সঙ্কটে জ্বালানি খাত: গ্যাস-বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের বৃত্ত থেকে মুক্তির উপায়
বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:২৩ পিএম
একটি দেশের অর্থনীতির চাকা কতটা সচল, তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলো জ্বালানি সরবরাহের স্থিতিশীলতা। শিল্প-কারখানা চলবে, কৃষি উৎপাদন হবে, ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে, মানুষের জীবনযাত্রা স্বাভাবিক থাকবে—এসবের পেছনে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের ভূমিকা অপরিসীম। অথচ বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে এটি আর কেবল জনদুর্ভোগের বিষয় নয়; বরং অর্থনীতি, শিল্পায়ন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের জন্য একটি বড় ধরনের ঝুঁকি হয়ে উঠেছে।
তীব্র গরমে একদিকে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ সাধারণ মানুষ, অন্যদিকে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে শিল্প-কারখানায়। কোথাও উৎপাদন কমছে, কোথাও কারখানার যন্ত্রপাতি নির্ধারিত সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না। অনেক উদ্যোক্তাকে অতিরিক্ত ব্যয়ে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করতে হচ্ছে। ফলে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, প্রতিযোগিতার সক্ষমতা কমছে এবং শেষ পর্যন্ত এর চাপ গিয়ে পড়ছে সাধারণ ভোক্তার ওপর।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, সংকটটি আকস্মিক নয়। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের নীতিগত দুর্বলতা, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে ধীরগতি, আমদানিনির্ভরতার ক্রমবর্ধমান প্রবণতা, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়ের ঘাটতি। ফলে আজ যে সংকট আমরা দেখছি, তা আসলে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা সমস্যারই বহিঃপ্রকাশ।
চাহিদার সঙ্গে সরবরাহের বিশাল ব্যবধান
দেশের বর্তমান জ্বালানি পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো চাহিদা ও সরবরাহের বিপুল ব্যবধান। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ৫,০০০ মিলিয়ন ঘনফুটেরও বেশি। বিপরীতে দেশীয় উৎপাদন ও এলএনজি আমদানিসহ সরবরাহ প্রায় ২,৮৩২ মিলিয়ন ঘনফুটের মধ্যে সীমাবদ্ধ। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় সরবরাহে রয়েছে বিপুল ঘাটতি।
এই ঘাটতি শুধু রান্নার চুলা কিংবা শিল্প-কারখানায় সীমাবদ্ধ থাকে না। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ওপরও এর সরাসরি প্রভাব পড়ে। দেশে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা ১২ হাজার মেগাওয়াটের বেশি হলেও প্রয়োজনীয় গ্যাসের অভাবে সেই সক্ষমতার বড় অংশ কাজে লাগানো যাচ্ছে না। ফলে একদিকে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য বিপুল বিনিয়োগ করা হয়েছে, অন্যদিকে জ্বালানির অভাবে সেই সক্ষমতার একটি অংশ অকার্যকর পড়ে থাকছে।
এটি নিঃসন্দেহে পরিকল্পনার একটি বড় প্রশ্ন তৈরি করে। বিদ্যুৎকেন্দ্র আছে, সঞ্চালন অবকাঠামো আছে, কিন্তু পর্যাপ্ত জ্বালানি নেই—এ ধরনের পরিস্থিতি কোনোভাবেই দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হতে পারে না।
শিল্পে সংকট, অর্থনীতিতে অভিঘাত
জ্বালানি সংকটের সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি অনুভূত হচ্ছে উৎপাদন খাতে। গ্যাসের পর্যাপ্ত চাপ না থাকলে শিল্পের যন্ত্রপাতি স্বাভাবিক গতিতে চালানো যায় না। উৎপাদন চক্র ব্যাহত হয়, সময়মতো পণ্য তৈরি করা সম্ভব হয় না এবং কারখানার নির্ধারিত উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হয়ে পড়ে।
রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য বিষয়টি আরও স্পর্শকাতর। তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন শিল্পে বিদেশি ক্রেতাদের নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পণ্য সরবরাহ করতে হয়। উৎপাদন ব্যাহত হলে শুধু একটি চালান বিলম্বিত হয় না; দীর্ঘমেয়াদে ক্রেতার আস্থা ও বাংলাদেশের নির্ভরযোগ্য সরবরাহকারী হিসেবে ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
অন্যদিকে কারখানা চালু রাখতে উদ্যোক্তাদের অনেক ক্ষেত্রে ডিজেল বা ফার্নেস অয়েলের মতো তুলনামূলক ব্যয়বহুল জ্বালানি ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়। একজন উদ্যোক্তার পক্ষে দীর্ঘদিন এভাবে উৎপাদন চালিয়ে যাওয়া কঠিন। শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব পড়ে পণ্যের দাম, বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থানে।
এখানেই গ্যাস সংকট একটি বৃহত্তর অর্থনৈতিক সমস্যায় পরিণত হয়। উৎপাদন কমলে কর্মঘণ্টা কমে, আয় কমে, বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হয় এবং বাজারে পণ্যের সরবরাহও ব্যাহত হতে পারে। তাই শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম পূর্বশর্ত হিসেবে দেখতে হবে।
এলএনজি আমদানি কি একমাত্র সমাধান?
