বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়: সংস্কারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে অগ্রগতি কোথায়?
বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৪৮ এএম
বিশেষ প্রতিনিধি, সঞ্জয় মজুমদার: ঢাকা, ২৬ অক্টোবর ২০২৬
বাংলাদেশে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে পৃথক সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তা ২০২৬ সালে আইনগত ও প্রশাসনিক জটিলতার মুখে পড়ে। অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা সচিবালয় অধ্যাদেশ সংসদে বাতিল হওয়ার পর হাইকোর্টের প্রতিষ্ঠা-সংক্রান্ত রায়ের কার্যকারিতাও স্থগিত করেন আপিল বিভাগ। ফলে বিচার বিভাগের প্রশাসনিক স্বায়ত্তশাসন জোরদার করার উদ্যোগের বাস্তব অগ্রগতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
২০২৫ সালের ২ সেপ্টেম্বর হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ অধস্তন আদালতের বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলাসংক্রান্ত সাংবিধানিক বিধান নিয়ে রায় দেন। রায়ে সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদের সংশ্লিষ্ট বিধান অসাংবিধানিক ঘোষণা করে মূল সংবিধানের বিধান পুনর্বহালের কথা বলা হয়। একই সঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের জন্য পৃথক ও স্বাধীন সচিবালয় প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দেওয়া হয়।
রায়ের পূর্ণাঙ্গ ১৮৫ পৃষ্ঠার পাঠ ২০২৬ সালের ৭ এপ্রিল প্রকাশিত হয়। এর আগে ২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বর অন্তর্বর্তী সরকার সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ জারি করেছিল। অধ্যাদেশটির উদ্দেশ্য ছিল অধস্তন আদালতের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় সুপ্রিম কোর্টের ভূমিকা বাড়ানো এবং নির্বাহী বিভাগের ওপর নির্ভরতা কমানো।
তবে পরবর্তী সময়ে আইনগত পরিস্থিতি বদলে যায়। ২০২৬ সালের ৯ এপ্রিল জাতীয় সংসদে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ বাতিলের আইন পাস হয়। একই সময়ে সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ-সংক্রান্ত অধ্যাদেশও বাতিল করা হয়। এর ফলে বিচারক নিয়োগের জন্য পৃথক আইনগত কাঠামো এবং স্বাধীন সচিবালয় প্রতিষ্ঠার ভিত্তি আর বহাল থাকেনি।
অধ্যাদেশগুলো বাতিলের পর বিচারক নিয়োগ ও বিচার বিভাগের প্রশাসনিক কার্যক্রম আগের কাঠামোয় ফিরে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়।
সংসদে অধ্যাদেশ বাতিলের পর সচিবালয় প্রতিষ্ঠা নিয়ে আইনি বিরোধ অব্যাহত থাকে। সরকার ২০২৬ সালের ২১ মে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে। এরপর ৯ জুন আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায়ের কার্যকারিতা স্থগিত করেন। ১৬ জুন শুনানি পিছিয়ে ১ সেপ্টেম্বর নির্ধারণ করা হয়েছিল।
এই স্থগিতাদেশের অর্থ হলো, হাইকোর্টের রায়ে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার নির্দেশটি আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত কার্যকর থাকছে না। তবে স্থগিতাদেশকে হাইকোর্টের রায় চূড়ান্তভাবে বাতিল হয়ে যাওয়া হিসেবে ব্যাখ্যা করা ঠিক হবে না।
২৫ অক্টোবর পর্যন্ত পর্যালোচিত প্রকাশ্য সংবাদসূত্রে ১ সেপ্টেম্বরের পর আপিলের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে মামলাটির বর্তমান অবস্থা জানতে সুপ্রিম কোর্টের সর্বশেষ আদেশ ও কার্যতালিকা যাচাই করা প্রয়োজন।
বিচার বিভাগের সংস্কারের প্রশ্নটি শুধু সচিবালয় প্রতিষ্ঠার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিচারক নিয়োগের স্বচ্ছতা, অধস্তন আদালতের প্রশাসনিক স্বাধীনতা, বিচার বিভাগের বাজেট ও জনবল ব্যবস্থাপনা এবং আদালতের কার্যক্রম বিকেন্দ্রীকরণের মতো বিষয়ও এর সঙ্গে যুক্ত।
২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ প্রকাশিত The Daily Star-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশগুলোর বড় অংশ বাস্তবায়িত হয়নি। প্রতিবেদনটিতে বিচারক নিয়োগের পৃথক অধ্যাদেশ ও সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়-সংক্রান্ত অধ্যাদেশ বাতিলের ঘটনাকে সংস্কার প্রক্রিয়ার পেছনে যাওয়ার উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিচারকদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশ, স্বাধীন অপরাধ তদন্ত সংস্থা গঠন, স্থায়ী অ্যাটর্নি সার্ভিস প্রতিষ্ঠা এবং আদালত বিকেন্দ্রীকরণের মতো বিষয়ও সংস্কার আলোচনায় ছিল। এসব প্রস্তাবের কিছু বাস্তবায়নে সাধারণ আইন বা প্রশাসনিক পদক্ষেপ যথেষ্ট হতে পারে, অন্যগুলোর জন্য সাংবিধানিক পরিবর্তন প্রয়োজন হতে পারে।
