ড্রোন হামলা, সীমান্ত-ঝুঁকি ও ইউরোপীয় প্রতিরক্ষা ব্যয়ের চাপ নতুন বাস্তবতা তৈরি করছে

ইউক্রেনের যুদ্ধ কি ইউরোপের নিরাপত্তা কাঠামোকে নতুন করে লিখছে?

বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক

প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:২৬ এএম

বিশেষ প্রতিনিধিঃ সঞ্জয় মজুমদার।

ইউক্রেন যুদ্ধের চতুর্থ বছরে এসে এর প্রভাব আর শুধু ইউক্রেনের ভূখণ্ডে সীমাবদ্ধ নেই; ড্রোন ও আকাশসীমা-সংক্রান্ত ঘটনার পর পূর্ব ইউরোপের সীমান্ত নিরাপত্তা, আকাশ প্রতিরক্ষা এবং ইউরোপের সামরিক প্রস্তুতি নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে। সর্বশেষ ১৭ সেপ্টেম্বর রাশিয়ার ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার পর পোল্যান্ড তার যুদ্ধবিমান প্রস্তুত করে এবং দেশটির কয়েকটি বিমানবন্দর সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়। 

ইউরোপের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় পরিবর্তনের সবচেয়ে দৃশ্যমান দিকগুলোর একটি হলো পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্তে আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা জোরদার করা। NATO বলছে, ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের পর ইউরোপের নিরাপত্তা পরিবেশ মৌলিকভাবে বদলে গেছে। জোটটি পূর্বাঞ্চলীয় ফ্ল্যাঙ্কে আরও প্রস্তুত বাহিনী, বিমান নজরদারি, আকাশ প্রতিরক্ষা এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর সুরক্ষা বাড়িয়েছে। 

সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতে ড্রোন বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। ১৩ সেপ্টেম্বর পোল্যান্ডের সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় একটি রুশ ড্রোন হামলায় কিয়েভ–ওয়ারশগামী ট্রেনকে লক্ষ্যবস্তু করা হয় বলে ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে; ঘটনাটি ইউরোপীয় ভূখণ্ডের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করে। ১৮ সেপ্টেম্বর পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্কও সতর্ক করেছেন যে রাশিয়া NATO-সমর্থক দেশগুলোর বিরুদ্ধে ড্রোন বা রকেট ব্যবহার করে হাইব্রিড হামলার পরিকল্পনা করতে পারে—যদিও এটি পোলিশ সরকারের একটি সতর্কবার্তা, স্বাধীনভাবে প্রমাণিত ভবিষ্যৎ হামলার তথ্য নয়। 

এ ধরনের ঘটনাকে NATO কেবল প্রচলিত সামরিক হুমকি হিসেবে দেখছে না। আকাশসীমা লঙ্ঘন, সাইবার হামলা, নাশকতা এবং অন্যান্য হাইব্রিড কর্মকাণ্ডকে ইউরোপীয় নিরাপত্তার বিস্তৃত ঝুঁকির অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। আগস্টে পোল্যান্ড ও রোমানিয়ায় আকাশসীমা-সংক্রান্ত ঘটনার পর NATO জানিয়েছিল, পূর্বাঞ্চলীয় ফ্ল্যাঙ্কে সমন্বিত আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা আরও শক্তিশালী করা হচ্ছে। 

NATO

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইউরোপের প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধির প্রবণতা। International Institute for Strategic Studies (IISS)-এর সেপ্টেম্বরের মূল্যায়ন অনুযায়ী, ইউরোপীয় NATO সদস্যদের মোট প্রতিরক্ষা ব্যয় ২০২২ সালের তুলনায় নামমাত্র হিসাবে ৯০ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে। একই সময়ে প্রতিরক্ষা বাজেটের বড় অংশ অস্ত্র-সরঞ্জাম সংগ্রহ ও গবেষণা-উন্নয়নে যাচ্ছে। 

ইউরোপীয় ইউনিয়নও শুধু নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর দিকে নয়, ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা ও সামরিক সক্ষমতা ধরে রাখার দিকে অর্থ দিচ্ছে। ১১ সেপ্টেম্বর ইউরোপীয় কমিশন ইউক্রেনের জন্য অতিরিক্ত ৬.১ বিলিয়ন ইউরো অনুমোদন করে, যার মধ্যে আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা, ড্রোন, গোলাবারুদ এবং ইলেকট্রনিক যুদ্ধ সক্ষমতার জন্য অর্থ রয়েছে। 

