের চেতনা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এসব আন্দোলনে যাঁরা জীবন দিয়েছেন, তাঁদের প্রত্যাশা ছিল এমন একটি বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে সব ধর্মের মানুষ শান্তিতে বসবাস করবেন এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ থাকবেন।

তিনি বলেন, “আজ যদি আমরা সেই কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই, তাহলে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আমি আপনাদের সবার সহযোগিতা চাই। আপনি হিন্দু হোন, মুসলমান হোন, বৌদ্ধ হোন কিংবা খ্রিষ্টান হোন—আপনি যে ধর্মেরই অনুসারী হন না কেন, আপনার সহযোগিতা আমার প্রয়োজন। কারণ, আপনাদের সহযোগিতা ছাড়া আমরা প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারব না।”

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন যাঁরা

মতবিনিময় সভায় উপস্থিত ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ, পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী, সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন এবং চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের প্রশাসক মাহবুবের রহমান শামীম।

এ ছাড়া চট্টগ্রামের বিভিন্ন সংসদীয় আসনের সংসদ সদস্য, রাজনৈতিক নেতা এবং সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রতিনিধিরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

যোগাযোগের ঠিকানা:

বাংলাদেশ বার্তা টুডে

৫৬, চানখারপুল লেন, নাজিমুদ্দিন রোড, বংশাল, ঢাকা-১১০০

ইমেইল: info@bangladeshbartatoday.com