ইরান ইস্যুতে রাশিয়া–চীনের নতুন অবস্থান: বদলে যাচ্ছে জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা রাজনীতি?
বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:০৯ এএম
বিশেষ প্রতিনিধিঃ সঞ্জয় মজুমদার।
নিউইয়র্কে ১৭ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ইরানের ওপর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণকারী স্বাধীন বিশেষজ্ঞ প্যানেলের ম্যান্ডেট বাড়ানোর প্রস্তাবে রাশিয়া ও চীন ভেটো দেওয়ায় ওই পর্যবেক্ষণ কাঠামোর কার্যক্রম কার্যত শেষের দিকে চলে গেছে। প্রস্তাবটির পক্ষে ১১টি দেশ ভোট দিলেও রাশিয়া ও চীনের ভেটোর কারণে তা পাস হয়নি; পাকিস্তান ভোটদানে বিরত ছিল।
ইরানবিষয়ক এই Panel of Experts মূলত জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন, সম্ভাব্য লঙ্ঘন এবং সংশ্লিষ্ট তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের দায়িত্ব পালন করত। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, প্যানেলের বর্তমান ম্যান্ডেট সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে শেষ হওয়ার কথা ছিল এবং এর কাজের মধ্যে নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নসংক্রান্ত তথ্য যাচাই, লঙ্ঘনের ঘটনা বিশ্লেষণ এবং নিরাপত্তা পরিষদকে সুপারিশ দেওয়া অন্তর্ভুক্ত ছিল।
রাশিয়া ও চীনের ভেটোর পেছনে মূল বিরোধটি শুধু একটি মনিটরিং ম্যান্ডেট নিয়ে নয়; এর সঙ্গে ইরানের ওপর জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞার বর্তমান আইনি অবস্থান নিয়েও গভীর মতপার্থক্য রয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাশিয়া ও চীন যুক্তি দিচ্ছে যে ইরান-সংক্রান্ত পূর্ববর্তী জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞাগুলো ২০১৫ সালের পারমাণবিক সমঝোতার পরবর্তী কাঠামোর অধীনে আর কার্যকর নেই। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলো মনে করে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও চুক্তি-সংক্রান্ত বিরোধের পরিপ্রেক্ষিতে নিষেধাজ্ঞা কাঠামো পুনরায় কার্যকর হয়েছে। তেহরান অবশ্য পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।
এই মতপার্থক্যকে আরও জটিল করেছে তথাকথিত “snapback” প্রক্রিয়া। Security Council Report-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, পশ্চিমা দেশগুলোর দৃষ্টিতে পূর্ববর্তী নিষেধাজ্ঞাগুলো পুনর্বহাল হওয়ার পর সেগুলোর বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণের জন্য বিশেষজ্ঞ প্যানেলের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কিন্তু রাশিয়া ও চীনের আপত্তির কারণে প্যানেলকে কার্যকরভাবে পুনর্গঠন করা সম্ভব হয়নি এবং এর ফলে ইরানবিষয়ক স্বাধীন রিপোর্টিংয়ের ক্ষেত্রে একটি বড় শূন্যতা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি দেখা দিয়েছে।
এখানেই এবারের সিদ্ধান্তের কূটনৈতিক তাৎপর্য সবচেয়ে বেশি। একটি নিষেধাজ্ঞা কার্যকর আছে কি না—এটি এক বিষয়; কিন্তু সেই নিষেধাজ্ঞা বাস্তবে কে কীভাবে লঙ্ঘন করছে, কোন সরঞ্জাম বা প্রযুক্তি কোথায় যাচ্ছে এবং সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলো কী পদক্ষেপ নিচ্ছে—এসব স্বাধীনভাবে যাচাই করার সক্ষমতা আরেক বিষয়। বিশেষজ্ঞ প্যানেলের ম্যান্ডেট শেষ হলে সেই তথ্য যাচাই ও নিরাপত্তা পরিষদে নিয়মিত রিপোর্টিংয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক পথ দুর্বল হয়ে পড়বে। Security Council Report এটিকে সম্ভাব্য “reporting