বিশ্ব রাজনীতির নতুন কেন্দ্র কি ওয়াশিংটন-মস্কো-বেইজিংয়ের বাইরে তৈরি হচ্ছে?
বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:৩৫ পিএম
বিশেষ প্রতিনিধিঃ সঞ্জয় মজুমদার।
বিশ্ব রাজনীতির প্রচলিত ক্ষমতাকেন্দ্র ওয়াশিংটন, মস্কো ও বেইজিংকে ঘিরে থাকলেও ২০২৬ সালে সেই কাঠামোর বাইরে নতুন কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক শক্তির বলয় গড়ে ওঠার ইঙ্গিত ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। বিশেষ করে ১২–১৩ সেপ্টেম্বর ভারতের নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ১৮তম BRICS শীর্ষ সম্মেলনে বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থা, Global South-এর প্রতিনিধিত্ব এবং বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান সংস্কারের প্রশ্ন সামনে আসায় আন্তর্জাতিক ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
BRICS-এর নয়াদিল্লি ঘোষণায় সদস্যদেশগুলো আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বর্তমান কাঠামোকে সমসাময়িক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছে। ঘোষণায় বহুপাক্ষিকতা ও বহুমেরুতার প্রতি সমর্থনের পাশাপাশি জাতিসংঘসহ বৈশ্বিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামোয় উন্নয়নশীল ও উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর আরও অর্থবহ অংশগ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে। বিশেষ করে আফ্রিকা, এশিয়া এবং লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের দেশগুলোর প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
নয়াদিল্লি সম্মেলনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি Global South-এর অবস্থানকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক রাজনৈতিক প্রশ্ন হিসেবে তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, উন্নয়নশীল দেশগুলো বৈশ্বিক সংকটের সরাসরি প্রভাব বহন করলেও সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামোয় তাদের প্রভাব তুলনামূলকভাবে কম। তিনি Global South-কে শুধু নিয়ম অনুসরণকারী নয়, বরং আন্তর্জাতিক নিয়ম ও নীতি নির্ধারণে অংশগ্রহণকারী শক্তিতে পরিণত করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।
এই আলোচনার সঙ্গে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের বক্তব্যও গুরুত্বপূর্ণভাবে যুক্ত হয়েছে। ১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে BRICS নেতাদের উদ্দেশে বক্তব্যে তিনি বলেন, বর্তমান বিশ্ব ১৯৪৫ সালের বিশ্বের মতো নেই এবং বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলোকেও পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে। তিনি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ, Bretton Woods প্রতিষ্ঠান এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক কাঠামো সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর সিদ্ধান্ত গ্রহণে বৃহত্তর ভূমিকার পক্ষে অবস্থান নেন।
BRICS-এর বর্তমান বিস্তারও এই পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। ২০২৬ সালের সম্মেলনে ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকার পাশাপাশি মিশর, ইথিওপিয়া, ইরান, ইন্দোনেশিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ সম্প্রসারিত সদস্য কাঠামো বৈশ্বিক অর্থনীতি ও কূটনীতিতে জোটটির পরিসর বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে BRICS-এর আলোচনায় AI, অর্থায়ন, বাণিজ্য, খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সংস্কারের মতো বিষয় যুক্ত হয়েছে।
তবে BRICS-এর উত্থানকে সরাসরি একটি নতুন একক বিশ্বশক্তির জন্ম হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। জোটটির সদস্যদের রাজনৈতিক স্বার্থ, অর্থনৈতিক কাঠামো এবং আঞ্চলিক অগ্রাধিকারের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। নয়াদিল্লি সম্মেলনেও মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা নিয়ে ঐকমত্য তৈরি করতে বিভিন্ন দেশের ভিন্ন অবস্থান সমন্বয় করতে হয়েছে। ফলে BRICS-এর প্রভাব বাড়লেও সেটি কতটা সুসংহত রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হবে, তা নির্ভর করবে সদস্যদের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি সমন্বয় এবং ঘোষিত উদ্যোগগুলো বাস্তবায়নের ওপর।
এখানেই মধ্যম শক্তিগুলোর কূটনীতি নতুন গুরুত্ব পাচ্ছে। ভারত, ব্রাজিল, ইন্দোনেশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরবসহ বিভিন্ন রাষ্ট্র একই সঙ্গে একাধিক শক্তিকেন্দ্রের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করছে। তাদের কৌশল অনেক ক্ষেত্রে কোনো একটি শক্তিশিবিরে স্থায়ীভাবে যুক্ত হওয়ার পরিবর্তে বিভিন্ন অংশীদারের সঙ্গে পৃথক ইস্যুতে সহযোগিতা করা। ফলে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে শুধু বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতাই নয়, মধ্যম শক্তিগুলোর দরকষাকষির সক্ষমতাও ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
এই পরিবর্তনের অর্থনৈতিক দিকও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। BRICS ঘোষণায় স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য, সীমান্তপারের পেমেন্ট ব্যবস্থা, উন্নয়ন অর্থায়ন এবং বৈশ্বিক আর্থিক কাঠামোয় উন্নয়নশীল দেশগুলোর অংশগ্রহণ বৃদ্ধির মতো বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে। এগুলো বাস্তবায়িত হলে আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে বিকল্প সহযোগিতা কাঠামো শক্তিশালী হতে পারে; তবে বর্তমান পর্যায়ে এগুলোকে ডলারভিত্তিক বৈশ্বিক ব্যবস্থার পূর্ণ বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করার মতো বাস্তব পরিবর্তন এখনও প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
এর প্রভাব সাধারণ মানুষের জীবনেও পৌঁছাতে পারে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, জ্বালানি, খাদ্য, ঋণ, প্রযুক্তি ও সরবরাহব্যবস্থার সিদ্ধান্তে উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রভাব বাড়লে তা দীর্ঘমেয়াদে পণ্যদাম, বিনিয়োগ, অবকাঠামো অর্থায়ন এবং প্রযুক্তি প্রবেশাধিকারে প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে Global South-এর দেশগুলোর জন্য উন্নয়ন অর্থায়ন, ঋণ পুনর্গঠন ও প্রযুক্তি সহযোগিতার প্রশ্নটি সরাসরি অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত।
সব মিলিয়ে, ওয়াশিংটন-মস্কো-বেইজিংয়ের বাইরে নতুন কোনো একক ‘চতুর্থ কেন্দ্র’ ইতিমধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর চেয়ে বলা যায়, বিশ্ব রাজনীতি ধীরে ধীরে একক বা সীমিত ক্ষমতাকেন্দ্রিক কাঠামো থেকে আরও জটিল ও বহুমাত্রিক ব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে। BRICS, Global South এবং মধ্যম শক্তিগুলোর সক্রিয় কূটনীতি সেই পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এখন মূল প্রশ্ন হলো—এই দেশগুলো কি নিজেদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থের পার্থক্য অতিক্রম করে দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত প্রভাব তৈরি করতে পারবে, নাকি বহুমেরু বিশ্বের ধারণা মূলত কূটনৈতিক ঘোষণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। ২০২৬ সালের BRICS সম্মেলন সেই প্রশ্নকে আন্তর্জাতিক রাজনীতির কেন্দ্রীয় আলোচনার আরও কাছাকাছি নিয়ে এসেছে।