গালির রাজনীতি ও মবের উত্থান: সভ্যতার আয়নায় আমরা

বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক

প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৪৮ এএম

গালিগালাজ কোনো নতুন সামাজিক ব্যাধি নয়। কিন্তু এর ব্যাপ্তি ও প্রকাশভঙ্গি আজ যে পর্যায়ে পৌঁছেছে, তাকে নিছক ভাষার অবক্ষয় বলে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। পরিবার থেকে রাজপথ, পাড়া-মহল্লা থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—অশালীন ভাষা ক্রমেই যেন স্বাভাবিক আচরণের অংশ হয়ে উঠছে। একসময় যে শব্দ উচ্চারণে মানুষ সংকোচবোধ করত, আজ তা অনেকের কাছে প্রতিবাদ, মতপ্রকাশ কিংবা তথাকথিত সাহসিকতার প্রকাশ।

এই অবক্ষয়ের দায় শুধু ব্যক্তির নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমাদের রাজনৈতিক ও সামাজিক সংস্কৃতির সংকট। রাজনীতিতে যখন যুক্তির বদলে ব্যক্তিগত আক্রমণ, আদর্শের পরিবর্তে প্রতিহিংসা এবং নীতির চেয়ে ক্ষমতার হিসাব প্রাধান্য পায়, তখন তার অভিঘাত রাজনীতির সীমানায় আটকে থাকে না—ধীরে ধীরে সমাজের সর্বস্তরে ছড়িয়ে পড়ে।

একটি প্রজন্ম তার চারপাশের আচরণ থেকেই ভাষা, মূল্যবোধ ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি শেখে। তারা যদি দেখে মতের অমিলের জবাব যুক্তি দিয়ে নয়, গালি দিয়ে দেওয়া যায়; আইনের পরিবর্তে দলবদ্ধ শক্তিই শেষ কথা; প্রতিপক্ষকে হেয় করাই সাফল্যের মাপকাঠি—তাহলে সহনশীলতা, ন্যায়বোধ ও শালীনতার জায়গা ক্রমেই সংকুচিত হবে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও উদ্বেগজনক প্রবণতা—‘মব’ সংস্কৃতি। আইন ও বিচারব্যবস্থার বাইরে দলবদ্ধ শক্তির প্রদর্শন কোনো গণতান্ত্রিক সমাজের শক্তির পরিচয় নয়; বরং এটি আইনের শাসন ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি অনাস্থার সংকেত। জনতার আবেগ যখন প্রতিহিংসা চরিতার্থের হাতিয়ারে পরিণত হয়, তখন অপরাধী ও নিরপরাধের পার্থক্য মুছে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো—আজ যে সংস্কৃতি দিয়ে একজন প্রতিপক্ষকে আঘাত করা হচ্ছে, কাল সেটিই অন্য কারও হাতে আরও ভয়ংকর অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে। প্রতিহিংসার রাজনীতিতে স্থায়ী বিজয়ী কেউ হয় না; শেষ পর্যন্ত ক্ষত তৈরি হয় সমাজের ভেতরেই।

তাই প্রশ্নটি শুধু কে কাকে গালি দিল বা কে কাকে আক্রমণ করল—এখানেই সীমাবদ্ধ নয়। মৌলিক প্রশ্ন হলো, আমরা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের হাতে কেমন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংস্কৃতি তুলে দিতে চাই?

রাজনীতিতে মতের সংঘাত থাকবে, তীব্র সমালোচনাও থাকবে। কিন্তু সেই বিরোধের ভাষা হতে হবে শালীন, যুক্তি হতে হবে দৃঢ় এবং প্রতিকারের পথ হতে হবে আইনসম্মত। কারণ একটি রাষ্ট্রের সভ্যতা শুধু অর্থনীতি, উন্নয়ন বা অবকাঠামো দিয়ে পরিমাপ করা যায় না; তার রাজনৈতিক ভাষা, সামাজিক আচরণ এবং ভিন্নমত সহ্য করার সক্ষমতাও সভ্যতার গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড।

গালি রাজনৈতিক শক্তির প্রমাণ নয়—এটি যুক্তির দুর্বলতার প্রকাশ।

মব জনতার ক্ষমতার প্রতীক নয়—এটি আইনের শাসনের ভঙ্গুরতার সংকেত।

সভ্য রাজনীতির লক্ষ্য প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করা নয়; বরং মতভেদ সত্ত্বেও মানবিকতা, ন্যায়বোধ ও সহাবস্থানের জায়গাটি অক্ষুণ্ণ রাখা।

পরিবর্তনের সূচনা হওয়া দরকার রাজনৈতিক নেতৃত্ব থেকেই। গালিগালাজ, ব্যক্তিগত আক্রমণ, হুমকি ও মব-সংস্কৃতির বিরুদ্ধে দলীয় আচরণবিধি এবং কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অশালীনতা ও উসকানির বিরুদ্ধেও আইন প্রয়োগ হতে হবে নিরপেক্ষ, সুনির্দিষ্ট ও যথাযথ প্রক্রিয়ায়।

একই সঙ্গে পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে শিশু-কিশোরদের যুক্তিবোধ, শালীনতা, সহনশীলতা ও আইনের প্রতি শ্রদ্ধা শেখাতে হবে। নাগরিকদেরও বুঝতে হবে—মতবিরোধ গণতন্ত্রের স্বাভাবিক অংশ; কিন্তু গালি, হুমকি কিংবা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া কোনো সুস্থ সমাজের লক্ষণ নয়।

গালির বদলে যুক্তি, প্রতিহিংসার বদলে ন্যায়, মবের বদলে আইন—এই হোক রাজনৈতিক সংস্কার ও সামাজিক সুস্থতার পথ।

 

লেখক: মোহাম্মদ হাসান, সাংবাদিক ও কলামিস্ট

যোগাযোগের ঠিকানা:

বাংলাদেশ বার্তা টুডে

৫৬, চানখারপুল লেন, নাজিমুদ্দিন রোড, বংশাল, ঢাকা-১১০০

ইমেইল: info@bangladeshbartatoday.com