ইয়েমেনের উপকূলে সাম্প্রতিক অগ্রগতি, বাস্তুচ্যুতি ও গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ ঘিরে বাড়ছে মধ্যপ্রাচ্যের নতুন ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি।

বাব আল-মান্দাবের দিকে হুথিদের অগ্রযাত্রা: ইরানের আঞ্চলিক কৌশলে নতুন চাপ?

বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক

প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:২৬ এএম

বিশেষ প্রতিনিধিঃ সঞ্জয় মজুমদার।

ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলে হুথিদের সাম্প্রতিক সামরিক অগ্রযাত্রা এখন বাব আল-মান্দাব প্রণালির নিরাপত্তাকে নতুন করে আন্তর্জাতিক উদ্বেগের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর মাঝামাঝি সময়ে হুথি বাহিনী লোহিত সাগরের উপকূলীয় এলাকায় অগ্রসর হয়ে কৌশলগত মোকা বন্দর ও বাব আল-মান্দাবের মুখে অবস্থিত পেরিম দ্বীপে পৌঁছেছে বলে ইয়েমেনি সরকারি সূত্র Reuters-কে জানিয়েছে; একই সময়ে সংঘাতের কারণে ৮২ হাজারের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। 

সাম্প্রতিক এই অগ্রগতি ইয়েমেনের কয়েক বছরের সংঘাতকে আবারও বৃহত্তর আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংকটে পরিণত করছে। মোকা বন্দর এবং পেরিম দ্বীপের অবস্থান বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বাব আল-মান্দাব লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করে এবং এশিয়া-ইউরোপের গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথের একটি প্রবেশদ্বার হিসেবে কাজ করে। Reuters-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, প্রণালিটি প্রায় ১৮ মাইল প্রশস্ত এবং বিশ্ব বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি সামুদ্রিক chokepoint। 

হুথিদের এই অগ্রযাত্রা এসেছে ইয়েমেনের ২০২২ সালের যুদ্ধবিরতির পর সবচেয়ে গুরুতর সামরিক উত্তেজনার একটি পর্যায়ে। ২০২৬ সালের জুলাই থেকে সংঘাত নতুন করে তীব্র হওয়ার পর হুথিরা পশ্চিম ইয়েমেনের উপকূল ধরে অগ্রসর হয়েছে। মোকা দখলের পর বাব আল-মান্দাবের দিকে তাদের অবস্থান আরও শক্তিশালী হয় এবং ১১ সেপ্টেম্বর পেরিম দ্বীপে তাদের পৌঁছানোর খবর সামনে আসে। ইয়েমেনি সরকারি সূত্রগুলো বলেছে, দ্বীপটি থেকে সরকারি বাহিনী সরে যাওয়ার পর হুথিরা সেখানে অবস্থান নেয়। 

এই অগ্রগতি ইরানের সঙ্গে হুথিদের সম্পর্কের প্রশ্নটিকেও আবার সামনে এনেছে। হুথিরা ইরান-সমর্থিত শক্তি হিসেবে পরিচিত এবং তাদের সামরিক ও রাজনৈতিক সক্ষমতা আঞ্চলিক সংঘাতে তেহরানের প্রভাব বাড়ানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে হুথিদের প্রতিটি সিদ্ধান্ত সরাসরি ইরানের নির্দেশে পরিচালিত হয়—এমন সরল ব্যাখ্যা নিয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। Reuters-এর প্রতিবেদনে ইরানের নির্দেশনা ও সহায়তা বৃদ্ধির কথা উল্লেখ করা হলেও তেহরান হুথিদের অভিযান সরাসরি পরিচালনার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। 

