মামলাজটের ভারে বিচারব্যবস্থা: দ্রুত ও ন্যায়সংগত বিচারই এখন সময়ের দাবি
বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:২৪ পিএম
বিচারপ্রার্থীর কাছে আদালত শুধু একটি প্রতিষ্ঠান নয়—এটি ন্যায়বিচারের শেষ আশ্রয়। সেখানে একটি মামলা বছরের পর বছর ঝুলে থাকা মানে কেবল একটি নথি অনিষ্পন্ন থাকা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মানুষের অধিকার, অর্থ, সময়, মানসিক চাপ এবং ন্যায় পাওয়ার প্রত্যাশা। তাই মামলাজট কোনো সাধারণ প্রশাসনিক সমস্যা নয়, এটি রাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতা ও মানুষের আস্থার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
দেশের আদালতগুলোতে বর্তমানে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ৪৬ লাখ ৩৯ হাজার ৪৭৬টি। এর মধ্যে অধস্তন আদালতেই ঝুলে আছে ৪০ লাখ ৭৮ হাজার ৪৩২টি মামলা। বিপুলসংখ্যক এই মামলার বিপরীতে নিষ্পত্তির গতি তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায় বছরের পর বছর বিচারপ্রার্থীদের অপেক্ষা করতে হচ্ছে। দীর্ঘসূত্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিচার বিভাগের ওপর মানুষের আস্থাও প্রশ্নের মুখে পড়ছে।
সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিচারাধীন মামলার মধ্যে ২৮ লাখ ২৬ হাজার ২১৩টি ফৌজদারি এবং ১৮ লাখ ১৩ হাজার ২৬৩টি দেওয়ানি মামলা। অধস্তন আদালতে গত এক বছরে নিষ্পত্তি হয়েছে ২ লাখ ৭৫ হাজার ৮৪টি মামলা। এই পরিসংখ্যানই বলে দেয়, পুরোনো মামলার বোঝা কমানোর পাশাপাশি প্রতিবছর নতুন করে যুক্ত হওয়া মামলার চাপ সামলানো কতটা কঠিন হয়ে পড়েছে।
তবে পরিস্থিতির মধ্যে ইতিবাচক উদ্যোগও রয়েছে। প্রধান বিচারপতির নির্দেশনায় গত ৭ মে থেকে হাইকোর্টে প্রতি বৃহস্পতিবার পুরোনো মামলাকে অগ্রাধিকার দিয়ে বিশেষ নিষ্পত্তি কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে এটি নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। কিন্তু ৪৬ লাখের বেশি বিচারাধীন মামলার বিশাল জট কাটাতে কেবল পুরোনো মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন বিচারব্যবস্থার সামগ্রিক সক্ষমতা বাড়ানো এবং দীর্ঘসূত্রতার কারণগুলো চিহ্নিত করে কার্যকর সংস্কার।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে দায়ের হওয়া মামলাগুলোর বিষয়টি। পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাবে, সারা দেশে জুলাইয়ের ঘটনায় ১ হাজার ৮৬৬টি মামলা হয়েছে, যার মধ্যে ৭৯৯টি হত্যা মামলা। এসব মামলার তদন্তে মৃত ব্যক্তিকে আসামি করা, জীবিত ব্যক্তিকে মৃত হিসেবে দেখানো এবং পর্যাপ্ত প্রমাণ না পাওয়ায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়ার মতো বিভিন্ন অসংগতি সামনে এসেছে।
অন্যদিকে, প্রকৃত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ থাকা মামলাগুলোর তদন্তও কোথাও কোথাও দীর্ঘায়িত হচ্ছে। একটি ন্যায়ভিত্তিক বিচারব্যবস্থায় কোনো নিরপরাধ ব্যক্তিকে হয়রানি যেমন গ্রহণযোগ্য নয়, তেমনি প্রকৃত অপরাধের বিচার বিলম্বিত হওয়াও কাম্য নয়। ফলে মামলার সংখ্যা কমানোর পাশাপাশি মামলা দায়ের, তদন্ত, অভিযোগপত্র, সাক্ষ্যগ্রহণ ও বিচার—প্রতিটি ধাপে নির্ভুলতা, জবাবদিহি ও সময়ানুবর্তিতা নিশ্চিত করা জরুরি।
মামলাজট কমাতে শুধু বিচারকের সংখ্যা বাড়ালেই হবে না। প্রয়োজন পর্যাপ্ত আদালতকক্ষ, দক্ষ জনবল, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, দ্রুত সাক্ষ্যগ্রহণের ব্যবস্থা এবং তদন্ত সংস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধি। একই সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় সময়ক্ষেপণ, বারবার তারিখ নেওয়ার প্রবণতা এবং প্রক্রিয়াগত জটিলতা কমাতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
বিচার বিলম্বিত হলে শুধু একটি মামলার নিষ্পত্তি পিছিয়ে যায় না—পিছিয়ে যায় একজন মানুষের ন্যায় পাওয়ার অধিকার। দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া কখনো কখনো ভুক্তভোগী ও অভিযুক্ত—উভয়ের জন্যই দুর্ভোগ তৈরি করে। আর যখন মানুষ আদালতে গিয়ে বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে বাধ্য হয়, তখন রাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থার প্রতি তার আস্থায়ও চিড় ধরতে পারে।
তাই এখন প্রয়োজন দ্রুততা ও ন্যায়বিচারের মধ্যে ভারসাম্য। দ্রুত বিচার মানে তড়িঘড়ি করে বিচার নয়; বরং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যথাযথ প্রমাণ, নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে বিচার সম্পন্ন করা। একই সঙ্গে নিরপরাধের সুরক্ষা এবং প্রকৃত অপরাধীর জবাবদিহি—দুটিই নিশ্চিত করতে হবে।
মামলাজট কমানো কোনো একক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নয়। বিচার বিভাগ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, তদন্ত সংস্থা, আইনজীবী এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই সংকটের টেকসই সমাধান সম্ভব নয়।
মানুষ আদালতে যায় ন্যায়বিচারের আশায়, অনন্ত অপেক্ষার জন্য নয়। তাই বিচারব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়িয়ে, অপ্রয়োজনীয় দীর্ঘসূত্রতা বন্ধ করে এবং নিরপেক্ষ ও প্রমাণভিত্তিক বিচার নিশ্চিত করাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। কারণ দ্রুত, নিরপেক্ষ ও ন্যায়সংগত বিচারই পারে মানুষের অধিকার রক্ষা করতে এবং বিচার বিভাগের প্রতি আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে।
লেখক: মোহাম্মদ হাসান, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।