দেশীয় গ্যাসের ঘাটতি পূরণে এলএনজি আমদানির প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো—কতটা আমদানি এবং কী ধরনের আমদানিনির্ভরতা?
আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম কখনো বাড়ে, কখনো কমে। ভূরাজনৈতিক সংঘাত, সরবরাহ-শৃঙ্খলের বিঘ্ন, বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার—সবকিছুই আমদানিকৃত জ্বালানির ব্যয়কে প্রভাবিত করে। ফলে অতিরিক্ত আমদানিনির্ভরতা একটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে আন্তর্জাতিক বাজারের অনিশ্চয়তার সঙ্গে যুক্ত করে দেয়।
বাংলাদেশের জন্য তাই প্রয়োজন ভারসাম্যপূর্ণ নীতি। যেখানে প্রয়োজন সেখানে এলএনজি আমদানি থাকবে, কিন্তু তার পাশাপাশি দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়াতে হবে। বিশেষ করে স্থলভাগের সম্ভাব্য গ্যাসক্ষেত্রের পাশাপাশি বঙ্গোপসাগরের অফশোর এলাকায় অনুসন্ধান কার্যক্রমকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
দেশের সমুদ্রসীমায় বিপুল সম্ভাবনার কথা বহুদিন ধরেই আলোচিত। কিন্তু সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করলেই হবে না; প্রয়োজন কার্যকর অনুসন্ধান, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ। কোথায় কী পরিমাণ গ্যাস বা অন্যান্য জ্বালানি সম্পদ রয়েছে, তা নির্ভরযোগ্যভাবে জানতে হলে নিয়মিত ভূতাত্ত্বিক জরিপ ও অনুসন্ধান চালাতে হবে।
নবায়নযোগ্য শক্তির দিকে দ্রুত অগ্রসর হওয়া জরুরি
গ্যাস ও এলএনজির পাশাপাশি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হতে পারে নবায়নযোগ্য শক্তি। সৌরবিদ্যুৎ ও বায়ুশক্তির মতো উৎসের ব্যবহার বাড়ানোর এখনই সময়।
বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুতের সম্ভাবনা রয়েছে। শিল্প-কারখানা, সরকারি ভবন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও আবাসিক ভবনের ছাদে সৌর প্যানেল স্থাপনের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমানো যেতে পারে। একই সঙ্গে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজস্ব নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনে উৎসাহিত করা যেতে পারে।
তবে নবায়নযোগ্য শক্তি নিয়ে অবাস্তব উচ্চাকাঙ্ক্ষা নয়, প্রয়োজন বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা। বিদ্যুৎ সঞ্চয়ের প্রযুক্তি, গ্রিডের সক্ষমতা, জমির প্রাপ্যতা, বিনিয়োগের ব্যয় এবং উৎপাদনের ধারাবাহিকতা বিবেচনায় নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতে হবে।
অপচয় কমানোও নতুন জ্বালানি উৎপাদনের সমান গুরুত্বপূর্ণ
জ্বালানি সংকটের সমাধান শুধু নতুন গ্যাসক্ষেত্র বা নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র খোঁজার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। বিদ্যমান ব্যবস্থায় কতটা অপচয় হচ্ছে, কোথায় সিস্টেম লস বেশি, কোথায় অব্যবস্থাপনা রয়েছে—এসব প্রশ্নের উত্তরও খুঁজতে হবে।
গ্যাস সঞ্চালন ও বিতরণে অপচয়, অবৈধ সংযোগ এবং প্রযুক্তিগত ত্রুটি কমাতে কঠোর ব্যবস্থা প্রয়োজন। একইভাবে বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থাকে আধুনিক ও দক্ষ করতে হবে।
বিদ্যুৎ খাতের বিভিন্ন চুক্তি, প্রকল্পের ব্যয় এবং দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক দায়ও নিয়মিত পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। বিশেষ করে বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্যাপাসিটি পেমেন্ট বা অন্যান্য আর্থিক দায়ের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের স্বার্থ, বিদ্যুতের প্রকৃত চাহিদা এবং চুক্তির অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজনীয় সংস্কার করা উচিত।
