কলাপাড়ায় শিশু রাইয়ান হত্যা: আদালতে খালুর স্বীকারোক্তি, পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৫৫ পিএম
কলাপাড়া (পটুয়াখালী) প্রতিনিধি:
পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় ১০ মাস বয়সী শিশু রাইয়ান হত্যা মামলায় আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন তার আপন খালু আল-আমিন। চার দিনের পুলিশি রিমান্ড শেষে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দিতে শিশু রাইয়ানকে নিয়ে যাওয়া, মরদেহ গোপন করার চেষ্টা এবং হত্যার পেছনে ব্যক্তিগত বিরোধের কথা তুলে ধরেছেন তিনি। এদিকে সন্তান হারানোর শোকের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বলে অভিযোগ করেছেন শিশুটির মা রুমানা বেগম। তিনি এ ঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন।
পুলিশ জানায়, নিখোঁজের ৫৩ ঘণ্টা পর গত ১৭ অক্টোবর বাড়ির পাশের একটি খাল থেকে রাইয়ানের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় গ্রেপ্তার আল-আমিন বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। মামলাটির পরবর্তী আইনগত কার্যক্রম চলমান।
জবানবন্দিতে যেভাবে ঘটনার বর্ণনা
আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির বরাতে জানা যায়, ঘটনার দিন ভোরে আজানের সময় আল-আমিন তার শ্যালিকা রুমানা বেগমের বাড়িতে যান। সে সময় রুমানা ঘরের কাজ করছিলেন এবং শিশু রাইয়ান তার বাবার কাছে বিছানায় ঘুমিয়ে ছিল। জবানবন্দি অনুযায়ী, আল-আমিন শিশুটিকে কোলে তুলে নিয়ে তার মুখ চেপে ধরে নিজের বাড়ির দিকে চলে যান।
পরে গ্রামের হেলাল নামের এক ব্যক্তির পরিত্যক্ত ঘরে শিশুটিকে নিয়ে গেলে তাকে নিথর অবস্থায় দেখতে পান বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন আল-আমিন। এরপর কাপড়ের একটি কালো ব্যাগে শিশুটির মরদেহ ঢুকিয়ে ব্যাগটি ওই ঘরের টিনের চালায় রেখে দেন। পরে পুকুরে নেমে শরীর ভিজিয়ে নেন, যাতে তাকে দেখে কেউ মাছ ধরে ফেরার ব্যক্তি বলে মনে করেন—এমন বর্ণনাও জবানবন্দিতে রয়েছে।
এরপর ব্যাগটি নিজের বাড়ির পেছনের একটি খালে ফেলে দেন বলে স্বীকারোক্তিতে উল্লেখ করেন তিনি। ব্যাগটি পানিতে ডুবে না যাওয়ায় পরে সেটি কচুরিপানার মধ্যে লুকিয়ে রাখেন বলে জবানবন্দিতে জানান আল-আমিন।
শিশু রাইয়ান নিখোঁজ হওয়ার খবর পাওয়ার পর অন্যদের সঙ্গে তিনিও খোঁজাখুঁজিতে অংশ নেন বলে স্বীকারোক্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
ব্যক্তিগত বিরোধের কথা জবানবন্দিতে
জবানবন্দিতে আল-আমিন দাবি করেন, তার স্ত্রী ফিরোজা বেগম পাঁচ বছর ধরে বিদেশে থাকতেন। স্ত্রীকে দেশে ফিরিয়ে আনা ও পারিবারিক বিরোধ মেটানোর বিষয়ে তিনি বিভিন্নজনের কাছে গিয়েও সমাধান পাননি বলে দাবি করেন। এ বিষয়ে শ্যালিকা রুমানা বেগমের সঙ্গে বিরোধ তৈরি হয়েছিল বলেও জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন তিনি।
আল-আমিনের ভাষ্য অনুযায়ী, রুমানার আচরণে ক্ষুব্ধ হয়ে তার ক্ষতি করার চিন্তা করেন তিনি। এর আগে কয়েকবার শিশু রাইয়ানকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন বলে স্বীকারোক্তিতে উল্লেখ করেন। পরে শিশুটিকে নিয়ে যাওয়ার পর হত্যার কথা স্বীকার করেন তিনি।
তবে জবানবন্দিতে দেওয়া এসব বক্তব্যের স্বাধীন যাচাই এবং মামলার তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ায় প্রমাণের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
পুলিশের বক্তব্য
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কলাপাড়া থানার উপপরিদর্শক মো. ফোরকান মিয়া জানান, আদালতের নির্দেশে ১৮ অক্টোবর প্রধান আসামি আল-আমিনকে থানায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। চার দিনের রিমান্ড শেষে তিনি হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দেন। পরে তাকে আদালতে সোপর্দ করা হলে আদালত কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
কলাপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নজরুল ইসলাম বলেন, পুলিশ গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে প্রধান আসামিকে আটক করেছে। নিখোঁজের ৫৩ ঘণ্টা পর শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করা হয়। আসামি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। মামলার পরবর্তী আইনগত প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
পরিবারের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার কোনো ঘটনা ঘটলে তাৎক্ষণিকভাবে থানায় জানানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে বলেও জানান ওসি।
পরিবারের অভিযোগ, নিরাপত্তাহীনতায় রুমানা
শিশু রাইয়ানের মা রুমানা বেগম অভিযোগ করেন, তার ছেলেকে ঘাড় মটকে এবং হাত-পা ভেঙে হত্যার পর কাপড়ের ব্যাগে ভরে কচুরিপানার নিচে খালে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। এ ঘটনায় তার ভগ্নিপতি আল-আমিনকে দায়ী করে তিনি যথাযথ বিচার দাবি করেন।
রুমানার অভিযোগ, শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর আল-আমিন অন্যদের মতো খোঁজাখুঁজিতে অংশ নেওয়ার ভান করেছিলেন। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে পুলিশের পৃথক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
রুমানা আরও অভিযোগ করেন, আল-আমিনকে গ্রেপ্তারের পর তার সহযোগী ও কথিত প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কাছ থেকে হুমকি পেয়েছেন তিনি। তার দাবি, ১৫ অক্টোবর আল-আমিনকে আটকের রাতে এক ব্যক্তি কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে তাদের বাড়ির সামনে গিয়ে গালাগাল করেন এবং আল-আমিনকে ছাড়িয়ে না আনলে ভয়াবহ পরিণতির হুমকি দেন।
রুমানার ভাষ্য অনুযায়ী, অভিযুক্ত ওই ব্যক্তি একটি রাজনৈতিক দলের সদস্য এবং তার বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করা হয়েছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তিনি জানান, তার ১৪ বছর বয়সী মাদ্রাসাছাত্রী মেয়ে তানহা, আট বছর বয়সী মেয়ে তাহিরা এবং কর্মজীবী স্বামী রাসেল খানের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বিগ্ন রয়েছেন। পরিবারের সদস্যরা এ ঘটনায় মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন বলেও জানান তিনি।
মাদক ও চুরির অভিযোগ
রুমানা দাবি করেন, আল-আমিন মাদক সেবন ও মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িত। তার অভিযোগ, গুটাবাছা গ্রামের তিনটি টিউবওয়েল এবং পানির পাম্প চুরির সঙ্গেও আল-আমিন জড়িত ছিলেন। আগে তিনি ভাড়ায় মোটরসাইকেল চালাতেন বলেও জানান রুমানা।
এ ছাড়া ৫ আগস্টের পর বিএনপির পরিচয় ব্যবহার করে আল-আমিন বেপরোয়া হয়ে ওঠেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অভিযোগগুলোর সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
রুমানার দাবি, তার বোন ফিরোজার সঙ্গে আল-আমিনের দাম্পত্য বিরোধকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট ক্ষোভ থেকেই এ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে।
৫৩ ঘণ্টা পর খাল থেকে মরদেহ উদ্ধার
এর আগে গত ১৫ অক্টোবর পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার নীলগঞ্জ ইউনিয়নের গুটাবাছা গ্রামে বাবার কোলে ঘুমিয়ে থাকা অবস্থায় নিখোঁজ হয় ১০ মাস বয়সী শিশু রাইয়ান। সে ওই গ্রামের রাসেল খানের ছেলে।
নিখোঁজের প্রায় ৫৩ ঘণ্টা পর ১৭ অক্টোবর বাড়ির পাশের একটি খাল থেকে শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। স্থানীয়রা প্রথমে দুর্গন্ধ পান। পরে কচুরিপানার মধ্যে একটি ব্যাগ দেখতে পেয়ে পুলিশকে খবর দেন। পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে ব্যাগের ভেতর থেকে শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করে।
এ ঘটনায় গুটাবাছা গ্রামসহ আশপাশের এলাকায় শোক ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। শিশুটির পরিবার ও স্থানীয়রা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং দ্রুত বিচার দাবি করেছেন।