বাবার সংগ্রাম, মেয়ের জয়—প্রতিকূলতা পেরিয়ে জাতীয় ব্যাডমিন্টন চ্যাম্পিয়ন যবিপ্রবির লিকা
বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৫০ পিএম
যবিপ্রবি প্রতিনিধি: রাকিবুল হাসান
নদীতে মাছ ধরা বাবার মেয়ে লিকা এখন জাতীয় ব্যাডমিন্টন চ্যাম্পিয়ন, মোংলার সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে জাতীয় মঞ্চে সাফল্য, এবার স্বপ্ন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে
নদীতে মাছ ধরে চার সদস্যের পরিবারের ভরণপোষণ করেন বাবা। সেই পরিবারের মেয়ে লিকা পোদ্দার আজ জাতীয় ব্যাডমিন্টনের নারী এককে চ্যাম্পিয়ন। যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) এই শিক্ষার্থী দীর্ঘ পাঁচ-ছয় বছরের পরিশ্রম, অনুশীলন ও নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে জিতেছেন ৪০তম জাতীয় ব্যাডমিন্টন চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা। তাঁর এই অর্জন কেবল একটি ট্রফি জয়ের ঘটনা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পরিবারের স্বপ্ন, আর্থিক সীমাবদ্ধতার সঙ্গে লড়াই এবং নিজের লক্ষ্যে অবিচল থাকার গল্প।
জীবনের প্রথম সিনিয়র জাতীয় শিরোপা জয়ের পর আনন্দটা সবার আগে ভাগ করে নিতে চেয়েছিলেন মায়ের সঙ্গে। মোংলায় থাকা মাকে ভিডিও কল করেন লিকা। দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণের খবর জানাতে গিয়ে আবেগ সামলাতে পারেননি তিনি। আনন্দে চোখ ভিজে আসে তাঁর। বছরের পর বছর ধরে লালন করা স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেওয়ার মুহূর্তটি হয়ে ওঠে তাঁর জীবনের অন্যতম স্মরণীয় ঘটনা।
৪০তম জাতীয় ব্যাডমিন্টন চ্যাম্পিয়নশিপের নারী এককের ফাইনালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাবেক চ্যাম্পিয়ন উর্মি আক্তারকে পরাজিত করেন ২৪ বছর বয়সী লিকা। নারায়ণগঞ্জ জেলা ক্রীড়া সংস্থার হয়ে খেলা এই শাটলার ২২-২০, ১১-২১ ও ২১-১৮ পয়েন্টে জয় নিশ্চিত করেন। পাঁচ বছরের সিনিয়র ক্যারিয়ারে প্রথমবার ফাইনালে উঠেই শিরোপা জিতে নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছেন তিনি।
পুরোনো কোর্ট থেকে জাতীয় চ্যাম্পিয়নের মঞ্চে
লিকার ব্যাডমিন্টনের যাত্রা শুরু ২০১৯ সালে মোংলায়। শুরুটা ছিল খুব সাধারণ। প্রথম কোচ মিলন সর্দার জুসের তত্ত্বাবধানে একটি পুরোনো সিনেমা হলের ভেতরে তৈরি কোর্টে নিয়মিত অনুশীলন করতেন তিনি। প্রায় তিন থেকে চার বছর সেখানে অনুশীলন করে নিজের খেলার দক্ষতা বাড়ানোর চেষ্টা চালান।
পরবর্তী সময়ে প্রশিক্ষণের জন্য তাঁকে দিনাজপুরে বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের (বিকেএসপি) একাডেমিতে নেওয়া হয়। সেখানকার প্রশিক্ষণ তাঁর খেলোয়াড়ি জীবনে নতুন অভিজ্ঞতা যোগ করে। এ ছাড়া এলোরা শাটলিন অ্যাকাডেমি, কাওসাকি ব্র্যান্ডের স্পনসরশিপ এবং কোচের সহযোগিতাও তাঁর এগিয়ে যাওয়ার পথে ভূমিকা রেখেছে।
তবে এই পথ মোটেও মসৃণ ছিল না। পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য সীমিত হওয়ায় খেলাধুলায় দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিয়ার গড়ে তোলার ক্ষেত্রে নানা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়েছে তাঁকে। নদীতে মাছ ধরে বাবার উপার্জনে চলে সংসার। এমন পরিস্থিতিতে নিয়মিত প্রশিক্ষণ, প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ এবং পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলা চালিয়ে যাওয়া ছিল কঠিন কাজ। তারপরও নিজের স্বপ্ন থেকে সরে আসেননি লিকা।