জ্বালানি নীতিতে দরকার ধারাবাহিকতা
বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন একটি দীর্ঘমেয়াদি, সমন্বিত ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের ঊর্ধ্বে থাকা জাতীয় জ্বালানি নীতি। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নীতির মৌলিক দিক পরিবর্তিত হলে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হবে এবং সংকট আরও গভীর হতে পারে।
জ্বালানি অনুসন্ধান, বিদ্যুৎ উৎপাদন, সঞ্চালন, আমদানি, নবায়নযোগ্য শক্তি, জ্বালানি দক্ষতা এবং মূল্য নির্ধারণ—সবকিছুকে একটি সমন্বিত কাঠামোর আওতায় আনতে হবে। এ ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ মতামত, গবেষণা, তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বাড়াতে হবে। জ্বালানি খাতের সিদ্ধান্ত যেন কোনো গোষ্ঠী বা স্বল্পমেয়াদি স্বার্থ দ্বারা প্রভাবিত না হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
এখনই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়
গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটকে সাময়িক সমস্যা ভেবে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। আজ শিল্পে গ্যাস নেই, কাল বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি নেই—এভাবে সংকট সামাল দিতে থাকলে একসময় পুরো অর্থনীতির ওপর এর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব পড়তে পারে।
বাংলাদেশের সামনে এখন দুটি পথ। একটি হলো সংকট দেখা দিলেই তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া। অন্যটি হলো সংকটের মূল কারণ চিহ্নিত করে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পথে এগিয়ে যাওয়া। দ্বিতীয় পথটিই কঠিন, কিন্তু টেকসই।
দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে গতি, অফশোর সম্ভাবনা কাজে লাগানো, এলএনজি আমদানিতে বাস্তবসম্মত কৌশল, নবায়নযোগ্য শক্তির প্রসার, সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, অপচয় ও সিস্টেম লস কমানো এবং আর্থিকভাবে টেকসই বিদ্যুৎ উৎপাদন—সবকিছুর সমন্বিত বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি।
কারণ জ্বালানি নিরাপত্তা ছাড়া শিল্পের নিরাপত্তা নেই, শিল্পের নিরাপত্তা ছাড়া কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা নেই, আর কর্মসংস্থান ও উৎপাদন ছাড়া টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও সম্ভব নয়।
সুতরাং গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটকে কেবল একটি খাতের সমস্যা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি বাংলাদেশের অর্থনীতি ও উন্নয়ন-অগ্রযাত্রার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একটি জাতীয় ইস্যু। সাময়িক জোড়াতালি দিয়ে এই সংকটের সমাধান হবে না। প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, দক্ষ ব্যবস্থাপনা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ।
অন্ধকারের এই বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসার সময় এখনই। কারণ জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মানে শুধু আলো জ্বালানো নয়—এটি বাংলাদেশের শিল্প, অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির পথও আলোকিত করা।
লেখক: মোহাম্মদ হাসান, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।