NATO-এর জুলাইয়ের আঙ্কারা সম্মেলনের ঘোষণাতেও পরিবর্তনের এই দিকটি স্পষ্ট। জোটটি গভীর-নির্ভুল আঘাত, সমন্বিত আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা, মানববিহীন ব্যবস্থা, মহাকাশ সক্ষমতা, গোয়েন্দা ব্যবস্থা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর কথা জানিয়েছে। একই ঘোষণায় ২০২৬ সালে ইউক্রেনকে সামরিক সরঞ্জাম, সহায়তা ও প্রশিক্ষণে ৭০ বিলিয়ন ইউরো দেওয়ার প্রতিশ্রুতির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। 

তবে ইউরোপের সামনে শুধু অর্থের প্রশ্ন নয়; নিরাপত্তা কাঠামোর ভবিষ্যৎ সমন্বয়ও বড় চ্যালেঞ্জ। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লেয়েন সাম্প্রতিক সময়ে ড্রোন হামলা, নাশকতা ও সাইবার হামলার মতো NATO Article 5-এর নিচের স্তরের হুমকি মোকাবিলায় একটি ইউরোপীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রস্তাব দিয়েছেন। তিনি একই সঙ্গে যুক্তরাজ্য, কানাডা, নরওয়ে ও ইউক্রেনকে যুক্ত করে একটি European Security Council গঠনের ধারণাও সামনে এনেছেন। 

এখানে ইউরোপের নিরাপত্তা নীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। শীতল যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে ইউরোপের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা। এখন ইউরোপীয় দেশগুলো নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা, সামরিক শিল্প, আকাশ প্রতিরক্ষা এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়া সক্ষমতা বাড়ানোর দিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। একই সঙ্গে NATO কাঠামোর সঙ্গে সমন্বয় বজায় রাখার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। ইউরোপীয় কাউন্সিল ইতোমধ্যে ড্রোন ও কাউন্টার-ড্রোন ব্যবস্থা, আগাম সতর্কতা, আকাশ প্রতিরক্ষা এবং মহাকাশ সক্ষমতাকে অগ্রাধিকার ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করেছে। 

 

কনসিলিয়াম

এর প্রভাব ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরেও পড়তে পারে। সীমান্তবর্তী দেশগুলোকে আরও বেশি অর্থ ব্যয় করতে হলে শিক্ষা, অবকাঠামো, সামাজিক নিরাপত্তা ও অন্যান্য সরকারি খাতের বাজেটের ওপরও দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে প্রতিরক্ষা শিল্পে বিনিয়োগ বাড়লে ইউরোপের সামরিক উৎপাদন সক্ষমতা এবং প্রযুক্তি খাতের কাঠামো পরিবর্তিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনটি হচ্ছে যুদ্ধের প্রকৃতিতে। ইউক্রেনের যুদ্ধ দেখিয়েছে যে আধুনিক সংঘাতে তুলনামূলক কম খরচের ড্রোন, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ, সাইবার সক্ষমতা, স্যাটেলাইট-নির্ভর নজরদারি এবং দ্রুত তথ্য বিশ্লেষণ প্রচলিত সামরিক শক্তির পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে AI-সমৃদ্ধ প্রযুক্তির দ্রুত ব্যবহার এবং ইউরোপীয় দেশগুলোর জন্য সেই প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলানোর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে। 

ফলে ইউক্রেন যুদ্ধের ভবিষ্যৎ শুধু যুদ্ধবিরতি বা শান্তি আলোচনার ওপর নির্ভর করছে না; এর মধ্য দিয়ে ইউরোপের প্রতিরক্ষা ব্যয়, সীমান্ত নিরাপত্তা, সামরিক শিল্প, আকাশ প্রতিরক্ষা এবং NATO–EU সম্পর্কের কাঠামোও পুনর্গঠিত হচ্ছে। যুদ্ধ কবে শেষ হবে, তা এখনো অনিশ্চিত; কিন্তু চার বছরের সংঘাত ইতোমধ্যে ইউরোপকে নিরাপত্তা পরিকল্পনা নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। প্রশ্ন এখন—যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও এই নতুন নিরাপত্তা কাঠামো কতটা স্থায়ী থাকবে, এবং ইউরোপ তার প্রতিরক্ষা সক্ষমতার কতটা নিজস্বভাবে বহন করতে পারবে।

যোগাযোগের ঠিকানা:

বাংলাদেশ বার্তা টুডে

৫৬, চানখারপুল লেন, নাজিমুদ্দিন রোড, বংশাল, ঢাকা-১১০০

ইমেইল: info@bangladeshbartatoday.com