জাতীয় চ্যাম্পিয়ন হওয়ার অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে লিকা জানান, দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের চ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বপ্ন দেখছিলেন তিনি। গত পাঁচ থেকে ছয় বছর ধরে জাতীয় পর্যায়ে খেলার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। অবশেষে সেই কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পাওয়ায় তিনি অত্যন্ত আনন্দিত ও গর্বিত।
এবারের প্রতিযোগিতায় ছেলেদের বিভাগে ৫১২ জন এবং মেয়েদের বিভাগে ৮৩ জন খেলোয়াড় অংশ নেন। নকআউট পদ্ধতির প্রতিযোগিতায় একের পর এক ম্যাচ জিতে ফাইনালে পৌঁছানো এবং শেষ পর্যন্ত শিরোপা জয় করাকে নিজের ক্যারিয়ারের বিশেষ অর্জন হিসেবে দেখছেন লিকা।
পরিবারের সমর্থনই ছিল বড় শক্তি। খেলাধুলায় মেয়েদের অংশগ্রহণ নিয়ে গ্রামাঞ্চলে এখনো নানা সামাজিক বাধা রয়েছে বলে মনে করেন লিকা। অনেক সময় একজন নারী খেলোয়াড়কে নিজের স্বপ্ন পূরণের পাশাপাশি পরিবারকেও সামাজিক মন্তব্য ও সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়। তাঁর ক্ষেত্রেও প্রতিকূলতা ছিল। তবে পরিবারের সদস্যরা সব সময় তাঁকে উৎসাহ দিয়েছেন।
লিকার মা-বাবারও স্বপ্ন ছিল, একদিন তাঁদের মেয়ে দেশের সেরা খেলোয়াড়দের একজন হবে। পরিবারের সেই প্রত্যাশা পূরণ করতে পেরে নিজেকে ভাগ্যবান মনে করেন তিনি। নিজের সাফল্যের পেছনে প্রথম কোচ মিলন সর্দার জুসের অবদানও বিশেষভাবে স্মরণ করেন এই ব্যাডমিন্টন খেলোয়াড়। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, কোচ সব সময় তাঁকে ভালো করার সুযোগ করে দিতে এবং প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিতে চেষ্টা করেছেন।
পরিবারের অনুপ্রেরণা, কোচের নির্দেশনা এবং নিজের কঠোর পরিশ্রম—এই তিনের সমন্বয়েই দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণ করা সম্ভব হয়েছে বলে মনে করেন লিকা।
পড়াশোনা ও খেলাধুলার মধ্যে সমন্বয়ের চ্যালেঞ্জ
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হিসেবে লিকাকে নিয়মিত ক্লাস, পরীক্ষা ও অনুশীলন—তিনটি বিষয় একসঙ্গে সামলাতে হয়। জাতীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় ভালো করতে হলে নিয়মিত প্রশিক্ষণের বিকল্প নেই। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রমও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ফলে দুই ক্ষেত্রের মধ্যে সময়ের ভারসাম্য বজায় রাখা তাঁর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
যবিপ্রবির ক্রীড়াসুবিধা সম্পর্কে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে লিকা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে জাতীয় পর্যায়ে অংশগ্রহণকারী ও পদকজয়ী অনেক শিক্ষার্থী রয়েছেন। তবে আরও ভালো ফল অর্জনের জন্য নিয়মিত অনুশীলনের পাশাপাশি উন্নত প্রশিক্ষণ এবং দক্ষ কোচ প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে কোচের সীমাবদ্ধতা অনুভব করেন তিনি। কাফি স্যারের পাশাপাশি আরও দক্ষ কোচ যুক্ত করা গেলে খেলোয়াড়েরা উপকৃত হবেন বলে তাঁর প্রত্যাশা।
এ ছাড়া জাতীয় পর্যায়ের খেলোয়াড়দের অনুশীলন ও প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের কারণে কখনো কখনো ক্লাস এবং পরীক্ষার সঙ্গে সময় মেলানো কঠিন হয়ে পড়ে।
