স্ক্রলের গভীরে: অ্যালগরিদমের যুগে সাহিত্যের প্রতিরোধ
বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ১৩ আগস্ট ২০২৬, ০৯:২৪ পিএম
দিনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আমরা কত কিছু 'পড়ি'? সকালে ঘুম ভাঙার সঙ্গেই হাতে চলে আসে ফোন। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার—একের পর এক পোস্ট স্ক্রল করি। নিউজ পোর্টালের হেডলাইন চোখ বুলাই, বন্ধুর স্ট্যাটাস দেখি, গ্রুপের শত শত মেসেজ পার করি। বিরক্তিতে বা আনন্দে তাৎক্ষণিক রিঅ্যাক্ট করি, মাঝে মাঝে কমেন্ট লিখি। দিনশেষে মাথা বালিশে রেখে যখন ভাবি, মনে হয়—এত কিছু দেখলাম, জানলাম, পড়লাম; কিন্তু মনটা যেন শূন্য। সকালে দেখা সেই পোস্টের বিষয়বস্তু, যে ভিডিওতে মুহূর্তের জন্য উত্তেজিত হয়েছিলাম, তার মূল বক্তব্য—কিছুই আর ঠিকঠাক মনে পড়ে না। তথ্যের এই প্লাবনে আমরা ভেসে যাই, কিন্তু কোনো কিছুই যেন আঙিনায় থিতু হয় না। এই দ্রুততা আর ক্ষণস্থায়ীতার মধ্যেই দাঁড়িয়ে প্রশ্ন জাগে—সাহিত্যের মতো একটি ধীর, নিস্তব্ধ ও গভীর মাধ্যমের প্রয়োজনীয়তা কি আজও অক্ষুণ্ণ?
আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যখন তথ্য ও যোগাযোগের গতি অভূতপূর্ব। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তথ্যের প্রসারকে যেমন গণতান্ত্রিক করেছে, তেমনি জ্ঞানার্জনের পথকে সহজ করেছে। এখন মফস্বলের কোনো তরুণও তার লেখা বিশ্বের কাছে তুলে ধরার সুযোগ পায়; সাহিত্য চর্চার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে—অনলাইন গল্পপত্রিকা, সাহিত্যভিত্তিক গ্রুপ, কবিতা পাঠের লাইভ সেশন। কিন্তু এই দ্রুততারই একটি অন্ধকার পাশ রয়েছে। সংক্ষিপ্ততা, স্পষ্টতা ও তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার এই সংস্কৃতিতে দীর্ঘ সময় ধরে একটি লেখা বা ভাবনার সঙ্গে থাকার অভ্যাস ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। মনোযোগের এই সংকট আমাদের চিন্তার গভীরতাকেও সংকুচিত করছে। ঠিক এই খানেই সাহিত্য নিজের প্রাসঙ্গিকতা নতুন করে প্রতিষ্ঠিত করে।
সাহিত্য পাঠককে একটি গল্পের ভেতর ডুব দিতে বলে, একটি চরিত্রের সঙ্গে দিনের পর দিন কাটাতে বলে, কোনো সময়, সমাজ বা পরিবেশকে অনুভব করতে বলে। এটি ধৈর্যের পাঠ, গভীর মনোযোগের অনুশীলন। কোনো উপন্যাস যখন আমরা ধীরে ধীরে পড়ি, তখন আমরা শুধু ঘটনা আত্মস্থ করি না, তার পাশাপাশি প্রশ্নও করি—'কী ঘটল' নয়, 'কেন ঘটল', 'আমি যদি এই চরিত্রের জায়গায় হতাম, তাহলে কী করতাম'—এই আত্মজিজ্ঞাসাই সাহিত্যের প্রধান উপহার, যা সামাজিক মাধ্যমের দ্রুত ও খণ্ডিত তথ্যপ্রবাহে সহজে পাওয়া যায় না। সাহিত্য সমালোচনামূলক চিন্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুশীলন তৈরি করে, যা যেকোনো ভাইরাল তথ্যকে অন্ধভাবে গ্রহণ না করে যাচাই-বিশ্লেষণের মানসিকতা গড়ে তোলে। বিশেষ করে, সাহিত্য আমাদের একই ঘটনার একাধিক সত্যের সহাবস্থান দেখায়—উপন্যাসের নায়ক নিজের চোখে যেমন একটি সত্য দেখে, অন্য চরিত্র তার থেকে ভিন্ন সত্য দেখে; পাঠককে সিদ্ধান্ত নিতে হয়, ভাবতে হয়। এই অভিজ্ঞতা আমাদের কোনো একটি সত্যকে সহজে চূড়ান্ত বলে মেনে নেওয়ার বদলে তার ভেতরের ভিন্ন দিকগুলো দেখতে শেখায়।
