স্থানীয়দের দাবি কাজের মান খুবই নিম্ন মানের হলেও কোন পদক্ষেপ নেয় নি এলজিইডি

বোদায় বৃষ্টিতেই ধসে পড়ল পঞ্চগড়ের ছয় কোটি টাকার সেতুর সংযোগ সড়ক

বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক

প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:০০ পিএম

পঞ্চগড় জেলা প্রতিনিধি | সঞ্জু বনিক সৌরভ

পঞ্চগড় | ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

উদ্বোধনের আগেই বৃষ্টির পানিতে ধসে পড়েছে পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার টাঙ্গন নদীর ওপর নির্মিত নতুন সেতুর সংযোগ সড়ক। প্রায় ছয় কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সেতুটির দুই পাশে তৈরি প্রায় ২০০ মিটার দীর্ঘ ইটের হেরিংবোন সড়কের বিভিন্ন অংশ দেবে যাওয়ায় ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে স্থানীয়দের মধ্যে। অল্প সময়ের ব্যবধানে গুরুত্বপূর্ণ একটি সড়কের এমন পরিণতিতে প্রকল্পের নির্মাণমান ও তদারকি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) দুপুরে উপজেলার ঝলইশালশিরি ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের ধরধরা এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, সেতুর উভয় প্রান্তের সংযোগ সড়কের বিভিন্ন অংশ ধসে নিচে নেমে গেছে। কোথাও ইট সরে গিয়ে বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে, আবার কোথাও সড়কের নিচের মাটি সরে গিয়ে ফাঁকা হয়ে আছে। এতে ছোট-বড় যানবাহন চলাচল কঠিন হয়ে পড়েছে। পথচারীদেরও ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে।

স্থানীয়রা জানান, দীর্ঘ চার বছরের বেশি সময় ধরে নির্মাণকাজ চলার পর সেতুটি সম্প্রতি মানুষের চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। কিন্তু দুই থেকে তিন মাসের মধ্যেই সংযোগ সড়কের এই অবস্থা তৈরি হয়েছে। তাদের অভিযোগ, নির্মাণের সময় কাজের মান নিয়ে একাধিকবার প্রশ্ন উঠলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

স্থানীয় ইউপি সদস্য প্রিয়নাথসহ কয়েকজন বাসিন্দার অভিযোগ, সংযোগ সড়কের ফিলিংয়ের কাজে টাঙ্গন নদী থেকে ড্রেজার মেশিনের মাধ্যমে উত্তোলন করা বালু ব্যবহার করা হয়েছে। ওই বালু দিয়ে সড়ক ভরাটের সময় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি ও এলজিইডির মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা সড়ক টেকসই হবে বলে আশ্বস্ত করেছিলেন।

স্থানীয়দের ভাষ্য, নদী থেকে উত্তোলন করা নরম বালু ব্যবহারের পর সেটি যথাযথভাবে কমপ্যাকশন করা হয়নি। তার ওপর দ্রুত ইটের হেরিংবোন বসানো হয়। বৃষ্টির পানি সড়কের নিচে ঢুকে মাটি সরে যাওয়ায় ওপরের অংশ ধসে পড়েছে বলে তাদের ধারণা।

এদিকে সেতুটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধনের আগেই কাজের মান নিয়ে অসন্তোষ দেখা দিয়েছিল। কিছুদিন আগে পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ও স্থানীয় সংসদ সদস্য ফরহাদ হোসেন আজাদ সেতুটি উদ্বোধন করতে গেলে স্থানীয়দের প্রতিবাদের মুখে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন না করেই ফিরে যান। পরিদর্শনের সময় তিনি সেতু ও সংযোগ সড়কের কাজ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন এবং সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে এলজিইডির পঞ্চগড় জেলা নির্বাহী প্রকৌশলীকে নির্দেশ দেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, সেতু নির্মাণের পাশাপাশি সংযোগ সড়কের কাজে গুণগত মান নিশ্চিত করা না হলে নতুন সেতুর সুফলও পুরোপুরি পাওয়া যাবে না। কারণ সেতু পার হওয়ার পরই সংযোগ সড়কের বেহাল অবস্থার কারণে যানবাহন ও সাধারণ মানুষের চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

স্থানীয় শিক্ষক মফিজুর রহমান বলেন, চার বছরের বেশি সময় ধরে কাজ চলার পর এত অল্প সময়ের মধ্যে সড়ক ধসে পড়া অত্যন্ত হতাশাজনক। সামান্য বৃষ্টিতে সড়কের অবস্থা এমন হওয়ায় নির্মাণকাজের মান এবং তদারকি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তিনি সংশ্লিষ্টদের কাছে দ্রুত তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।

বোদা উপজেলা সহকারী প্রকৌশলী আকরাম হোসেন বলেন, সেতুর দুই পাশে প্রায় ২০০ মিটার হেরিংবোন সড়ক বৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিষয়টি জানার পর দ্রুত সাময়িকভাবে চলাচলের উপযোগী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তিনি আরও জানান, এত অল্প সময়ের মধ্যে সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হবে—এমনটি তাদের ধারণায় ছিল না। নির্মাণকাজে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কোনো গাফিলতি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে সেতুর আটোয়ারী অংশের সংযোগ সড়ক হেরিংবোনের পরিবর্তে স্থায়ী কার্পেটিং করার জন্য নতুন বরাদ্দের প্রস্তাব ঊর্ধ্বতন দপ্তরে পাঠানো হয়েছে।

পঞ্চগড় জেলা এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী শফিউল ইসলাম বলেন, সড়ক ধসের খবর পাওয়ার পর যোগাযোগ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখতে তাৎক্ষণিক নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের চূড়ান্ত বিল এখনো পরিশোধ করা হয়নি। তদন্তে ঠিকাদারের গাফিলতি কিংবা নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

প্রকল্পটির নির্মাণকাজের দায়িত্বে রয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এম এস কর্পোরেশন। স্থানীয়দের প্রশ্ন, কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত একটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো যদি ব্যবহারের কয়েক মাসের মধ্যেই বৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে নির্মাণের প্রতিটি ধাপে মান নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি কতটা কার্যকর ছিল—তা খতিয়ে দেখা জরুরি।

এখন স্থানীয়দের প্রত্যাশা, সাময়িক সংস্কারের পাশাপাশি সড়ক ধসের প্রকৃত কারণ নির্ধারণ করে স্থায়ী সমাধান করা হবে। একই সঙ্গে তদন্তে কোনো অনিয়ম বা গাফিলতি প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হবে, যাতে সরকারি অর্থে নির্মিত অবকাঠামো ভবিষ্যতে একইভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।

যোগাযোগের ঠিকানা:

বাংলাদেশ বার্তা টুডে

৫৬, চানখারপুল লেন, নাজিমুদ্দিন রোড, বংশাল, ঢাকা-১১০০

ইমেইল: info@bangladeshbartatoday.com