vacuum” হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। জাতিসংঘের কাঠামোর বাইরে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (IAEA)-র নিজস্ব পর্যবেক্ষণ ও যাচাইয়ের ভূমিকা রয়েছে। তবে Security Council Report উল্লেখ করেছে, বর্তমান রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে IAEA-এর যাচাই কার্যক্রমও নানা সীমাবদ্ধতার মুখে রয়েছে। ফলে নিরাপত্তা পরিষদের নিষেধাজ্ঞা পর্যবেক্ষণ এবং পারমাণবিক কর্মসূচি যাচাই—দুটি আলাদা ব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয়ের প্রশ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
এই ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটল, যখন ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাত, উপসাগরীয় নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি ও বাণিজ্যপথ নিয়ে উদ্বেগ ইতোমধ্যেই তীব্র। একই সময়ে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশন শুরু হচ্ছে। ফলে ইরান ইস্যুতে নিরাপত্তা পরিষদের বিভাজন সাধারণ পরিষদের বৃহত্তর কূটনৈতিক আলোচনাতেও প্রভাব ফেলতে পারে। ২০ সেপ্টেম্বরের রয়টার্স প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিউইয়র্কে বিশ্বনেতাদের সমাবেশের সময় মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও ইরান সংকট অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য হয়ে উঠেছে।
এর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো রাশিয়া ও চীনের সমন্বিত অবস্থান। দুই দেশ একই বিষয়ে ভেটো দেওয়ায় নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের মধ্যে ইরান ইস্যুতে রাজনৈতিক বিভাজন আরও স্পষ্ট হয়েছে। একই সময়ে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে বাণিজ্য, প্রযুক্তি, AI এবং ইরানের সঙ্গে চীনের অর্থনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা চলছে; ২৪ সেপ্টেম্বর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সম্ভাব্য বৈঠকেও এসব বিষয় আলোচনায় থাকার কথা রয়েছে।
ইরান ইস্যুতে নিরাপত্তা পরিষদের সর্বশেষ সিদ্ধান্তের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব হতে পারে নিষেধাজ্ঞা প্রয়োগের রাজনৈতিক বিতর্কের পরিবর্তে নিষেধাজ্ঞা পর্যবেক্ষণের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে বিতর্ক বৃদ্ধি। একদিকে পশ্চিমা দেশগুলো স্বাধীন পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করতে পারে; অন্যদিকে রাশিয়া ও চীন জাতিসংঘের বাইরে বিকল্প কূটনৈতিক কাঠামো বা রাজনৈতিক সমাধানের ওপর জোর দিতে পারে। Security Council Report-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আগের একটি নিষেধাজ্ঞা-মনিটরিং ব্যবস্থা ভেটোর মুখে পড়ার পর কিছু দেশ জাতিসংঘের বাইরে বহুপাক্ষিক পর্যবেক্ষণ কাঠামো তৈরির পথ নিয়েছিল।
ফলে ইরানকে ঘিরে বর্তমান সংকট শুধু পারমাণবিক কর্মসূচি বা নিষেধাজ্ঞার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকছে না; এটি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের কর্তৃত্ব, স্বাধীন পর্যবেক্ষণব্যবস্থা এবং বড় শক্তিগুলোর পারস্পরিক সমঝোতার সক্ষমতারও পরীক্ষা হয়ে উঠছে। সামনে যদি নতুন কোনো রাজনৈতিক সমঝোতা না হয়, তাহলে ইরানবিষয়ক নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নের দাবি, তার আইনি বৈধতা এবং স্বাধীনভাবে তথ্য যাচাই—এই তিনটি প্রশ্নই আন্তর্জাতিক কূটনীতির অন্যতম বিতর্কিত ক্ষেত্র হয়ে থাকতে পারে।