রাশিয়া
জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশন: যুদ্ধ, জ্বালানি সংকট ও বিশ্বব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে মুখোমুখি বিশ্বনেতারা
জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশন: যুদ্ধ, জ্বালানি সংকট ও বিশ্বব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে মুখোমুখি বিশ্বনেতারা মধ্যপ্রাচ্য, ইউক্রেন, AI ও UN সংস্কার—নিউইয়র্কে কূটনীতির বড় পরীক্ষা বিশেষ প্রতিনিধিঃ সঞ্জয় মজুমদার। নিউইয়র্ক, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬: যুদ্ধ, জ্বালানি নিরাপত্তা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জলবায়ু সংকট ও বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে তীব্র আন্তর্জাতিক অনিশ্চয়তার মধ্যেই মঙ্গলবার নিউইয়র্কে শুরু হলো জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের উচ্চপর্যায়ের সাধারণ বিতর্ক। জাতিসংঘ সদর দপ্তরে ১৯৩ সদস্যরাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা বৈশ্বিক সংকটের সমাধান ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার পথ নিয়ে আলোচনা করছেন। সাধারণ বিতর্ক ২২ থেকে ২৬ সেপ্টেম্বর এবং ২৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলবে। এবারের অধিবেশনের আনুষ্ঠানিক প্রতিপাদ্য—“Restoring trust, managing transformation: A United Nations that delivers for all”—বিশ্ব রাজনীতির বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। যুদ্ধ ও ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা যখন কঠিন হয়ে উঠেছে, তখন জাতিসংঘ কতটা কার্যকরভাবে আস্থা পুনর্গঠন ও যৌথ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে পারে, সেটিই এবারের আলোচনার বড় প্রশ্ন। বাংলাদেশের কূটনীতিক ড. খলিলুর রহমান ৮১তম সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে অধিবেশন পরিচালনা করছেন। যুদ্ধের কূটনীতি সামনে সাধারণ বিতর্কের সবচেয়ে কঠিন আলোচনাগুলোর একটি হতে যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউক্রেন। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত, ইরানকে ঘিরে সামরিক উত্তেজনা এবং গাজা পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক কূটনীতিকে নতুন চাপের মুখে ফেলেছে। একই সঙ্গে ইউক্রেন যুদ্ধ অব্যাহত থাকায় ইউরোপীয় নিরাপত্তা, সামরিক সহায়তা, সীমান্ত ঝুঁকি ও ভবিষ্যৎ শান্তি-আলোচনা নিয়ে সদস্যরাষ্ট্রগুলোর অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবারের অধিবেশনে যুদ্ধের অবসান ও বেসামরিক জনগণের সুরক্ষার প্রশ্নের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘের ভূমিকা নিয়েও চাপ থাকবে। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের জন্যও এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি অধিবেশন। তাঁর মেয়াদ ২০২৬ সালের শেষদিকে শেষ হওয়ার কথা। ফলে বর্তমান সংকটগুলোর পাশাপাশি জাতিসংঘের পরবর্তী নেতৃত্ব, প্রতিষ্ঠানটির কার্যকারিতা এবং ভবিষ্যৎ সংস্কারের প্রশ্নও কূটনৈতিক আলোচনায় জায়গা করে নিচ্ছে। গুতেরেস সাম্প্রতিক বক্তব্যে বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বর্তমান বিশ্বের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। সংস্কারের প্রশ্নে জাতিসংঘের পরীক্ষা জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের কাঠামো ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ক এবারও আলোচনার কেন্দ্রে থাকতে পারে। সমালোচকদের একটি বড় প্রশ্ন—বর্তমান আন্তর্জাতিক শক্তির ভারসাম্য কি জাতিসংঘের বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোতে যথাযথভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে? এখানে শুধু নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কার নয়, উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতিনিধিত্ব, আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার এবং বৈশ্বিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে Global South-এর ভূমিকার প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। তবে