প্রযুক্তি শুধু আমাদের কী করতে পারি তা বদলাচ্ছে না; আমরা কীভাবে মনোযোগ দিই, কী মনে রাখি, কী বিশ্বাস করি এবং কীভাবে সিদ্ধান্ত নিই—তার পরিবেশও বদলে দিচ্ছে।

প্রযুক্তি কি আমাদের হয়ে চিন্তা করছে?

বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক

প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:৪৭ পিএম

একসময় কোনো তথ্য জানতে মানুষকে বই খুলতে হতো, কারও কাছে জিজ্ঞাসা করতে হতো কিংবা লাইব্রেরিতে যেতে হতো। এখন একটি প্রশ্ন লিখলেই কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে অসংখ্য উত্তর সামনে হাজির হয়। স্মার্টফোন আমাদের পকেটে একটি লাইব্রেরি, ক্যামেরা, মানচিত্র, সংবাদমাধ্যম ও যোগাযোগব্যবস্থা এনে দিয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এখন লেখালেখি, অনুবাদ, গবেষণা, হিসাব কিংবা সিদ্ধান্ত গ্রহণেও সহায়তা করছে। প্রযুক্তি নিঃসন্দেহে মানুষের সক্ষমতার পরিসর বাড়িয়েছে।

কিন্তু এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে: প্রযুক্তি কি শুধু আমাদের কাজের ধরন বদলাচ্ছে, নাকি আমাদের চিন্তার ধরনও বদলে দিচ্ছে?

প্রশ্নটির উত্তর সহজ নয়। কারণ প্রযুক্তি মানুষের মস্তিষ্ককে সরাসরি বদলে দেয়—এমন সরল সিদ্ধান্তে যাওয়া ঠিক হবে না। বরং প্রযুক্তি আমাদের চারপাশের তথ্যপরিবেশ, মনোযোগের অভ্যাস, স্মৃতি ব্যবহারের পদ্ধতি, সামাজিক যোগাযোগ এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার কাঠামো বদলে দেয়। আর সেই পরিবর্তিত পরিবেশের মধ্যেই মানুষ প্রতিদিন চিন্তা করে।

মনোযোগ যখন সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ

ডিজিটাল যুগে তথ্যের অভাব নেই; বরং তথ্যের অতিরিক্ততা নতুন সমস্যা তৈরি করেছে। একটি নোটিফিকেশন, একটি বার্তা, একটি ভিডিও কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নতুন পোস্ট আমাদের মনোযোগকে এক কাজ থেকে অন্য কাজে সরিয়ে দিতে পারে।

স্বল্পদৈর্ঘ্যের ভিডিওর পর ভিডিও দেখার অভ্যাস আমাদের দ্রুত উত্তেজনা ও দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে অভ্যস্ত করে। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে একটি বই পড়া, কোনো জটিল সমস্যা নিয়ে চিন্তা করা কিংবা একটি বিষয়ের গভীরে প্রবেশ করা তুলনামূলকভাবে কঠিন মনে হতে পারে।

এখানে প্রযুক্তিকে এককভাবে দায়ী করা যাবে না। মানুষের মনোযোগেরও নিজস্ব সীমা আছে। কিন্তু ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোর নকশা এমন যে ব্যবহারকারী যত বেশি সময় সেখানে থাকবেন, তত বেশি তথ্য, বিজ্ঞাপন ও কনটেন্ট তার সামনে আসবে। ফলে মনোযোগ নিজেই একটি অর্থনৈতিক সম্পদে পরিণত হয়েছে।

প্রশ্ন তাই শুধু—আমরা কত তথ্য পাচ্ছি তা নয়; আমরা কতক্ষণ কোনো একটি চিন্তার সঙ্গে থাকতে পারছি?

তথ্য বাড়ছে, কিন্তু জ্ঞান কি বাড়ছে?

ইন্টারনেট তথ্যের গণতন্ত্রীকরণ করেছে। যে তথ্য একসময় বিশেষজ্ঞ বা প্রতিষ্ঠানের কাছে সীমাবদ্ধ ছিল, তার অনেকটাই এখন সাধারণ মানুষের নাগালে। এটি মানবসভ্যতার বড় অর্জন।

কিন্তু তথ্য আর জ্ঞান এক জিনিস নয়। একটি প্রশ্নের হাজারটি উত্তর পাওয়া মানেই সঠিক উত্তরটি শনাক্ত করার ক্ষমতা তৈরি হওয়া নয়। তথ্যের পরিমাণ যত বাড়ছে, তথ্য যাচাইয়ের প্রয়োজনও তত বাড়ছে।

এখানেই সমালোচনামূলক চিন্তার গুরুত্ব। একটি তথ্য সত্য কি না, তার উৎস কী, প্রমাণ কতটা নির্ভরযোগ্য, অন্য কোনো ব্যাখ্যা আছে কি না—এসব প্রশ্ন করার ক্ষমতা প্রযুক্তি নিজে তৈরি করে না। প্রযুক্তি তথ্য পৌঁছে দিতে পারে; সত্য বিচার করার দায়িত্ব মানুষের।

স্মৃতির জায়গা কি প্রযুক্তি দখল করছে?