নতুন প্রজন্মের খেলোয়াড়দের উদ্দেশে তাঁর পরামর্শ, সাফল্য অর্জনের জন্য নিয়মিত অনুশীলন, শৃঙ্খলা, কোচের নির্দেশনা অনুসরণ এবং নিজের লক্ষ্যের প্রতি নিষ্ঠাবান থাকা জরুরি। এক দিনে বড় অর্জন সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন ধৈর্য, সময় ও নিরবচ্ছিন্ন পরিশ্রম। খেলাধুলা শুধু পরিচিতি ও সম্মানই এনে দেয় না, বরং আর্থিকভাবে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগও তৈরি করতে পারে। তাই আগ্রহীদের আন্তরিকতা নিয়ে শুরু করে ধারাবাহিকভাবে চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
লিকার সাফল্যে গর্বিত বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন
লিকা পোদ্দারের জাতীয় পর্যায়ে এই অর্জনে আনন্দ প্রকাশ করেছে যবিপ্রবি প্রশাসন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শরীরচর্চা দপ্তরের প্রধান দায়িত্বপ্রাপ্ত ড. অভিনু কিবরিয়া বলেন, পড়াশোনার পাশাপাশি ছোটবেলা থেকে খেলাধুলা চালিয়ে এসে লিকার জাতীয় চ্যাম্পিয়ন হওয়া নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। তাঁর এই সাফল্যে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ গর্বিত ও আনন্দিত। ভবিষ্যতেও তিনি আরও ভালো করবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক ক্রীড়াঙ্গন প্রসঙ্গে ড. অভিনু কিবরিয়া জানান, ফুটবল, ক্রিকেট, ব্যাডমিন্টন ও দাবাসহ বিভিন্ন খেলায় যবিপ্রবির শিক্ষার্থীরা সম্প্রতি ভালো পারফরম্যান্স দেখাচ্ছেন। নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও শিক্ষার্থীরা নিজেদের প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন। শারীরিক শিক্ষা বিভাগের শিক্ষক ও কোচদের সহযোগিতা এবং খেলোয়াড়দের নিষ্ঠা বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান শক্তিশালী করতে ভূমিকা রাখছে।
তবে শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা অনুযায়ী সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা এখনো সম্ভব হয়নি বলেও স্বীকার করেন তিনি। সীমাবদ্ধতা থাকলেও শিক্ষার্থীদের সাফল্যের জন্য প্রয়োজনীয় প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে বলে জানান এই কর্মকর্তা। ভবিষ্যতে ক্রীড়াক্ষেত্রে আরও ভালো ফল অর্জনের প্রত্যাশাও ব্যক্ত করেন তিনি।
এবার আন্তর্জাতিক মঞ্চে দেশের প্রতিনিধিত্বের স্বপ্ন
জাতীয় পর্যায়ে নিজের প্রথম সিনিয়র শিরোপা জয়ের পর লিকার সামনে এখন নতুন লক্ষ্য। অর্জিত সাফল্য ধরে রেখে আরও এগিয়ে যাওয়া এবং আন্তর্জাতিক ব্যাডমিন্টনে দেশের জন্য সম্মান বয়ে আনা তাঁর পরবর্তী স্বপ্ন।
মোংলার একটি পুরোনো কোর্টে যে যাত্রার শুরু, কঠোর পরিশ্রম ও অধ্যবসায়ের মধ্য দিয়ে সেই যাত্রা আজ তাঁকে জাতীয় চ্যাম্পিয়নের আসনে বসিয়েছে। আর্থিক সীমাবদ্ধতা, সামাজিক বাধা ও পড়াশোনার চাপের মধ্যেও নিজের লক্ষ্যে অবিচল থাকার এই গল্প অন্য তরুণ খেলোয়াড়দের জন্যও অনুপ্রেরণা হতে পারে।
নদীতে মাছ ধরে সংসার চালানো বাবার মেয়ের হাতে আজ জাতীয় শিরোপা। এই অর্জন লিকার ব্যক্তিগত সাফল্যের পাশাপাশি তাঁর পরিবারের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ও সংগ্রামেরও প্রতিফলন। এবার জাতীয় পর্যায়ের সাফল্যকে পুঁজি করে আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের পতাকা তুলে ধরাই তাঁর প্রত্যাশা।