সদস্যরাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সংস্কারের পদ্ধতি ও অগ্রাধিকার নিয়ে মতপার্থক্য থাকায় দ্রুত ঐকমত্যে পৌঁছানো সহজ হবে না। AI: নতুন প্রযুক্তি, নতুন কূটনৈতিক সীমারেখা এবারের অধিবেশনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আর শুধু প্রযুক্তি খাতের বিষয় নয়; এটি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা, অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা ও মানবাধিকারের সঙ্গেও যুক্ত হয়ে গেছে। জাতিসংঘ মহাসচিব গুতেরেস দীর্ঘদিন ধরেই AI ব্যবস্থাপনায় আন্তর্জাতিক সমন্বিত কাঠামোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলে আসছেন। একই সময়ে প্রযুক্তি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড, নিরাপত্তা পরীক্ষা ও ঝুঁকি-ব্যবস্থাপনা নিয়ে নিজস্ব প্রস্তাব সামনে আনছে। ২১ সেপ্টেম্বর OpenAI আন্তর্জাতিক প্রযুক্তিগত মানদণ্ড ও উন্নত AI ব্যবস্থার জন্য সমন্বিত কাঠামোর প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের জন্য মূলর প্রশ্নটি এখন প্রযুক্তি বন্ধ করা নয়; বরং কীভাবে উদ্ভাবন অব্যাহত রেখে এর ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ করা যায়। কারণ AI-এর দ্রুত বিস্তার একই সঙ্গে অর্থনৈতিক সুযোগ ও নতুন নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। যুদ্ধের সঙ্গে জ্বালানি সংকটের যোগসূত্র আন্তর্জাতিক সংঘাতের অর্থনৈতিক প্রভাবও এবারের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও জ্বালানি পরিবহনপথের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের পাশাপাশি ইউক্রেন যুদ্ধও ইউরোপীয় জ্বালানি বাজারের ওপর চাপ তৈরি করছে। বিশ্বনেতারা তাই শুধু যুদ্ধ বন্ধের কূটনীতি নয়, জ্বালানি সরবরাহের স্থিতিশীলতা, মূল্যস্ফীতি এবং খাদ্য ও পরিবহন ব্যয়ের মতো পারস্পরিকভাবে যুক্ত বিষয়গুলো নিয়েও আলোচনা করতে বাধ্য হচ্ছেন। জাতিসংঘের উচ্চপর্যায়ের সপ্তাহে ২৩ সেপ্টেম্বর জলবায়ু ও ন্যায্য জ্বালানি রূপান্তর নিয়েও বিশেষ বৈঠক রয়েছে। জলবায়ু ও উন্নয়নও বাদ যাচ্ছে না যুদ্ধের ছায়ার মধ্যেও জলবায়ু পরিবর্তন ও টেকসই উন্নয়ন এবারের কর্মসূচিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। ২৩ সেপ্টেম্বর জলবায়ু কার্যক্রম ও ন্যায্য রূপান্তর নিয়ে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক এবং ২৪ সেপ্টেম্বর সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির অস্তিত্বগত হুমকি নিয়ে বিশেষ বৈঠক নির্ধারিত রয়েছে। এর সঙ্গে উন্নয়নশীল দেশগুলোর ঋণ, খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা এবং জলবায়ু অর্থায়নের প্রশ্নও যুক্ত। ফলে যুদ্ধ ও নিরাপত্তার পাশাপাশি উন্নয়ন ও জলবায়ুকে কীভাবে বৈশ্বিক শান্তির সঙ্গে যুক্ত করা যায়, সেটিও আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা ৮১তম সাধারণ পরিষদ এমন সময়ে বসছে যখন আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একাধিক সংকট একই সঙ্গে সক্রিয়। ইউক্রেন ও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা, AI-এর দ্রুত বিস্তার, জলবায়ু পরিবর্তন এবং জাতিসংঘ সংস্কারের দাবি—প্রতিটি ইস্যু আলাদাভাবে জটিল; আবার একটির সঙ্গে অন্যটির সরাসরি সম্পর্কও রয়েছে। ফলে নিউইয়র্কের এবারের কূটনৈতিক তৎপরতার সাফল্য শুধু কতগুলো বক্তব্য দেওয়া হলো, তার ওপর নির্ভর করবে না। বাস্তব প্রশ্ন হবে—বিশ্বনেতারা কি যুদ্ধ ও সংঘাতের বাইরে গিয়ে যৌথ সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারবেন, নাকি ভূরাজনৈতিক বিভাজনই বহুপাক্ষিক সহযোগিতার সীমা নির্ধারণ করবে? জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনের সামনে তাই দ্বৈত পরীক্ষা। একদিকে তাৎক্ষণিক সংকট মোকাবিলা, অন্যদিকে ভবিষ্যতের আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার চেষ্টা। যুদ্ধ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিভক্ত বিশ্বে কূটনীতির জন্য নিউইয়র্কের এই সপ্তাহ সেই ব্যবধান কতটা কমাতে পারে—এখন নজর সেদিকেই।
ইরান ইস্যুতে রাশিয়া–চীনের নতুন অবস্থান: বদলে যাচ্ছে জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা রাজনীতি?
