২৪ সেপ্টেম্বরের ওয়াশিংটন বৈঠক ঘিরে শুল্ক-সমঝোতা, বিরল খনিজ, প্রযুক্তি প্রতিযোগিতা ও তাইওয়ান ইস্যুতে নতুন দরকষাকষি

ট্রাম্প–শি বৈঠকের আগে নতুন সমীকরণ: বাণিজ্য, তাইওয়ান ও AI-তে কোন পথে যুক্তরাষ্ট্র–চীন সম্পর্ক?

বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক

প্রকাশ: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:২৩ এএম

বিশেষ প্রতিনিধিঃ সঞ্জয় মজুমদার।

ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে কৌশলগত প্রতিযোগিতা যখন বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও নিরাপত্তার একাধিক ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা পেয়েছে, তখন আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর ওয়াশিংটনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বৈঠক ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে নজর পড়েছে। চলতি বছরের দ্বিতীয় ট্রাম্প–শি শীর্ষ বৈঠকে দুই দেশের বাণিজ্য-সমঝোতা, তাইওয়ান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ও মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠতে পারে।

গত কয়েক মাসে যুক্তরাষ্ট্র–চীন সম্পর্ক একদিকে প্রতিযোগিতাপূর্ণ থাকলেও অন্যদিকে দুই দেশ অর্থনৈতিক সংঘাত নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করেছে। ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে শুল্ক ও বাণিজ্যসংক্রান্ত অস্থায়ী সমঝোতা নভেম্বরের দিকে মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা। এর আগে দুই পক্ষ নতুন করে শুল্ক কমানো, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং কিছু পণ্যের বাজার-প্রবেশ নিয়ে আলোচনা করছে। চীন দ্রুত শুল্ক কমানোর বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছানোর আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

তবে অর্থনৈতিক সম্পর্কের পাশাপাশি প্রযুক্তি ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজ এখন দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অন্যতম বড় চাপের জায়গা। বিশেষ করে বিরল মাটি বা রেয়ার আর্থ খনিজের পরিশোধন ও সরবরাহে চীনের বড় ভূমিকা রয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র উন্নত সেমিকন্ডাক্টর, AI প্রযুক্তি ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোর ওপর চীনের প্রবেশাধিকার সীমিত করার নীতি অনুসরণ করছে। ফলে বাণিজ্যিক সম্পর্কের সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা ক্রমেই একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাচ্ছে।

তাইওয়ানও বৈঠকের সবচেয়ে সংবেদনশীল রাজনৈতিক বিষয়গুলোর একটি। সাম্প্রতিক সময়ে তাইওয়ান বড় ধরনের সামরিক মহড়া করেছে, যেখানে ড্রোন ও প্রচলিত অস্ত্রব্যবস্থার সমন্বিত ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য অস্ত্র বিক্রি এবং তাইওয়ানকে ঘিরে ওয়াশিংটনের নীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে বেইজিংয়ের উদ্বেগ রয়েছে। ফলে অর্থনৈতিক আলোচনার পাশাপাশি নিরাপত্তা ইস্যুতে দুই নেতার অবস্থান আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের বিশেষ নজরে থাকবে।

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধও যুক্তরাষ্ট্র–চীন সম্পর্কের নতুন সমীকরণে যুক্ত হয়েছে। ইরান, হরমুজ প্রণালি এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের স্বার্থ পুরোপুরি এক নয়। চীনের ইরানের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে এবং একই সময়ে হরমুজ প্রণালির অস্থিরতা বৈশ্বিক জ্বালানি ও বাণিজ্য ব্যবস্থায় চাপ সৃষ্টি করছে। চীনের কৌশলগত তেল মজুত ও বিকল্প সরবরাহ ব্যবস্থাও বর্তমান জ্বালানি সংকটে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বলে বিভিন্ন বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।

এরই মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। ১৯ সেপ্টেম্বর সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কাছে বিস্ফোরণ ও ধোঁয়া দেখা যাওয়ার ঘটনায় নতুন করে আঞ্চলিক নিরাপত্তা উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। একই সময়ে হুথিদের হামলা ও লোহিত সাগর এবং হরমুজকেন্দ্রিক সরবরাহ-ঝুঁকি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে।

এই পরিস্থিতিতে ২৪ সেপ্টেম্বরের বৈঠককে শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের বাণিজ্য আলোচনার পর্ব হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়বে না। এটি একই সঙ্গে প্রযুক্তি, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, তাইওয়ান, মধ্যপ্রাচ্য এবং বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার ওপর দুই পরাশক্তির অবস্থান বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক মুহূর্ত। তবে বৈঠক থেকে বড় ধরনের দীর্ঘমেয়াদি সমঝোতা হবে কি না, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে বরং স্বল্পমেয়াদি উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণ ও বিদ্যমান বাণিজ্যিক সমঝোতা ধরে রাখার সম্ভাবনাকেই আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এর প্রভাবও গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে নতুন শুল্ক সংঘাত শুরু হলে বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থা, প্রযুক্তি পণ্য, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। বিপরীতে কিছু ক্ষেত্রে শুল্ক কমানো বা সরবরাহব্যবস্থা স্থিতিশীল করার সমঝোতা হলে আন্তর্জাতিক বাজারে চাপ কিছুটা কমতে পারে। তাই ওয়াশিংটনে ট্রাম্প–শি বৈঠকের ফলাফল শুধু দুই দেশের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নয়, বরং বিশ্ব অর্থনীতি ও ভূরাজনীতির পরবর্তী পর্যায়ের দিকনির্দেশনাও স্পষ্ট করতে পারে।

যোগাযোগের ঠিকানা:

বাংলাদেশ বার্তা টুডে

৫৬, চানখারপুল লেন, নাজিমুদ্দিন রোড, বংশাল, ঢাকা-১১০০

ইমেইল: info@bangladeshbartatoday.com