সংস্কৃতি বনাম অপসংস্কৃতি: বিপন্ন মূল্যবোধ ও যুবসমাজের ভবিষ্যৎ

বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক

প্রকাশ: ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৪১ পিএম

সংস্কৃতি একটি জাতির আত্মপরিচয়, ঐতিহ্য ও অস্তিত্বের প্রতীক। মানুষের জীবনযাপন, চিন্তাচেতনা, ভাষা, সাহিত্য, পোশাক, সংগীত, আচার-আচরণ ও মূল্যবোধের সম্মিলিত রূপেই গড়ে ওঠে সংস্কৃতি। সংস্কৃতি মানুষকে সুন্দরভাবে বাঁচতে শেখায়, মানবিক করে, বিবেককে জাগ্রত করে এবং সমাজকে কল্যাণের পথে এগিয়ে নেয়। অন্যদিকে, সংস্কৃতির নামে যখন অশালীনতা, অনৈতিকতা, দায়িত্বহীনতা ও বিবেকবর্জিত আচরণের বিস্তার ঘটে, তখন তা অপসংস্কৃতির রূপ নেয়। বর্তমান সময়ে প্রযুক্তি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও পরিবর্তিত জীবনধারার প্রভাবে অপসংস্কৃতির বিস্তার নিয়ে সমাজে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তা নতুন করে ভাবনার দাবি রাখে।

সংস্কৃতির বিকাশ, অপসংস্কৃতির অবক্ষয়

সংস্কৃতি কোনো স্থির বিষয় নয়; সময়, সমাজ ও মানুষের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে এর বিকাশ ঘটে। একটি জাতির ইতিহাস, ঐতিহ্য, সাহিত্য, লোকসংগীত, উৎসব, সামাজিক মূল্যবোধ ও পারস্পরিক সৌহার্দ্য তার সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করে। বাঙালির সংস্কৃতির শিকড় গ্রামবাংলার লোকজ ঐতিহ্য, বাউলগান, পল্লিগীতি, কবিতা, নাটক, ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।

অপসংস্কৃতি বলতে কেবল বিদেশি পোশাক, গান কিংবা জীবনযাপনের ধরনকে বোঝায় না। বিদেশি সংস্কৃতির সবকিছুই অপসংস্কৃতি—এমন ধারণাও সঠিক নয়। বরং যে আচরণ মানুষের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করে, অন্যের প্রতি অসম্মান তৈরি করে, সহিংসতা ও অসহিষ্ণুতাকে উৎসাহিত করে কিংবা নৈতিক দায়িত্ববোধকে দুর্বল করে, সেটিই অপসংস্কৃতির আলোচনায় বিবেচ্য। কোনো আচরণ দেশি না বিদেশি, তা নয়; বরং তার প্রভাব, উদ্দেশ্য ও সামাজিক পরিণতিই হওয়া উচিত মূল্যায়নের প্রধান মানদণ্ড।

যুবসমাজ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব

যুবসমাজ একটি দেশের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় শক্তি। তাদের মেধা, সৃজনশীলতা, কর্মশক্তি ও উদ্ভাবনী চিন্তার ওপর নির্ভর করে জাতির ভবিষ্যৎ। অথচ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অযাচিত ব্যবহার, ক্ষতিকর অনলাইন প্রবণতা, জনপ্রিয়তার মোহ এবং যাচাইহীন বিষয়বস্তু অনুসরণের কারণে অনেক তরুণ-তরুণী নানা ধরনের নেতিবাচক প্রভাবের মুখোমুখি হচ্ছে।

ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটকসহ বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে যেমন জ্ঞান অর্জন, সৃজনশীলতা প্রকাশ ও ইতিবাচক সামাজিক উদ্যোগের সুযোগ রয়েছে, তেমনি রয়েছে অপমানজনক বক্তব্য, গুজব, অনলাইন হয়রানি, সহিংসতার প্রচার এবং দায়িত্বহীন বিনোদনের ঝুঁকি। সাময়িক জনপ্রিয়তা অর্জনের আশায় কেউ কেউ ব্যক্তিগত মর্যাদা, সামাজিক দায়িত্ব ও শালীনতার সীমা উপেক্ষা করছে। তবে সব তরুণ কিংবা সব ডিজিটাল কনটেন্টকে একই দৃষ্টিতে দেখা যুক্তিসংগত নয়। প্রয়োজন সচেতনতা, বিচারবোধ ও দায়িত্বশীল ব্যবহার।

অপসংস্কৃতির বিস্তারে পরিবার ও সমাজের দায়

অপসংস্কৃতির বিস্তারকে শুধু তরুণ প্রজন্মের ব্যর্থতা হিসেবে দেখলে সমস্যার প্রকৃত কারণ আড়ালে থেকে যায়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, সামাজিক পরিবেশ এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থারও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। পরিবারে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহমর্মিতা ও নৈতিক শিক্ষার চর্চা দুর্বল হলে সন্তানদের মধ্যে দায়িত্ববোধ গড়ে তোলা কঠিন হয়ে পড়ে। একইভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কেবল পরীক্ষার ফল ও সনদ অর্জনকে গুরুত্ব দিয়ে মানবিক মূল্যবোধ, সৃজনশীলতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধের চর্চাকে অবহেলা করলেও তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