ইরান ইস্যুতে রাশিয়া–চীনের নতুন অবস্থান: বদলে যাচ্ছে জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা রাজনীতি? উপশিরোনাম: নিরাপত্তা পরিষদে ইরানবিষয়ক স্বাধীন নিষেধাজ্ঞা-মনিটরিংয়ের মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব আটকে যাওয়ায় তৈরি হচ্ছে নতুন রিপোর্টিং-শূন্যতা; সামনে আরও বড় কূটনৈতিক সংঘাতের আশঙ্কা। বিশেষ প্রতিনিধিঃ সঞ্জয় মজুমদার। নিউইয়র্কে ১৭ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ইরানের ওপর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণকারী স্বাধীন বিশেষজ্ঞ প্যানেলের ম্যান্ডেট বাড়ানোর প্রস্তাবে রাশিয়া ও চীন ভেটো দেওয়ায় ওই পর্যবেক্ষণ কাঠামোর কার্যক্রম কার্যত শেষের দিকে চলে গেছে। প্রস্তাবটির পক্ষে ১১টি দেশ ভোট দিলেও রাশিয়া ও চীনের ভেটোর কারণে তা পাস হয়নি; পাকিস্তান ভোটদানে বিরত ছিল। ইরানবিষয়ক এই Panel of Experts মূলত জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন, সম্ভাব্য লঙ্ঘন এবং সংশ্লিষ্ট তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের দায়িত্ব পালন করত। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, প্যানেলের বর্তমান ম্যান্ডেট সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে শেষ হওয়ার কথা ছিল এবং এর কাজের মধ্যে নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নসংক্রান্ত তথ্য যাচাই, লঙ্ঘনের ঘটনা বিশ্লেষণ এবং নিরাপত্তা পরিষদকে সুপারিশ দেওয়া অন্তর্ভুক্ত ছিল। রাশিয়া ও চীনের ভেটোর পেছনে মূল বিরোধটি শুধু একটি মনিটরিং ম্যান্ডেট নিয়ে নয়; এর সঙ্গে ইরানের ওপর জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞার বর্তমান আইনি অবস্থান নিয়েও গভীর মতপার্থক্য রয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাশিয়া ও চীন যুক্তি দিচ্ছে যে ইরান-সংক্রান্ত পূর্ববর্তী জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞাগুলো ২০১৫ সালের পারমাণবিক সমঝোতার পরবর্তী কাঠামোর অধীনে আর কার্যকর নেই। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলো মনে করে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও চুক্তি-সংক্রান্ত বিরোধের পরিপ্রেক্ষিতে নিষেধাজ্ঞা কাঠামো পুনরায় কার্যকর হয়েছে। তেহরান অবশ্য পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। এই মতপার্থক্যকে আরও জটিল করেছে তথাকথিত “snapback” প্রক্রিয়া। Security Council Report-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, পশ্চিমা দেশগুলোর দৃষ্টিতে পূর্ববর্তী নিষেধাজ্ঞাগুলো পুনর্বহাল হওয়ার পর সেগুলোর বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণের জন্য বিশেষজ্ঞ প্যানেলের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কিন্তু রাশিয়া ও চীনের আপত্তির কারণে প্যানেলকে কার্যকরভাবে পুনর্গঠন করা সম্ভব হয়নি এবং এর ফলে ইরানবিষয়ক স্বাধীন রিপোর্টিংয়ের ক্ষেত্রে একটি বড় শূন্যতা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি দেখা দিয়েছে। এখানেই এবারের সিদ্ধান্তের কূটনৈতিক তাৎপর্য সবচেয়ে বেশি। একটি নিষেধাজ্ঞা কার্যকর আছে কি না—এটি এক বিষয়; কিন্তু সেই নিষেধাজ্ঞা বাস্তবে কে কীভাবে লঙ্ঘন করছে, কোন সরঞ্জাম বা প্রযুক্তি কোথায় যাচ্ছে এবং সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলো কী পদক্ষেপ নিচ্ছে—এসব স্বাধীনভাবে যাচাই করার সক্ষমতা আরেক বিষয়। বিশেষজ্ঞ প্যানেলের ম্যান্ডেট শেষ হলে সেই তথ্য যাচাই ও নিরাপত্তা পরিষদে নিয়মিত রিপোর্টিংয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক পথ দুর্বল হয়ে পড়বে। Security Council