আগে মানুষের মনে রাখার প্রয়োজন ছিল অনেক বেশি। এখন ফোন নম্বর, ঠিকানা, পথ, তারিখ, তথ্য—অনেক কিছুই ডিভাইস মনে রাখে। কোথায় যেতে হবে, মানচিত্র বলে দেয়; কোনো তথ্য মনে না থাকলে সার্চ করা যায়; কোনো শব্দের অর্থ জানা না থাকলে মুহূর্তেই খুঁজে পাওয়া যায়।

এটিকে সরাসরি ‘স্মৃতিশক্তির পতন’ বলা ঠিক হবে না। বরং বলা যায়, মানুষের স্মৃতি ব্যবহারের ধরন বদলেছে। মস্তিষ্ক হয়তো কিছু তথ্য মুখস্থ রাখার পরিবর্তে কোন তথ্য কোথায় পাওয়া যাবে—সেটি মনে রাখার দিকে বেশি নির্ভর করছে।

কিন্তু এর একটি ঝুঁকিও আছে। যদি কোনো তথ্য খোঁজার প্রয়োজনই আমরা অনুভব না করি, যদি কোনো সমস্যার সমাধান নিজে করার আগে প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করি, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে নিজস্ব জ্ঞান ও বিচারবোধ গড়ে ওঠার সুযোগ কমতে পারে।

প্রযুক্তি তাই স্মৃতির বিকল্প হতে পারে, কিন্তু চিন্তার বিকল্প হওয়া উচিত নয়।

অ্যালগরিদমের অদৃশ্য প্রভাব

আমরা অনেক সময় ভাবি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমরা নিজের পছন্দ অনুযায়ী কী দেখি তা নিজেরাই ঠিক করি। বাস্তবে সেই পছন্দের সামনে কী আসবে, তার বড় অংশ নির্ধারিত হয় অ্যালগরিদমের মাধ্যমে।

আমরা যে পোস্টে বেশি সময় থাকি, যে ভিডিও দেখি, যে বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানাই—এসবের ভিত্তিতে প্ল্যাটফর্ম আমাদের পরবর্তী কনটেন্ট বেছে নেয়। ফলে ধীরে ধীরে এমন একটি তথ্যপরিবেশ তৈরি হতে পারে, যেখানে আমাদের পরিচিত মতামতই বারবার ফিরে আসে।

এটি ইকো চেম্বার (Echo Chamber—একই ধরনের মতামতের মধ্যে আবদ্ধ তথ্যপরিবেশ) তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে কাজ করতে পারে কনফার্মেশন বায়াস (Confirmation Bias—নিজের বিশ্বাসকে সমর্থন করে এমন তথ্যকে বেশি গ্রহণ করার প্রবণতা)।

ফলে প্রযুক্তি শুধু তথ্য দেয় না; কখনো কখনো কোন তথ্য আমাদের চোখে পড়বে, সেটিও প্রভাবিত করে। তখন স্বাধীন মতামতের প্রশ্নটি নতুনভাবে সামনে আসে।

আমি কি সত্যিই নিজের মত তৈরি করছি, নাকি আমার সামনে ধারাবাহিকভাবে যে তথ্য পরিবেশন করা হচ্ছে, তার মধ্য থেকেই মতটি তৈরি হচ্ছে?

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নতুন প্রশ্ন

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এই পরিবর্তনকে আরও গভীর করেছে। একটি লেখা তৈরি করা, তথ্য সাজানো, অনুবাদ করা, ধারণা তৈরি করা কিংবা কোনো জটিল বিষয়ের প্রাথমিক ব্যাখ্যা পাওয়া এখন অনেক সহজ।

এটি মানুষের সৃজনশীলতার জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। কিন্তু একই সঙ্গে একটি মৌলিক প্রশ্নও তুলছে—আমরা যদি চিন্তার কাজ ক্রমাগত যন্ত্রের হাতে তুলে দিই, তাহলে নিজের চিন্তার পেশি কতটা সক্রিয় থাকবে?

