চট্টগ্রামে রেডিওআয়োডিন সংকট: থমকে আছে থাইরয়েড ক্যান্সার রোগীদের পরবর্তী চিকিৎসা
বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:২১ পিএম
চট্টগ্রাম থেকে বিশেষ প্রতিনিধি মোহাম্মদ হাসান :
থাইরয়েড ক্যান্সারের চিকিৎসায় অস্ত্রোপচারের পর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রেডিওআয়োডিন থেরাপি। অথচ এই চিকিৎসায় ব্যবহৃত রেডিওআয়োডিন ক্যাপসুলের সংকটে চট্টগ্রামে গত প্রায় এক মাস ধরে ব্যাহত হচ্ছে রোগীদের চিকিৎসাসেবা। সরকারি সরবরাহ বন্ধ থাকায় অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করা অনেক রোগী পরবর্তী ধাপের চিকিৎসা নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন। কবে নাগাদ ক্যাপসুলের সরবরাহ স্বাভাবিক হবে, তা নিশ্চিত করে বলতে পারছে না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
রোগীদের জন্য সংকটটি কেবল একটি ওষুধের অভাব নয়; বরং ক্যান্সারের চিকিৎসার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা নিয়েও তৈরি হয়েছে উদ্বেগ। নির্ধারিত সময়ে থেরাপি নিতে না পারায় রোগী ও তাঁদের স্বজনদের মধ্যে বাড়ছে উৎকণ্ঠা।
সরকারি সরবরাহের ওপর নির্ভরতা
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, রেডিওআয়োডিন ক্যাপসুল মূলত দক্ষিণ আফ্রিকা ও পোল্যান্ড থেকে আমদানি করা হয়। বাংলাদেশে বেসরকারিভাবে এই ওষুধ বিপণনের আইনি অনুমোদন না থাকায় রোগীদের চিকিৎসার জন্য সরকারি সরবরাহব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে হয়।
বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের অধীন ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার মেডিসিন অ্যান্ড অ্যালাইড সায়েন্সেস (ইনমাস) এই ক্যাপসুল সরবরাহ ও থেরাপি কার্যক্রম পরিচালনা করে। চট্টগ্রাম অঞ্চলের রোগীদের এ চিকিৎসা দেওয়া হয় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ২৯ নম্বর ওয়ার্ডের ১২ নম্বর কেবিনে।
ইনমাস চট্টগ্রামের পরিচালক অধ্যাপক ডা. পবিত্র কুমার ভট্টাচার্য্য জানান, কিছুদিন ধরে ক্যাপসুলটির সংকট চলছে। প্রয়োজনীয় চাহিদা পাঠানো হয়েছে এবং আমদানির প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। দ্রুত সরবরাহ স্বাভাবিক হবে বলে তাঁরা আশা করছেন।
তবে ঠিক কবে নাগাদ ক্যাপসুল পাওয়া যাবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা জানাতে পারেননি তিনি।
প্রতি মাসে ২০ থেকে ২৪ রোগীর চিকিৎসা
ইনস্টিটিউট সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রাম কেন্দ্রে প্রতি মাসে গড়ে ২০ থেকে ২৪ জন থাইরয়েড ক্যান্সারের রোগী রেডিওআয়োডিন থেরাপি নিয়ে থাকেন। কিন্তু টানা প্রায় এক মাস সরবরাহ বন্ধ থাকায় অনেক রোগীর নির্ধারিত চিকিৎসার সময়সূচি পিছিয়ে যাচ্ছে।
ক্যান্সারের মতো জটিল রোগের চিকিৎসায় সময়মতো প্রয়োজনীয় সেবা পাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ অবস্থায় ওষুধের সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা রোগীদের চিকিৎসা পরিকল্পনাকে আরও জটিল করে তুলছে। একই সঙ্গে দীর্ঘ অপেক্ষায় রোগী ও তাঁদের পরিবারের মানসিক চাপও বাড়ছে।
আগেও দেখা দিয়েছিল একই সংকট
চট্টগ্রামে রেডিওআয়োডিন ক্যাপসুলের সংকট এবারই প্রথম নয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের জানুয়ারিতেও এই ওষুধের সরবরাহ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। সেই সংকট কাটিয়ে সরবরাহ স্বাভাবিক হতে আগস্ট পর্যন্ত সময় লেগেছিল।
আবারও একই ধরনের পরিস্থিতির সৃষ্টি হওয়ায় ওষুধ আমদানি ও সরবরাহব্যবস্থার ধারাবাহিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষায়িত এই চিকিৎসার জন্য আমদানিনির্ভরতার পাশাপাশি পর্যাপ্ত মজুত ও সময়মতো সরবরাহ নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ রেডিওআয়োডিন থেরাপি?
চিকিৎসকদের মতে, থাইরয়েড গ্রন্থির ক্যান্সারে অস্ত্রোপচারের পর রোগীর ধরন, ঝুঁকি ও শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় রেডিওআয়োডিন থেরাপি দেওয়া হয়। এ চিকিৎসায় আয়োডিন-১৩১ (I-131) নামের তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ ব্যবহার করা হয়। এটি শরীরে থেকে যাওয়া অবশিষ্ট থাইরয়েড টিস্যু এবং নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে অবশিষ্ট ক্যান্সার কোষ ধ্বংস করতে সহায়তা করে।
অস্ত্রোপচারের পর কার কখন এই থেরাপি প্রয়োজন, তা রোগীর চিকিৎসাগত অবস্থা অনুযায়ী নির্ধারণ করা হয়। তাই সরবরাহ সংকটে চিকিৎসার সময়সূচি পিছিয়ে গেলে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। থেরাপি বিলম্বিত হওয়ার প্রভাব রোগীভেদে ভিন্ন হতে পারে; এ বিষয়ে চিকিৎসকের মূল্যায়নই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
দ্রুত সরবরাহ স্বাভাবিক করার দাবি
রেডিওআয়োডিন ক্যাপসুলের চলমান সংকট নিরসনে দ্রুত আমদানি সম্পন্ন করে সরবরাহ স্বাভাবিক করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। পাশাপাশি ভবিষ্যতে এ ধরনের সংকট এড়াতে নিয়মিত চাহিদা নিরূপণ, পর্যাপ্ত মজুত এবং আমদানি প্রক্রিয়ার কার্যকর তদারকি প্রয়োজন।
কর্তৃপক্ষ দ্রুত সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার আশ্বাস দিলেও নির্দিষ্ট তারিখ না থাকায় অপেক্ষায় থাকা রোগীদের উদ্বেগ কাটছে না। থাইরয়েড ক্যান্সারের চিকিৎসার গুরুত্বপূর্ণ এই ধাপে যেন ওষুধের অভাবে কাউকে দীর্ঘ অনিশ্চয়তায় থাকতে না হয়, সে জন্য দ্রুত কার্যকর উদ্যোগের প্রত্যাশা রোগী ও তাঁদের স্বজনদের।
এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—কবে নাগাদ চট্টগ্রামে রেডিওআয়োডিন ক্যাপসুলের সরবরাহ স্বাভাবিক হবে এবং পিছিয়ে পড়া রোগীদের চিকিৎসা কার্যক্রম পুরোপুরি চালু করা সম্ভব হবে?