আমন চারা রোপণ শেষে অলস সময়, আয় বন্ধে দুশ্চিন্তায় কৃষক
বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:০২ পিএম
জয়পুরহাট প্রতিনিধি: আব্দুল কাদের
সকালে ঘুম থেকে উঠে একবার ধানক্ষেতে যান শ্রী অনিল চন্দ্র। সবুজ চারাগুলো দেখে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকেন। কোথাও পানি বেশি জমেছে কি না, কোনো চারা হলদে হয়ে যাচ্ছে কি না খুঁটিয়ে দেখেন। তারপর বাড়ি ফিরে উঠানে বসে থাকেন। কাজ নেই, আয়ও নেই। অথচ চাল, ডাল, তেলসহ সংসারের খরচ থেমে নেই। হাতে যা জমানো ছিল, তা দিয়েই চলছে সংসার। আর কত দিন এভাবে চলবে, সেই দুশ্চিন্তাই ঘুরপাক খায় তাঁর মনে।
জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার এক প্রান্তিক কৃষক শ্রী অনিল চন্দ্র মতো অনেক কৃষকের জীবনেই এখন এমন বাস্তবতা। আমন ধান রোপণের ব্যস্ততা শেষ। মাঠজুড়ে সবুজ ধান গাছ। বর্ষার কাদা-পানিতে দিনরাত পরিশ্রমের পর আপাতত জমিতে ভারী কাজের চাপ কমেছে। কিন্তু ফসল ঘরে তোলার আগ পর্যন্ত এই বিরতিই অনেক কৃষকের কাছে স্বস্তির নয়, বরং দুশ্চিন্তার।
কালাই উপজেলার সোমবার বেলা ১২টায় বিভিন্ন মাঠ ঘুরে দেখা যায়, বিস্তীর্ণ জমিতে আমন ধানের চারা বাতাসে দুলছে। কোথাও কৃষক জমির আইল ধরে হাঁটছেন, কোথাও নিড়ানি দিচ্ছেন, আবার কেউ জমিতে পানি জমার অবস্থা দেখছেন। ধান রোপণের মৌসুমে যে মাঠে দিনভর শ্রমিকদের হাঁকডাক ছিল, সেখানে এখন তুলনামূলক নীরবতা। কৃষকেরা অপেক্ষা করছেন চারার বেড়ে ওঠার, আর সেই সঙ্গে অগ্রহায়ণে নতুন ধান ঘরে তোলার দিনের।
কৃষিকাজের এই বিরতিতে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েন ভূমিহীন কৃষি শ্রমিক ও প্রান্তিক কৃষকেরা। আমন রোপণের সময় কাজ থাকলেও পরে নিয়মিত মজুরি পাওয়ার সুযোগ কমে আসে। কারও হাতে সামান্য জমি আছে, কারও জীবিকা পুরোপুরি অন্যের জমিতে শ্রম বিক্রির ওপর নির্ভরশীল। ফলে মাঠে কাজ কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কমে যায় তাঁদের আয়ও।
কালাইয়ের পুনট এলাকার দিনমজুর কৃষক শ্রী অনিল চন্দ্রের ভাষায়, ‘ধান রোপণের সময় প্রতিদিন কাজ ছিল। এখন কয়েক দিন কাজ পাই, আবার কয়েক দিন বসে থাকতে হয়। সংসারের খরচ তো আর বসে থাকে না। ধারদেনা করে চলতে হয়। ধান ঘরে উঠলে কিছুটা স্বস্তি মিলবে এই আশাতেই দিন গুনছি।’
তবে কৃষকের এই অবসর সবার জন্য এক রকম নয়। যাঁদের নিজস্ব জমি আছে, তাঁরা ধানের পরিচর্যার পাশাপাশি সংসারের অন্যান্য কাজে সময় দিতে পারছেন। কেউ বাড়ির ভাঙাচোরা অংশ মেরামত করছেন, কেউ গবাদিপশুর দেখভাল করছেন। আবার যাঁদের হাতে কিছু পুঁজি রয়েছে, তাঁরা এই সময়টিকে বিকল্প আয়ের কাজে লাগানোর চেষ্টা করছেন।
কালাইয়ের আওড়া কালি মোহর মহল্লার কৃষক এনামুল হক সংসারে রয়েছে কয়েকটি হাঁস-মুরগি। ধানের জমিতে কাজ কমে গেলে সেগুলোর পরিচর্যা করেন তিনি। পাশাপাশি বাড়ির পাশে অল্প জমিতে মৌসুমি সবজি চাষ করেন। তাঁর ভাষ্য, ‘ধানের জমিতে সারা বছর কাজ থাকে না। তাই সংসার চালাতে অন্য কাজও করতে হয়। সবজি বিক্রি করে কিছু টাকা আসে। হাঁস-মুরগি থেকেও আয় হয়। এতে অন্তত পুরোপুরি বসে থাকতে হয় না।’
কৃষকদের এই সময় কাটে নানা আলাপ-আলোচনায়ও। সকাল কিংবা সন্ধ্যায় গ্রামের হাটের চায়ের দোকানে জমে ওঠে আড্ডা। রাজনীতি, আবহাওয়া, বাজারদর, সার-বীজের দাম, ধানের ফলন সবই আলোচনায় আসে।
কৃষকদের কাছে এখন সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা, ধানের চারা যেন ভালোভাবে বেড়ে ওঠে। রোগবালাই কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগে যেন ক্ষতি না হয়। উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ধানের দাম পাওয়া নিয়েও তাঁদের ভাবনা রয়েছে। কারণ, ভালো ফলন হলেও বাজারে ন্যায্যমূল্য না পেলে কৃষকের মুখে হাসি থাকে না।
কালাই উপজেলা কৃষি কার্যালয় উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা হারুন উর রশীদের ভাষ্য, আমন ধান রোপণের পর জমিতে নিয়মিত নজরদারি, সুষম সার প্রয়োগ, আগাছা দমন ও রোগবালাই পর্যবেক্ষণ জরুরি। কৃষকেরা এ সময় জমির পরিচর্যার পাশাপাশি বিকল্প আয়ের কাজেও যুক্ত হতে পারেন। তবে জমির ধরন, আবহাওয়া ও চাষপদ্ধতি অনুযায়ী পরিচর্যার প্রয়োজন ভিন্ন হতে পারে।