এআই-এর ব্যবহার তাই নির্ভরতার নয়, সহযোগিতার হওয়া প্রয়োজন। একটি যন্ত্র আমাদের সম্ভাব্য উত্তর দিতে পারে; কিন্তু কোন উত্তরটি গ্রহণযোগ্য, কোন যুক্তিতে দুর্বলতা আছে, কোন তথ্য যাচাই করা দরকার—সেই বিচার মানুষের।

এআই যত শক্তিশালী হবে, মানুষের বিচারবোধের প্রয়োজন তত কমবে—এমন নয়; বরং সম্ভবত আরও বাড়বে।

প্রযুক্তি কি স্বাধীন চিন্তার শত্রু?

প্রশ্নটির উত্তর সরল ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ নয়। প্রযুক্তি যেমন মানুষের চিন্তাকে সীমাবদ্ধ করতে পারে, তেমনি চিন্তার স্বাধীনতাও বাড়াতে পারে।

একজন শিক্ষার্থী পৃথিবীর সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের বক্তৃতা শুনতে পারেন। একজন গবেষক বিশ্বের নানা প্রান্তের গবেষণাপত্র খুঁজে পেতে পারেন। একজন প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষও নিজের মত প্রকাশের সুযোগ পেতে পারেন। জ্ঞান ও যোগাযোগের এমন বিস্তার আগে কল্পনা করাও কঠিন ছিল।

তাই সমস্যা প্রযুক্তির অস্তিত্বে নয়; সমস্যা তৈরি হয় যখন প্রযুক্তি আমাদের এজেন্সি—নিজের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে নিজের ভূমিকা ও সিদ্ধান্তক্ষমতা—ধীরে ধীরে দুর্বল করে দেয়।

যে মানুষ নিজে প্রশ্ন না করে সার্চের প্রথম উত্তর গ্রহণ করেন, নিজে যাচাই না করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট বিশ্বাস করেন, নিজের বিচার না করে অ্যালগরিদমের সুপারিশ অনুসরণ করেন কিংবা নিজের চিন্তার বদলে যন্ত্রের তৈরি বক্তব্যকে চূড়ান্ত সত্য মনে করেন—তার প্রযুক্তি ব্যবহারের স্বাধীনতা থাকলেও চিন্তার স্বাধীনতা কতটা আছে, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।

সমাধান প্রযুক্তিবিরোধিতা নয়

প্রযুক্তি থেকে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই, প্রয়োজনও নেই। বরং প্রয়োজন প্রযুক্তির সঙ্গে নতুন ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পর্ক তৈরি করা।

ডিজিটাল সাক্ষরতা শুধু কীভাবে প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হয় তা শেখানো নয়; কীভাবে তথ্য যাচাই করতে হয়, কীভাবে উৎসের বিশ্বাসযোগ্যতা বিচার করতে হয়, কীভাবে অ্যালগরিদমিক প্রভাব শনাক্ত করতে হয় এবং কখন প্রযুক্তির সাহায্য না নিয়ে নিজে চিন্তা করতে হয়—সেটিও শেখানো।

দীর্ঘ লেখা পড়ার অভ্যাস, মনোযোগ ধরে রাখার অনুশীলন, ভিন্নমতের সঙ্গে পরিচিত হওয়া এবং কোনো তথ্য গ্রহণের আগে প্রশ্ন করার সংস্কৃতি তাই আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

প্রযুক্তি আমাদের সময় বাঁচাতে পারে, কিন্তু সেই বাঁচানো সময় আমরা কীভাবে ব্যবহার করব—সেটি প্রযুক্তি ঠিক করে দিতে পারে না। প্রযুক্তি আমাদের জ্ঞানের দরজা খুলে দিতে পারে, কিন্তু কোন দরজা দিয়ে প্রবেশ করব, কী দেখব এবং কী বিশ্বাস করব—সেই সিদ্ধান্ত মানুষের।

শেষ পর্যন্ত প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে যতটা না প্রশ্ন করা দরকার, তার চেয়ে বড় প্রশ্ন মানুষের ভবিষ্যৎ নিয়ে: প্রযুক্তি যত বেশি বুদ্ধিমান হচ্ছে, মানুষ কি নিজের চিন্তার দায়িত্বও তত বেশি সচেতনভাবে গ্রহণ করছে?

কারণ মানুষের স্বাধীনতার শেষ সীমা হয়তো প্রযুক্তি ব্যবহার করার ক্ষমতায় নয়; বরং প্রযুক্তি ব্যবহারের মধ্যেও নিজের মতো করে প্রশ্ন করতে, সন্দেহ করতে, বিচার করতে এবং সিদ্ধান্ত নিতে পারার ক্ষমতায়।

লেখক : জহিরুল ইসলাম ; সাংবাদিক ও কলামিস্ট, কক্সবাজার। 

যোগাযোগের ঠিকানা:

বাংলাদেশ বার্তা টুডে

৫৬, চানখারপুল লেন, নাজিমুদ্দিন রোড, বংশাল, ঢাকা-১১০০

ইমেইল: info@bangladeshbartatoday.com