Report এটিকে সম্ভাব্য “reporting vacuum” হিসেবে চিহ্নিত করেছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। জাতিসংঘের কাঠামোর বাইরে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (IAEA)-র নিজস্ব পর্যবেক্ষণ ও যাচাইয়ের ভূমিকা রয়েছে। তবে Security Council Report উল্লেখ করেছে, বর্তমান রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে IAEA-এর যাচাই কার্যক্রমও নানা সীমাবদ্ধতার মুখে রয়েছে। ফলে নিরাপত্তা পরিষদের নিষেধাজ্ঞা পর্যবেক্ষণ এবং পারমাণবিক কর্মসূচি যাচাই—দুটি আলাদা ব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয়ের প্রশ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। এই ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটল, যখন ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাত, উপসাগরীয় নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি ও বাণিজ্যপথ নিয়ে উদ্বেগ ইতোমধ্যেই তীব্র। একই সময়ে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশন শুরু হচ্ছে। ফলে ইরান ইস্যুতে নিরাপত্তা পরিষদের বিভাজন সাধারণ পরিষদের বৃহত্তর কূটনৈতিক আলোচনাতেও প্রভাব ফেলতে পারে। ২০ সেপ্টেম্বরের রয়টার্স প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিউইয়র্কে বিশ্বনেতাদের সমাবেশের সময় মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও ইরান সংকট অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য হয়ে উঠেছে। এর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো রাশিয়া ও চীনের সমন্বিত অবস্থান। দুই দেশ একই বিষয়ে ভেটো দেওয়ায় নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের মধ্যে ইরান ইস্যুতে রাজনৈতিক বিভাজন আরও স্পষ্ট হয়েছে। একই সময়ে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে বাণিজ্য, প্রযুক্তি, AI এবং ইরানের সঙ্গে চীনের অর্থনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা চলছে; ২৪ সেপ্টেম্বর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সম্ভাব্য বৈঠকেও এসব বিষয় আলোচনায় থাকার কথা রয়েছে। ইরান ইস্যুতে নিরাপত্তা পরিষদের সর্বশেষ সিদ্ধান্তের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব হতে পারে নিষেধাজ্ঞা প্রয়োগের রাজনৈতিক বিতর্কের পরিবর্তে নিষেধাজ্ঞা পর্যবেক্ষণের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে বিতর্ক বৃদ্ধি। একদিকে পশ্চিমা দেশগুলো স্বাধীন পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করতে পারে; অন্যদিকে রাশিয়া ও চীন জাতিসংঘের বাইরে বিকল্প কূটনৈতিক কাঠামো বা রাজনৈতিক সমাধানের ওপর জোর দিতে পারে। Security Council Report-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আগের একটি নিষেধাজ্ঞা-মনিটরিং ব্যবস্থা ভেটোর মুখে পড়ার পর কিছু দেশ জাতিসংঘের বাইরে বহুপাক্ষিক পর্যবেক্ষণ কাঠামো তৈরির পথ নিয়েছিল। ফলে ইরানকে ঘিরে বর্তমান সংকট শুধু পারমাণবিক কর্মসূচি বা নিষেধাজ্ঞার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকছে না; এটি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের কর্তৃত্ব, স্বাধীন পর্যবেক্ষণব্যবস্থা এবং বড় শক্তিগুলোর পারস্পরিক সমঝোতার সক্ষমতারও পরীক্ষা হয়ে উঠছে। সামনে যদি নতুন কোনো রাজনৈতিক সমঝোতা না হয়, তাহলে ইরানবিষয়ক নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নের দাবি, তার আইনি বৈধতা এবং স্বাধীনভাবে তথ্য যাচাই—এই তিনটি প্রশ্নই আন্তর্জাতিক কূটনীতির অন্যতম বিতর্কিত ক্ষেত্র হয়ে থাকতে পারে।
একই মঞ্চে মোদি–শি–পুতিন: BRICS কি নতুন কূটনৈতিক শক্তিকেন্দ্রের জন্ম দিচ্ছে?