শুধু তাই নয়, সাহিত্য মানবিক বোধের উৎস। একটি উদাহরণ দিই: মহাশ্বেতা দেবীর 'হাজার চুরাশির মা' পাঠককে শুধু এক মায়ের সংগ্রামের গল্পই শোনায় না, সে তাকে নিয়ে যায় স্বাধীনতা-উত্তর বাংলার এক ভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক জগতে। পাঠকও শেষ পর্যন্ত যেন ওই মায়ের দুঃখ, ক্ষোভ ও ভালোবাসার কিছুটা নিজের ভেতর অনুভব করেন—এমনকি যদি তাঁর নিজের জীবন তার থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন হয়। এই অভিজ্ঞতা ডিজিটাল বিশ্বের একটি শিরোনাম বা ভিডিও ক্লিপে সহজে সম্ভব নয়। সাহিত্য আমাদের কল্পনাকেও সক্রিয় করে। চলচ্চিত্র তার দৃশ্যের একটি নির্মিত রূপ আমাদের সামনে হাজির করে; সাহিত্য সেই দৃশ্যের অনেকখানি নির্মাণের দায়িত্ব পাঠকের কল্পনার হাতে তুলে দেয়। ভাষার দিক থেকেও সাহিত্য আমাদের সমৃদ্ধ করে—সামাজিক মাধ্যমের সংক্ষিপ্ত, তথ্যবহুল ভাষার বিপরীতে সাহিত্য ভাষার সূক্ষ্ম ব্যবহার শেখায়, যা একই অনুভূতিকে ভিন্ন মাত্রায় প্রকাশ করতে পারে।
এখন প্রশ্ন হলো—সাহিত্য আর সামাজিক মাধ্যম কি পরস্পরের শত্রু? নিশ্চয়ই না। সামাজিক মাধ্যম আজ সাহিত্যের বিজ্ঞাপনের স্থান, তরুণ লেখকদের আত্মপ্রকাশের মঞ্চ, নতুন বইয়ের খবর জানার দ্রুততম পথ। কিন্তু এই সহাবস্থানের মধ্যেই একটি সূক্ষ্ম বিপদ আছে। সাহিত্যচর্চার স্বাভাবিক ধীরতা ও নিবিড়তার সঙ্গে যখন তাৎক্ষণিক জনপ্রিয়তার চাপ যুক্ত হয়, তখন লেখকের মনোযোগ কখনো কখনো সৃষ্টির বদলে প্রতিক্রিয়া পাওয়ার দিকে সরে যেতে পারে। এখানে আরও একটি মৌলিক পার্থক্য আছে: অ্যালগরিদম সাধারণত আমাদের আগের পছন্দের ভিত্তিতে পরবর্তী পছন্দ অনুমান করে—আমরা যা পছন্দ করি, তার আরও কিছু আমাদের সামনে হাজির হয়। সাহিত্য তার বিপরীত কাজ করে। এটি আমাদের এমন মানুষ, এমন জীবন, এমন প্রশ্ন ও এমন মতের সামনে দাঁড় করায়, যা আমরা নিজেরা হয়তো খুঁজে নিতাম না। এই অস্বস্তিকর, অচেনা জগতের মুখোমুখি হওয়াই সাহিত্যকে অ্যালগরিদম থেকে আলাদা করে এবং তার প্রয়োজনীয়তাকে আরও স্পষ্ট করে। বোঝা জরুরি যে, তথ্য পাওয়া এবং জ্ঞান অর্জন এক নয়; মতামত প্রকাশ করা এবং চিন্তা করা এক জিনিস নয়। আমরা কয়েক সেকেন্ডে একটি খবর শেয়ার করতে পারি; কিন্তু তার প্রেক্ষাপট, মানুষের জীবনে তার অভিঘাত এবং ঘটনাটির মানবিক অর্থ বুঝতে আমাদের দ্রুত তথ্যপ্রবাহের বাইরে আরও গভীর পাঠের প্রয়োজন হয়—সাহিত্য সেই গভীরতার একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ।