বেকারত্ব, হতাশা, মাদকাসক্তি, অসুস্থ প্রতিযোগিতা এবং ইতিবাচক বিনোদনের অভাবও তরুণদের ঝুঁকিপূর্ণ আচরণের দিকে ঠেলে দিতে পারে। তাই অপসংস্কৃতি প্রতিরোধের নামে কেবল নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলেই চলবে না; এর পেছনের সামাজিক ও মানসিক কারণগুলোও চিহ্নিত করতে হবে।

নৈতিক অবক্ষয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সংকট

সংস্কৃতির মূল শক্তি হলো মানবিকতা, সৌন্দর্যবোধ ও বিবেকের বিকাশ। অথচ যখন ব্যক্তিস্বার্থ, ভোগবাদ, অসহিষ্ণুতা, পরনিন্দা ও দায়িত্বহীনতা সামাজিক জীবনে প্রাধান্য পায়, তখন সাংস্কৃতিক মূল্যবোধও দুর্বল হয়ে পড়ে। মানুষের পোশাক কিংবা বাহ্যিক জীবনযাপন দিয়ে তার নৈতিকতা বিচার করা যায় না; বরং তার আচরণ, চিন্তা, অন্যের প্রতি সম্মান এবং সামাজিক দায়িত্ববোধের মধ্যেই মূল্যবোধের প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ পায়।

আমাদের মনে রাখতে হবে, নিজস্ব সংস্কৃতিকে ভালোবাসা মানে অন্য সংস্কৃতিকে ঘৃণা করা নয়। বিশ্বায়নের এই সময়ে বিভিন্ন দেশের সাহিত্য, সংগীত, শিল্প ও জ্ঞানচর্চা থেকে শেখার সুযোগ রয়েছে। অন্য সংস্কৃতির ভালো দিক গ্রহণ এবং ক্ষতিকর প্রবণতা প্রত্যাখ্যান করার মধ্য দিয়েই একটি জাতি আত্মপরিচয় অক্ষুণ্ন রেখে এগিয়ে যেতে পারে।

প্রতিরোধে প্রয়োজন সচেতনতা ও সৃজনশীল চর্চা

অপসংস্কৃতির নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলায় পরিবারকে সন্তানদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। তাদের মতামত শোনা, যুক্তিবোধ বিকাশে সহায়তা করা এবং অনলাইন কার্যক্রম সম্পর্কে সচেতন করা জরুরি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সাহিত্য, সংগীত, নাটক, বিতর্ক, খেলাধুলা ও দেশীয় ঐতিহ্যভিত্তিক কার্যক্রম বাড়াতে হবে। গণমাধ্যমের দায়িত্বশীল ভূমিকা, মানসম্মত বিনোদন এবং ইতিবাচক সাংস্কৃতিক উদ্যোগও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

একই সঙ্গে তরুণদের মাদক, সহিংসতা, অনলাইন হয়রানি ও ক্ষতিকর প্রবণতা থেকে দূরে রাখতে কর্মসংস্থান, মানসিক সহায়তা, খেলাধুলা এবং সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন। নিষেধের সংস্কৃতির পরিবর্তে যুক্তি, শিক্ষা, সহমর্মিতা ও ইতিবাচক বিকল্পের মাধ্যমে সুস্থ সাংস্কৃতিক পরিবেশ গড়ে তোলা অধিক কার্যকর।

উপসংহার

সংস্কৃতি একটি জাতির শেকড়, আর মানবিক মূল্যবোধ তার বিকাশের শক্তি। যে সংস্কৃতি মানুষকে উদার, দায়িত্বশীল, সৃজনশীল ও মানবিক করে, সেই সংস্কৃতিই সমাজের অগ্রযাত্রাকে সমৃদ্ধ করে। বিপরীতে, যে প্রবণতা মানুষকে অসহিষ্ণু, দায়িত্বহীন ও বিবেকবর্জিত করে তোলে, তা থেকে সমাজকে রক্ষা করা জরুরি।

আজকের যুবসমাজই আগামী দিনের বাংলাদেশ নির্মাণ করবে। তাই তাদের ওপর কেবল অভিযোগ চাপিয়ে না দিয়ে সঠিক শিক্ষা, সুস্থ বিনোদন, কর্মসংস্থান, সাংস্কৃতিক চর্চা ও মানবিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। দেশীয় ঐতিহ্যকে ধারণ করে বিশ্বসংস্কৃতির ইতিবাচক দিক গ্রহণের মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। মনে রাখতে হবে, সংস্কৃতি রক্ষার অর্থ পরিবর্তনকে অস্বীকার করা নয়; বরং পরিবর্তনের মধ্যেও নিজের পরিচয়, মানবিকতা ও মূল্যবোধকে সমুন্নত রাখা। এ দায়িত্ব পরিবার, সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম ও রাষ্ট্র—সবার।

লেখক: মোহাম্মদ হাসান, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

যোগাযোগের ঠিকানা:

বাংলাদেশ বার্তা টুডে

৫৬, চানখারপুল লেন, নাজিমুদ্দিন রোড, বংশাল, ঢাকা-১১০০

ইমেইল: info@bangladeshbartatoday.com