শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটি, নির্বাচিত সদস্যদের ভোটে সভাপতি ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ
বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:০৮ পিএম
শিক্ষা হলো এমন একটি প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে মানুষ জ্ঞান, দক্ষতা, নৈতিকতা, মূল্যবোধ ও ভালো আচরণ অর্জন করে এবং নিজেকে যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলে। আবারও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি হওয়ার সুযোগ পেতে যাচ্ছেন রাজনৈতিক দলের নেতারা।অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নেওয়া এমন সিদ্ধান্ত বাতিল করেছিল। তবে মনে হয় পুরোনো সেই নিয়ম আবারও ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার।
গত রবিবার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সভাপক্ষে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ম্যানেজিং কমিটি গঠন সংক্রান্ত প্রস্তাবিত প্রবিধানমালা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের অনুমোদনের পর এটি চূড়ান্ত করা হবে।
ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি মনোনয়ন সংক্রান্ত নতুন প্রস্তাবনায় যা বলা হয়েছে, ‘গভর্নিং বডির সভাপতি মনোনয়নের লক্ষ্যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধান, ক্ষেত্রমত বিভাগীয় কমিশনার বা জেলা প্রশাসকের সহিত আলোচনাক্রমে স্থানীয় পর্যায়ের জনপ্রতিনিধি, সরকারি, আধা-সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত শিক্ষানুরাগী ব্যক্তি বা স্থানীয় খ্যাতিমান সমাজসেবকগণের মধ্য হইতে তিন জন ব্যক্তির নাম ও পূর্ণাঙ্গ জীবনবৃত্তান্ত সংবলিত প্রস্তাব শিক্ষা বোর্ডের নিকট প্রেরণ করিবেন।’
২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ম্যানেজিং কমিটি গঠন সংক্রান্ত সংশোধিত বিধামালায় রাজনৈতিক নেতাদের অন্তর্ভুক্তির সুযোগ বাতিল করা হয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের সংশোধিত বিধিমালায় বলা হয়েছিল, গভর্নিং বডির সভাপতি মনোনয়নের লক্ষ্যে প্রবিধান ৬ এর উপপ্রবিধান ১ এ উল্লিখিত শিক্ষাগত যোগ্যতা সাপেক্ষে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধান, ক্ষেত্রমত, বিভাগীয় কমিশনার বা জেলা প্রশাসকের সহিত আলোচনাক্রমে নিম্ন বর্ণিত ব্যক্তিগণের মধ্য হইতে ৩জন ব্যক্তির নাম ও জীবন বৃত্তান্তসম্বলিত প্রস্তাব সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ডের নিকট প্রেরণ করিবেন।
(ক) সরকারি, আধাসরকারি বা স্বায়ত্ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ৯ম গ্রেডের নিম্নে নহে এইরূপ কোন কর্মকর্তা অথবা ৫ম গ্রেডের নিম্নে নহে এইরূপ আগ্রহী অবসরপ্রাপ্ত কোনো কর্মকর্তা; (খ) পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় বা সরকারি কলেজে কর্মরত কোনো সহযোগি অধ্যাপক বা অধ্যাপক; (গ) সংশ্লিষ্ট বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা এবং (ঘ) এমবিবিএস অথবা প্রকৌশল বা কৃষিসহ যে কোনো কারিগরী বিষয়ে ৪ বৎসর মেয়াদী স্নাতক ডিগ্রিসহ সরকারি, আধাসরকারি বা স্বায়ত্ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ৯ম গ্রেডের নিম্নে নহে এইরূপ কোন কর্মকর্তা অথবা ৫ম গ্রেডের নিম্নে নহে এইরূপ আগ্রহী অবসরপ্রাপ্ত কোনো কর্মকর্তা।’
রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ :
‘ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্ণিং বডির সভাপতি পদে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্তির অর্থ হলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে পুনরায় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ করা। যদিও এ পদে অন্যদেরও সুযোগ রয়েছে; তবে স্থানীয় জনপ্রতিনিধির নাম অন্তরভূক্ত অন্যদের এ পদে বসার সুযোগ কম।’
বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটি গঠনে পরিবর্তন ও সংশোধনী আনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
রবিবার (১৩ সেপ্টেম্বর) শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেকের সভাপতিত্বে এক সভায় প্রস্তাবিত প্রবিধানমালা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
প্রস্তাবিত প্রবিধানমালা অনুযায়ী, ম্যানেজিং কমিটির বিভিন্ন ক্যাটাগরির সদস্য পদে আগে নির্বাচন হবে। সদস্য নির্বাচন শেষ হওয়ার সাতদিনের মধ্যে সভাপতির নির্বাচনের জন্য সভা আহ্বান করতে হবে। দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রিসাইডিং অফিসার সভায় সভাপতিত্ব করবেন। উপস্থিত নির্বাচিত সদস্যদের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে সভাপতি নির্বাচিত হবেন।
তবে সভাপতি নির্বাচনের সভায় ম্যানেজিং কমিটির নির্বাচিত সদস্যদের ন্যূনতম দুই-তৃতীয়াংশের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। একাধিক প্রার্থী সমান সর্বোচ্চ ভোট পেলে তাদের মধ্য থেকে লটারির মাধ্যমে সভাপতি নির্বাচনের প্রস্তাব করা হয়েছে। পদত্যাগ, মৃত্যু বা অন্য কোনো কারণে সভাপতির পদ শূন্য হলে সর্বোচ্চ সাত কার্যদিবসের মধ্যে নতুন সভাপতি নির্বাচনের বিধানও রাখা হয়েছে।
প্রস্তাবিত নতুন প্রবিধানে ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি হতে কোনো স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ন্যূনতম স্নাতক বা সমমানের ডিগ্রি থাকা বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
আরও বলা হয়, কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষক বা কর্মচারী ওই প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি হতে পারবেন না। একই ব্যক্তি একই ধরনের সর্বোচ্চ দুটি এবং মেয়াদভিত্তিক ধরনের সর্বোচ্চ তিনটি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি হতে পারবেন—এমন বিধানও প্রস্তাব করা হয়েছে।
ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি মনোনয়ন সংক্রান্ত নতুন প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, ‘গভর্নিং বডির সভাপতি মনোনয়নের লক্ষ্যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধান, ক্ষেত্রমত বিভাগীয় কমিশনার বা জেলা প্রশাসকের সহিত আলোচনাক্রমে স্থানীয় পর্যায়ের জনপ্রতিনিধি, সরকারি, আধা-সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত শিক্ষানুরাগী ব্যক্তি বা স্থানীয় খ্যাতিমান সমাজসেবকগণের মধ্য হইতে তিন জন ব্যক্তির নাম ও পূর্ণাঙ্গ জীবনবৃত্তান্ত সংবলিত প্রস্তাব শিক্ষা বোর্ডের নিকট প্রেরণ করিবেন।
এদিকে ম্যানেজিং কমিটির ক্ষমতায়ও বড় পরিবর্তন আনা হচ্ছে। ম্যানেজিং কমিটির হাতে থাকছে না প্রতিষ্ঠানপ্রধান ও সহকারী প্রধান নিয়োগের ক্ষমতা। তবে নিয়োগসহ বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক সুপারিশকৃত নতুন শিক্ষক নিয়োগ ও প্রযোজ্য ক্ষেত্রে শিক্ষক ও কর্মচারীদের পদোন্নতির ক্ষেত্রে তাদের ক্ষমতা বহাল থাকছে।
প্রস্তাবিত প্রবিধানমালা অনুযায়ী, গভর্নিং বডি বা ম্যানেজিং কমিটি বিধি মোতাবেক, সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কর্মচারী নিয়োগসহ বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক সুপারিশকৃত বা প্রত্যয়নকৃত নতুন শিক্ষক নিয়োগ ও প্রযোজ্য ক্ষেত্রে শিক্ষক ও কর্মচারীদের পদোন্নতি প্রদান করবে।
উল্লেখ্য আগে, ২০২৪ ও ২০২৫ সালের প্রবিধানমালায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধান, সহকারী প্রধান ও কর্মচারী নিয়োগের ক্ষমতা ম্যানেজিং কমিটির হাতে ছিল। তবে অনেকে মনে করেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান একটি পবিত্র জায়গা, এটা রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত রাখা ভালো। এটাই কাম্য হওয়া উচিত।
একরামুল ইসলাম তুষার, কলামিস্ট, সহকারী অধ্যাপক আবুবকর বিশ্বাস মকছেদ আলী কলেজ, কালীগঞ্জ, ঝিনাইদহ।