বাংলাভাষী সমাজের বাস্তবতায় এর প্রাসঙ্গিকতা গভীর। বাংলা ভাষার সাহিত্যঐতিহ্য আমাদের গৌরবের। বর্তমান প্রজন্মকে এককথায় ‘সাহিত্যবিমুখ’ বলে আখ্যা দেওয়া ঠিক হবে না; কারণ তারা ই-বুক, অডিওবুক, অনলাইন পত্রিকা ও সাহিত্যবিষয়ক পডকাস্টের মতো নতুন মাধ্যমেও সাহিত্যের সংস্পর্শে আসছে। কিন্তু 'পড়া' মানে কি কেবল চোখ বুলানো? নাকি তার মধ্যে থেমে ভাবার, প্রশ্ন করার সুযোগ আছে? পাঠের মাধ্যম বদলাচ্ছে—বইয়ের পাশাপাশি ডিজিটাল পাঠচক্র, সাহিত্য পডকাস্ট, ডিজিটাল বই ও সাহিত্য প্ল্যাটফর্ম—এসব নতুন পথ তৈরি হচ্ছে। কিন্তু মাধ্যম যাই হোক, মূল চ্যালেঞ্জ হলো পাঠকের মধ্যে থেমে ভাবার অভ্যাসটি ধরে রাখা। বইমেলায় মানুষের উপস্থিতি অন্তত এটুকু মনে করিয়ে দেয়—বইয়ের প্রতি আগ্রহ এখনও নিঃশেষ হয়নি; তবে এটি শুধু উৎসবের আনন্দে সীমাবদ্ধ না থেকে নিত্যজীবনের অভ্যাস হয়ে উঠতে হবে। স্কুল-কলেজের পাঠ্যবইয়ের বাইরে সাহিত্য যেন 'অতিরিক্ত বোঝা' না হয়, তা নিশ্চিত করা আমাদের সম্মিলিত দায়িত্ব।
ভবিষ্যতের কথা ভাবলে দেখি, অ্যালগরিদম দিন দিন আমাদের মনোযোগকে আরও খণ্ডিত করতে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আমাদের আগ্রহ ও চাহিদা অনুমান করে আরও বেশি ব্যক্তিকেন্দ্রিক কনটেন্ট পরিবেশন করতে পারে; ফলে আমরা চাইলে এমন এক তথ্যপরিসরে আটকে পড়তে পারি, যেখানে নতুন বা অস্বস্তিকর ভাবনার মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ কমে যায়। ঠিক এই সময়ে সাহিত্য হয়ে উঠতে পারে এক ধরনের মানসিক প্রতিরোধ। কারণ যারা গভীরভাবে পড়তে জানে, তারা অ্যালগরিদমের তৈরি একই ধরনের তথ্যের বৃত্তে আটকে থাকে না; তারা প্রশ্ন করতে জানে, ভিন্ন মতকে গ্রহণ করতে জানে, নিজের চিন্তার স্বাধীনতাকে পুনরুদ্ধার করে। এই অর্থে সাহিত্য শুধু একটি শিল্পমাধ্যম নয়; এটি আমাদের মনোযোগের ওপর অন্যের নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে নিজের ভেতরের স্বাধীন জায়গাটি রক্ষা করারও একটি উপায়। সাহিত্য তাই কোনো পলায়ন নয়, বরং ডিজিটাল নির্ভরতার মধ্যে বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতা রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুশীলন।
সামাজিক মাধ্যম আমাদের যুক্ত করে ক্ষণিকের সঙ্গে; সাহিত্য যুক্ত করে নিরবধির সঙ্গে। আমরা যদি শুধু যা দ্রুত পাই, তাই গ্রহণ করতে থাকি, তবে হারিয়ে যাবে সেই গভীর মানবিক অভিজ্ঞতাগুলো—যা সময় নেয়, নিস্তব্ধতা চায়, আত্মনিবেদন দাবি করে। তাই প্রযুক্তির এই দাপুটে অগ্রযাত্রায় সাহিত্যের প্রয়োজন কমেনি; বরং মানুষের মনোযোগ যখন ছিন্নভিন্ন, মতামত যখন ভাসাভাসা, তখন সাহিত্যের আহ্বান আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে—থামো, ভাবো, গভীরে যাও। আর সেই গভীরেই লুকিয়ে আছে আমাদের নিজেদের সঙ্গে নিজের দেখা, যা কোনো স্ক্রল কখনো দেয় না।
লেখক : জহিরুল ইসলাম, গণমাধ্যমকর্মী, চকরিয়া প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক, কক্সবাজার।