এখানে একটি পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ। কমিশনের সুপারিশ, রাজনৈতিক ঐকমত্য এবং আইনগতভাবে কার্যকর সিদ্ধান্ত এক বিষয় নয়। কোনো প্রস্তাব আলোচনায় থাকা মানেই সেটি বাস্তবায়িত হয়েছে—এমন নয়।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতার মূল উদ্দেশ্য হলো, বিচারকরা যেন আইন ও প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন এবং বিচারিক দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে অনুচিত নির্বাহী বা রাজনৈতিক চাপের মুখে না পড়েন। এ জন্য বিচারক নিয়োগ, পদায়ন, পদোন্নতি, শৃঙ্খলা এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছ ও কার্যকর নিয়ম থাকা প্রয়োজন।
পৃথক সচিবালয়ের সমর্থকদের যুক্তি হলো, বিচার বিভাগের নিজস্ব প্রশাসনিক কাঠামো থাকলে অধস্তন আদালতের ব্যবস্থাপনায় নির্বাহী বিভাগের প্রভাব কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে, কোনো কাঠামো কার্যকর করতে হলে তার সাংবিধানিক ভিত্তি, ক্ষমতার সীমা, জবাবদিহি এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনা স্পষ্ট থাকা দরকার।
সুতরাং সচিবালয় প্রতিষ্ঠা নিজেই বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতার নিশ্চয়তা নয়। এর কার্যকারিতা নির্ভর করবে নিয়োগ ও পদায়নের নিয়ম, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা, বাজেট ব্যবস্থাপনা এবং জবাবদিহির ব্যবস্থার ওপর।
সংসদে অধ্যাদেশ বাতিল এবং পরবর্তী বিচারিক কার্যক্রম দেখায় যে বিচার বিভাগ সংস্কারের প্রশ্নে আইনসভা, নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগের ভূমিকা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ মতপার্থক্য রয়েছে। বিষয়টি সংবিধানের ব্যাখ্যা, ক্ষমতার পৃথকীকরণ এবং বিচার বিভাগের প্রশাসনিক কর্তৃত্বের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
তবে কোনো পক্ষের সিদ্ধান্তকে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার পক্ষে বা বিপক্ষে চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে দেখানোর আগে সংশ্লিষ্ট আইন, সংসদীয় বিতর্ক, আদালতের আদেশ এবং সরকারের ব্যাখ্যা একসঙ্গে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। এ বিষয়ে চূড়ান্ত আইনি অবস্থান নির্ধারণের দায়িত্ব আদালতের।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা দেশের নাগরিক অধিকার, ব্যবসায়িক বিরোধ নিষ্পত্তি, চুক্তি কার্যকর করা এবং সরকারি সিদ্ধান্তের আইনি পর্যালোচনার সঙ্গে সম্পর্কিত। কার্যকর ও নিরপেক্ষ বিচারব্যবস্থা দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা তৈরিতে সহায়তা করতে পারে। তবে সচিবালয় অধ্যাদেশ বাতিলের কারণে বিনিয়োগ কমেছে বা অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে—এমন সরাসরি সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হলে নির্দিষ্ট অর্থনৈতিক তথ্য ও প্রমাণ প্রয়োজন।
বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ হলো বিচার বিভাগ সংস্কারের বিষয়ে আইনি অনিশ্চয়তা কমানো এবং সংস্কারের প্রতিটি ধাপের অগ্রগতি জনসমক্ষে স্পষ্ট করা। এর মধ্যে রয়েছে বিচারক নিয়োগের স্বচ্ছ মানদণ্ড, অধস্তন আদালতের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা, পর্যাপ্ত বাজেট, মামলা নিষ্পত্তির সক্ষমতা এবং বিচারপ্রার্থীদের ন্যায়বিচার পাওয়ার সুযোগ।
এই মুহূর্তে তিনটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় নিয়ে আপিল বিভাগের পরবর্তী আদেশ কী। দ্বিতীয়ত, সরকার বিচারক নিয়োগ ও বিচার বিভাগের প্রশাসনিক স্বায়ত্তশাসন নিয়ে নতুন কোনো আইন বা সংশোধনী আনে কি না। তৃতীয়ত, বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের অন্যান্য সুপারিশ বাস্তবায়নে নির্দিষ্ট সময়সীমা ও জবাবদিহির ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় কি না।
এসব বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া গেলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে সংস্কারের প্রকৃত অগ্রগতি আরও স্পষ্টভাবে মূল্যায়ন করা সম্ভব হবে।
সারকথা: বাংলাদেশে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হলেও পৃথক সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক বাধার মুখে পড়েছে। এখন মূল প্রশ্ন হলো, চলমান আইনি প্রক্রিয়ার নিষ্পত্তি এবং পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপের মাধ্যমে বিচার বিভাগের প্রশাসনিক স্বায়ত্তশাসন কীভাবে নিশ্চিত করা হবে।