শৈশবের সোনালী দিন এবং সময়ের নিষ্ঠুর আবর্তন
বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ০৯ জুলাই ২০২৬, ০৯:৫৫ এএম
১ম অধ্যায়: জাম তলার শৈশব ও নিটোল আনন্দ:
বাঙালির শৈশব মানেই রোদে পোড়া, বৃষ্টিতে ভেজা আর প্রকৃতির কোলে অবাধ স্বাধীনতা। ওসমান গনির স্পষ্ট মনে পড়ে সেই বিশাল, ছায়াবিড়ম্বিত জাম তলাটির কথা। গ্রীষ্মের তপ্ত দুপুরে যখন চারদিক নিঝুম হয়ে যেত, তখন পাড়ার একঝাঁক ছেলেমেয়ে জড়ো হতো সেই গাছের নিচে। সেখানে ধনী-দরিদ্রের কোনো ভেদ ছিল না, ছিল না কোনো হিংসা বা প্রতিযোগিতা।
জাম পাকার মৌসুমে চারদিক এক উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হতো। গাছের ডালে উঠে জাম পাড়া, নিচে দাঁড়িয়ে থাকা বন্ধুদের গায়ে তা ছুড়ে দেওয়া, আর মাটিতে পড়া কালো টুকটুকে ফলগুলো কুড়িয়ে নিয়ে কাড়াকাড়ি করার আনন্দ ছিল স্বর্গীয়। জাম খেয়ে সবার জিহ্বা যখন বেগুনি হয়ে যেত, তখন একে অপরকে জিহ্বা দেখিয়ে হাসাহাসি করার সেই নিষ্পাপ আনন্দ আজ আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না। জাম তলাকে কেন্দ্র করে চলত কানামাছি, ওপেনটি বায়োস্কোপ, মার্বেল আর গোল্লাছুটের মতো ঐতিহ্যবাহী সব খেলা।
ওসমান গনি ছিলেন সেই দলের অন্যতম প্রাণ। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামার আগ পর্যন্ত সেই গাছের নিচ থেকে কাউকেই বাড়ি ফেরানো যেত না। মায়েরা যখন লাঠি হাতে ডাকতে আসতেন, তখন এক দৌড়ে পালিয়ে যাওয়ার স্মৃতি আজও ওসমানকে আবেগাপ্লুত করে। সেই জাম তলাটি কেবল একটি গাছ ছিল না, সেটি ছিল এক টুকরো স্বর্গ এবং একঝাঁক শিশুর আজন্ম সুখের ঠিকানা।
২য় অধ্যায়: কৈশোর পেরিয়ে যৌবন: শিক্ষার সমাপ্তি ও কর্মজীবনের ব্যস্ততা:
সময় কখনো এক জায়গায় থমকে থাকে না। নদীর স্রোতের মতোই তা বয়ে চলে। জাম তলার সেই চঞ্চল শিশুরা একসময় কৈশোর পেরিয়ে যৌবনে পদার্পণ করে। কাঁধের ওপর চেপে বসে পড়ালেখার গুরুদায়িত্ব। স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে কলেজের বারান্দা, তারপর বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি অর্জনের পর শুরু হয় জীবনের আসল সংগ্রাম—জীবিকার সন্ধান।
আজ শৈশবের সেই দলটির সবাই প্রাপ্তবয়স্ক। পড়াশোনা শেষ করে প্রত্যেকেই নিজ নিজ ভাগ্য অন্বেষণে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। ওসমান গনি আজ কর্মব্যস্ত এক যুবক, যার অবসরের ভীষণ অভাব। শুধু ওসমান নন, তার সেই খেলার সাথীদের কেউ আজ শহরের বহুতল ভবনে করপোরেট চাকরি করছেন, কেউ সরকারি কর্মকর্তা, আবার কেউ হয়তো জীবিকার তাগিদে পাড়ি জমিয়েছেন সুদূর প্রবাসে। চব্বিশ ঘণ্টার চাকা ঘুরছে তীব্র গতিতে, যেখানে শৈশবের স্মৃতি রোমন্থন করার মতো ফুরসতটুকুও কারো নেই। ল্যাপটপের স্ক্রিন, ফাইলের স্তূপ আর অফিসের মিটিংয়ের ভিড়ে হারিয়ে গেছে সেই জাম তলার শীতল হাওয়া। কর্মের এই ব্যস্ততা সবাইকে স্বাবলম্বী করেছে ঠিকই, কিন্তু ভেতরের সেই অবুঝ শিশুটিকে চিরতরে স্তব্ধ করে দিয়েছে।
৩য় অধ্যায়: নিয়তির নির্মম বাস্তব: সুখ, বিষাদ ও মৃত্যুর সংসার জীবন:
শিক্ষাজীবন শেষে কর্মের তাগিদে ছড়িয়ে পড়ার পর, একসময় সবাই জড়িয়ে পড়ে পারিবারিক জীবনের জটিল জালে। এই নতুন অধ্যায় সবার জন্য একরকম হয়নি। ওসমান গভীর মনোযোগ দিয়ে লক্ষ্য করেন, তার শৈশবের বন্ধুদের কেউ কেউ আজ দাম্পত্য জীবনে অত্যন্ত সুখী। সুন্দর জীবনসঙ্গী আর সন্তানদের নিয়ে মানসিক শান্তিতে তাদের ঘর আলো করে আছে হাসি। বিপরীতে, কিছু বন্ধুর কপালে জুটেছে তীব্র অশান্তি। ভুল বোঝাবুঝি, অভাব-অনটন কিংবা সম্পর্কের টানাপোড়েনে তাদের সংসার জীবন আজ নরকসম। বাইরে থেকে হাসিমুখ দেখালেও ভেতরে ভেতরে তারা এক বুক কান্না চেপে বেঁচে আছেন।
সংসারের এই সুখ-দুঃখের চেয়েও বড় আঘাতটি আসে যখন জানা যায়, সেই হাসিখুশি দলের দু-একজন বন্ধু আজ আর এই পৃথিবীতে বেঁচে নেই। সড়ক দুর্ঘটনা বা মরণব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে অকালে ঐ সোনালী শৈশব থেকেই ঝরে গেছে কিছু প্রাণ। জাম তলার যে বন্ধুরা একদিন একসঙ্গে চিৎকার করে হাসত, তাদের কেউ কেউ আজ মাটির নিচে চিরনিদ্রায় শায়িত।
বড়ই বিচিত্র এই জীবন—একই জাম তলায় খেলা করা শিশুরা আজ জীবনের ভিন্ন ভিন্ন প্রান্তে দাঁড়িয়ে সুখ, দুঃখ, বিরহ আর মৃত্যুর মুখোমুখি। লেখক ওমর ফারুক চৌধুরীর ভাষায়, জীবন আসলে এক চলমান ক্যানভাস, যেখানে সময়ের রঙে প্রতিনিয়ত বদলে যায় মানুষের ভাগ্য, আর ওসমান গনি আজ সেই ক্যানভাসের দিকে তাকিয়ে স্মৃতি আর বাস্তবতার হিসাব মেলান।