একই মঞ্চে মোদি–শি–পুতিন: BRICS কি নতুন কূটনৈতিক শক্তিকেন্দ্রের জন্ম দিচ্ছে? সাবহেডলাইন: নয়াদিল্লি সম্মেলনে ভারত–চীন সম্পর্কের বরফ গলার ইঙ্গিত, রাশিয়ার ঘনিষ্ঠতা ও মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ—বদলে যাচ্ছে বৈশ্বিক শক্তির সমীকরণ বিশেষ প্রতিনিধি: সঞ্জয় মজুমদার নয়াদিল্লিতে ১২–১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ অনুষ্ঠিত ১৮তম BRICS সম্মেলনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন একই কূটনৈতিক মঞ্চে অবস্থান করছেন। মধ্যপ্রাচ্য ও ইউক্রেন যুদ্ধ, বৈশ্বিক বাণিজ্য-ঝুঁকি এবং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার সংস্কারের দাবির মধ্যে এই সম্মেলন BRICS-এর ভবিষ্যৎ ভূমিকা নিয়ে নতুন করে আন্তর্জাতিক মনোযোগ তৈরি করেছে। সম্মেলনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো ভারত ও চীনের শীর্ষ নেতৃত্বের সরাসরি যোগাযোগ। ১২ সেপ্টেম্বর মোদি ও শি জিনপিং দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বসেন। ভারতের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দুই নেতা সম্পর্কের দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি, বাণিজ্য, যোগাযোগ ও সীমান্ত পরিস্থিতিসহ পারস্পরিক স্বার্থের বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন। সাত বছর পর শির ভারত সফর হওয়ায় বৈঠকটি বিশেষ কূটনৈতিক গুরুত্ব পেয়েছে। তবে এই rapprochement বা সম্পর্কোন্নয়নের সম্ভাবনাকে অতিরিক্ত আশাবাদীভাবে দেখার সুযোগ নেই। ২০২০ সালের সীমান্ত সংঘর্ষের পর ভারত ও চীনের মধ্যে সামরিক ও কৌশলগত অবিশ্বাস পুরোপুরি দূর হয়নি। একই সঙ্গে দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্ক গভীর হলেও ভারতের বড় বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে। Reuters-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ১৫৫.৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছালেও চীনের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য ঘাটতি ১০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি ছিল। রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের সম্পর্কও সম্মেলনের গুরুত্বপূর্ণ সমীকরণ। ১১ সেপ্টেম্বর মোদি ও পুতিন বৈঠকে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, প্রতিরক্ষা, জ্বালানি, মহাকাশ ও অন্যান্য ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা করেন। ভারতের সরকারি বিবৃতিতে দুই দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং BRICS-এর বহুপক্ষীয় সহযোগিতার বিষয়ও গুরুত্ব পেয়েছে। অন্যদিকে BRICS-এর সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হচ্ছে অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্যের মধ্যেও অভিন্ন অবস্থান তৈরি করা। ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত একই জোটে থাকলেও মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধে তাদের অবস্থান সব বিষয়ে অভিন্ন নয়। তারপরও ১২ সেপ্টেম্বর BRICS একটি যৌথ ঘোষণায় মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে সংযমের আহ্বান জানায় এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখার গুরুত্ব তুলে ধরে। BRICS-এর ঘোষণায় আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার সংস্কারের প্রশ্নও সামনে এসেছে। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থায় Global South-এর প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। অন্যদিকে চীন ও রাশিয়া পশ্চিমা-নির্ভর আন্তর্জাতিক কাঠামোর বিকল্প ও অধিক বহুমেরু ব্যবস্থার পক্ষে অবস্থান জোরদার করছে। তবে ভারত একই সঙ্গে স্পষ্ট করেছে যে BRICS কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে জোট নয়। এখানেই BRICS-এর প্রকৃত কৌশলগত প্রশ্নটি সামনে আসে। এটি কি পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন বিশ্বব্যবস্থার বিকল্প শক্তিকেন্দ্র হয়ে উঠবে, নাকি বিভিন্ন জাতীয় স্বার্থের সমন্বয়কারী একটি কূটনৈতিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবেই থাকবে? কারণ সদস্যদেশগুলোর অর্থনৈতিক স্বার্থ, নিরাপত্তা অগ্রাধিকার ও পররাষ্ট্রনীতি এক নয়। ফলে অভিন্ন ঘোষণা দেওয়া সম্ভব হলেও দীর্ঘমেয়াদি যৌথ নীতি বাস্তবায়ন করা অনেক বেশি কঠিন। বর্তমান বাস্তবতায় BRICS-এর প্রভাব কেবল অর্থনীতি বা বাণিজ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ, ইউক্রেন সংকট, জ্বালানি নিরাপত্তা, বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক কাঠামোর সংস্কার—প্রতিটি ক্ষেত্রেই জোটটি নিজেদের অবস্থান তুলে ধরার চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে ভারতকে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, ইরান ও উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের মধ্যে একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখতে হচ্ছে। বাংলাদেশের জন্যও এর গুরুত্ব রয়েছে। BRICS যদি বাণিজ্য, উন্নয়ন অর্থায়ন, স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেন, জ্বালানি সহযোগিতা ও Global South-এর কণ্ঠস্বরকে আরও শক্তিশালী করতে পারে, তাহলে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল অর্থনীতির জন্য নতুন অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে একই সঙ্গে বিশ্ববাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহে ভূরাজনৈতিক বিভাজন বাড়লে আমদানি ব্যয়, পরিবহন ব্যয় ও বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতার প্রভাব বাংলাদেশেও পড়তে পারে। সব মিলিয়ে নয়াদিল্লির BRICS সম্মেলনকে শুধু তিন নেতার বৈঠক হিসেবে দেখলে এর গভীরতা বোঝা যাবে না। মোদি–শি–পুতিনের একই মঞ্চে উপস্থিতি একটি পরিবর্তনশীল বিশ্বব্যবস্থার প্রতীক হলেও, BRICS সত্যিই নতুন বৈশ্বিক শক্তিকেন্দ্র হয়ে উঠবে কি না—তার উত্তর নির্ভর করবে সদস্যদেশগুলো তাদের পারস্পরিক মতপার্থক্য কতটা সামলে বাস্তব অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সহযোগিতায় রূপ দিতে পারে তার ওপর। ১২–১৩ সেপ্টেম্বরের নয়াদিল্লি সম্মেলন সেই পরীক্ষারই একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
যুক্তরাষ্ট্র- ইরান যুদ্ধে জ্বালানি মূল্য বৃদ্ধির মধ্যেই ইউরোপে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করতে চায় : পুতিন
ইরান সংকটের কারণে জ্বালানি মূল্য বৃদ্ধির মধ্যে রাশিয়া এখনই ইউরোপে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দিতে পারে, রাষ্ট্রপতি ভ্লাদিমির পুতিন সতর্ক করেছেন বুধবার, রাশিয়ান গ্যাস এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস ক্রয় নিষিদ্ধ করার ইউরোপীয় ইউনিয়নের ইচ্ছার সাথে সম্ভাব্য সিদ্ধান্তের যোগসূত্র।