ইউপি নির্বাচন: বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার সংস্কৃতি নয়, ফিরুক ভোটের রাজনীতি
বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৩৮ পিএম
ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন সামনে। নির্বাচন কমিশনের প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী ১২ নভেম্বর থেকে সাত ধাপে দেশের ৪ হাজার ৫৮০টি ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে। প্রথম ধাপে ৮০টি উপজেলার নির্বাচন দিয়ে শুরু হবে এই বিশাল কর্মযজ্ঞ। সংখ্যার বিচারে এটি নিছক একটি স্থানীয় নির্বাচন নয়; এটি তৃণমূলের রাজনৈতিক বাস্তবতা, জনসম্পৃক্ততা এবং গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির একটি বড় পরীক্ষা।
প্রশ্ন হলো—এবার কি মানুষ সত্যিই ভোট দেওয়ার সুযোগ পাবেন?
কারণ আমাদের নির্বাচনী ইতিহাসে এমন এক সংস্কৃতিও তৈরি হয়েছে, যেখানে ভোটের মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতার আগেই ফলাফল অনেকটা নির্ধারিত হয়ে যায়। কোথাও প্রার্থী সরে দাঁড়ান, কোথাও প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী হতে ভয় পান, আবার কোথাও রাজনৈতিক কিংবা সামাজিক প্রভাবের কারণে ভোটের প্রকৃত প্রতিযোগিতা সীমিত হয়ে পড়ে। আইনগতভাবে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয় বৈধ হতে পারে; কিন্তু গণতন্ত্রের সৌন্দর্য কেবল আইনি বৈধতায় নয়—তার প্রাণ নিহিত জনগণের স্বাধীন পছন্দে।
একজন জনপ্রতিনিধির সবচেয়ে বড় শক্তি তাঁর পদ নয়, জনগণের ভোট।
ইউনিয়ন পরিষদ সেই জায়গা, যেখানে রাষ্ট্রের সঙ্গে সাধারণ মানুষের সবচেয়ে সরাসরি যোগাযোগ তৈরি হয়। গ্রামের রাস্তা, সেতু, পানি ও স্যানিটেশন, সামাজিক নিরাপত্তা, কৃষি, নাগরিক সনদ, জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন, দুর্যোগ মোকাবিলা—মানুষের প্রতিদিনের জীবনের অসংখ্য প্রয়োজনের সঙ্গে ইউনিয়ন পরিষদ জড়িত। ফলে ইউনিয়ন পরিষদ দুর্বল হলে কাগজে স্থানীয় সরকার থাকলেও বাস্তবে জনগণের সেবা কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে।
আর এখানেই নির্বাচনের গুরুত্ব।
তৃণমূলের মানুষ যদি যোগ্য প্রার্থী বেছে নেওয়ার সুযোগ না পান, তাহলে স্থানীয় সরকার ধীরে ধীরে জনগণের প্রতিষ্ঠান না হয়ে প্রভাবশালী গোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে। তখন জনপ্রতিনিধিত্বের জায়গা দখল করে নেয় নিয়ন্ত্রণের রাজনীতি।
অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে এবার শিক্ষা নেওয়ার সময় এসেছে।
নির্বাচনকে এমন একটি প্রতিযোগিতায় পরিণত করতে হবে, যেখানে প্রার্থী হওয়ার অধিকার যেমন থাকবে, তেমনি ভোটারের পছন্দ প্রকাশের স্বাধীনতাও থাকবে। কোনো প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হলেই সেটিকে সাফল্য হিসেবে দেখার প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত—কেন প্রতিদ্বন্দ্বী নেই? কেন মানুষ নির্বাচনে দাঁড়াতে আগ্রহী নয়? কোথাও কি ভয়, চাপ, অর্থ বা প্রভাব কাজ করছে?
এসব প্রশ্ন এড়িয়ে গেলে নির্বাচন হয়তো সম্পন্ন হবে, কিন্তু গণতন্ত্রের পরীক্ষা সম্পন্ন হবে না।
বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই নির্বাচন আরও গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিভাজন, পারস্পরিক অবিশ্বাস, সামাজিক উত্তেজনা এবং পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিবেশের মধ্যে তৃণমূলের মানুষ এখন নতুন করে দেখতে চাইবেন—কারা মানুষের পাশে ছিলেন, কারা সংকটে ছিলেন, কারা শুধু ক্ষমতার সময় দৃশ্যমান ছিলেন আর কারা প্রতিকূল সময়েও জনগণের সঙ্গে থেকেছেন।
এখানেই নির্বাচনের প্রকৃত সৌন্দর্য।
ভোটের মাঠে জনগণই সবচেয়ে বড় বিচারক। দলীয় পরিচয়, অর্থ, প্রভাব কিংবা প্রচারণার চাকচিক্য—সবকিছুর ঊর্ধ্বে গিয়ে একজন ভোটার যখন নিজের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেন, তখনই গণতন্ত্র তার সবচেয়ে শক্তিশালী রূপটি প্রকাশ করে।
তাই এবারের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে শুধু প্রশাসনিক আয়োজন হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি হতে পারে তৃণমূলে রাজনৈতিক আস্থা পুনর্গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।
নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব এখানে সবচেয়ে বেশি। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরপেক্ষতা, প্রার্থীদের সমান সুযোগ, ভোটকেন্দ্রে নিরাপদ পরিবেশ এবং ভোটারের স্বাধীনতা—এসব নিশ্চিত করতে হবে কঠোরভাবে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদেরও বুঝতে হবে, নির্বাচন মানে প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করা নয়; নির্বাচন মানে জনগণের আস্থা অর্জনের প্রতিযোগিতা।
কারণ প্রতিদ্বন্দ্বীকে ভয় দেখিয়ে জয় পাওয়া যায়, কিন্তু জনগণের আস্থা অর্জন করা যায় না।
একটি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কিংবা সদস্যের পদ হয়তো রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় পদ নয়। কিন্তু একজন সাধারণ মানুষের জীবনে তাঁর প্রভাব অনেক সময় একজন জাতীয় নেতার চেয়েও বেশি। তাই এই পদে বসার যোগ্যতা নির্ধারণের ক্ষমতা কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী কিংবা প্রভাবশালী মহলের হাতে নয়—থাকতে হবে ভোটারের হাতে।
বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার সংস্কৃতি যদি গণতন্ত্রের জায়গা সংকুচিত করে, তবে সুস্থ প্রতিদ্বন্দ্বিতা সেই জায়গা আবার খুলে দিতে পারে।
এবার তাই লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু ‘কতটি ইউনিয়নে নির্বাচন হলো’—তা নয়। আসল প্রশ্ন হওয়া উচিত—কতজন মানুষ স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারলেন, কতজন প্রার্থী সমান সুযোগ পেলেন এবং কতটি ইউনিয়নে জনগণের প্রকৃত রায় প্রতিফলিত হলো।
তৃণমূলের ভোটকে সম্মান করা মানে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ভিত্তিকে সম্মান করা।
সুতরাং এবারের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন হোক এমন এক নির্বাচন, যেখানে ফলাফল আগে থেকে নয়—ভোটের দিন নির্ধারিত হবে। যেখানে জনপ্রতিনিধি হবেন জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধি, কোনো অদৃশ্য সমঝোতার ফল নয়।
বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার জয় নয়—ফিরুক ভোটের লড়াই।
ক্ষমতার প্রভাব নয়—ফিরুক জনগণের রায়।
আর ইউনিয়ন পরিষদ হোক সত্যিকার অর্থেই মানুষের পরিষদ।
লেখক: মোহাম্মদ হাসান, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।