বাব আল-মান্দাবের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে উদ্বেগের সবচেয়ে বড় কারণ এর অর্থনৈতিক প্রভাব। এই পথ দিয়ে এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের মধ্যে বিপুল পরিমাণ পণ্য ও জ্বালানি পরিবহন হয়। সাম্প্রতিক হুথি অগ্রগতির মধ্যে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল নিয়ে অনিশ্চয়তা বেড়েছে এবং তেল পরিবহনের খরচও চাপের মুখে পড়েছে। Reuters জানিয়েছে, ১৪ সেপ্টেম্বর জাহাজ চলাচলের ঝুঁকির কারণে ট্যাংকার ভাড়া ও জ্বালানি পরিবহন ব্যয় বেড়ে যায় এবং Brent crude-এর দাম ১০৭ ডলারের ওপরে ওঠে। 

সংঘাতের মানবিক মূল্যও দ্রুত বাড়ছে। Reuters-এর ১৪ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেপ্টেম্বরের শুরু থেকে ইয়েমেনে ৮২ হাজারের বেশি মানুষ নিজেদের বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়েছে এবং ২ হাজারের বেশি মানুষ এডেন উপসাগর পেরিয়ে জিবুতিতে আশ্রয় নিয়েছে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা IOM-এর মহাপরিচালক অ্যামি পোপ বাস্তুচ্যুত মানুষের দুর্ভোগের গভীরতা তুলে ধরেছেন। অর্থাৎ সামুদ্রিক নিরাপত্তার প্রশ্নের পাশাপাশি এই সংঘাত ইয়েমেনের দীর্ঘস্থায়ী মানবিক সংকটকেও আরও তীব্র করছে।

এরই মধ্যে সৌদি আরব হুথিদের অগ্রগতিকে নিজেদের নিরাপত্তা ও জ্বালানি অবকাঠামোর জন্য সরাসরি হুমকি হিসেবে দেখছে। ১৪ সেপ্টেম্বর সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপারের সঙ্গে আঞ্চলিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেছেন। Reuters-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হুথিদের সাম্প্রতিক হামলা ও লোহিত সাগর উপকূলে অগ্রযাত্রার প্রেক্ষাপটে সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সামরিক সহায়তা চেয়েছিল; ওয়াশিংটন সরাসরি হামলার পরিবর্তে গোয়েন্দা তথ্য ও লক্ষ্য নির্ধারণে সহায়তার বিষয়ে এগিয়েছে। 

অন্যদিকে, বৈশ্বিক শিপিং খাত পরিস্থিতির দিকে সতর্ক নজর রাখছে। এশিয়া-ইউরোপ বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ পথ হিসেবে সুয়েজ খাল ব্যবহারের ওপর নিরাপত্তা পরিস্থিতির প্রভাব পড়তে পারে। একই দিনে Reuters জানিয়েছে, Maersk ও Hapag-Lloyd সুয়েজ খাল দিয়ে আরও কয়েকটি কনটেইনার সার্ভিস পুনরায় চালুর পরিকল্পনা করছে, তবে তাদের কার্যক্রম মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে। 

সব মিলিয়ে, বাব আল-মান্দাবের দিকে হুথিদের অগ্রযাত্রা এখন শুধু ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধের একটি সামরিক অধ্যায় নয়; এটি মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্য, ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব, সৌদি নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক সামুদ্রিক বাণিজ্যের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়ে গেছে। সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—হুথিরা কতটা সময় এই কৌশলগত অবস্থান ধরে রাখতে পারে এবং ইয়েমেনি সরকারি বাহিনী ও তাদের আঞ্চলিক মিত্ররা পাল্টা অগ্রযাত্রা শুরু করতে পারে কি না। পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে এর প্রভাব ইয়েমেনের সীমা ছাড়িয়ে জ্বালানি মূল্য, আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থা এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যপথেও পড়তে পারে।

যোগাযোগের ঠিকানা:

বাংলাদেশ বার্তা টুডে

৫৬, চানখারপুল লেন, নাজিমুদ্দিন রোড, বংশাল, ঢাকা-১১০০

ইমেইল: info@bangladeshbartatoday.com