তেল সরবরাহ, সমুদ্রপথ ও ইউরোপ-এশিয়ার অর্থনীতিতে বাড়ছে ভূরাজনৈতিক চাপ

হরমুজ সংকট কি বিশ্ব অর্থনীতির নতুন জ্বালানি-মানচিত্র তৈরি করছে?

বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক

প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৪৬ এএম

বিশেষ প্রতিনিধিঃ সঞ্জয় মজুমদার।

নিউইয়র্ক, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬: ইরান–যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের মধ্যে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে কমে যাওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থা নতুন চাপের মুখে পড়েছে। ২২ সেপ্টেম্বর রয়টার্স জানায়, আগের দিন হরমুজ দিয়ে মাত্র দুটি পণ্যবাহী জাহাজ পার হয়েছে, যেখানে সংঘাতের আগে দৈনিক গড়ে প্রায় ১২৫টি বড় বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করত; একই সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ১০০ ডলার এবং যুক্তরাষ্ট্রের WTI প্রায় ৯৫ ডলারের কাছাকাছি ছিল।

হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব শুধু একটি আঞ্চলিক সমুদ্রপথ হিসেবে নয়; এটি বৈশ্বিক জ্বালানি অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ‘চোকপয়েন্ট’। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা IEA-এর হিসাবে, ২০২৫ সালে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল ও তেলজাত পণ্য এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়েছে—যা বিশ্বের সমুদ্রপথে তেল বাণিজ্যের প্রায় ২৫ শতাংশ। একই সঙ্গে কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিপুল LNG রপ্তানিও এই পথের ওপর নির্ভরশীল।

সংকটের সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি ঘটছে জ্বালানি সরবরাহের ভূগোলে। উপসাগরীয় দেশগুলো হরমুজের বিকল্প হিসেবে পাইপলাইন ও অন্যান্য বন্দর ব্যবহারের চেষ্টা করছে। IEA জানিয়েছে, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের কিছু বিকল্প অবকাঠামো রয়েছে, যার মাধ্যমে সম্মিলিতভাবে আনুমানিক ৩.৫ থেকে ৫.৫ মিলিয়ন ব্যারেল দৈনিক অপরিশোধিত তেল হরমুজ এড়িয়ে পরিবহন করা সম্ভব। কিন্তু এই সক্ষমতা হরমুজ দিয়ে স্বাভাবিক সময়ে যাওয়া মোট প্রবাহের তুলনায় সীমিত।

এই সীমাবদ্ধতার কারণে এশিয়া সবচেয়ে সরাসরি ঝুঁকির মুখে রয়েছে। IEA-এর তথ্য অনুযায়ী, হরমুজ দিয়ে যাওয়া তেল ও তেলজাত পণ্যের প্রায় ৮০ শতাংশের গন্তব্য এশিয়া। চীন, ভারত ও জাপান বড় আমদানিকারকদের মধ্যে রয়েছে। ২০২৫ সালে হরমুজ দিয়ে যাওয়া অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৪৪ শতাংশ চীন ও ভারত গ্রহণ করেছে। ফলে প্রণালিতে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা এশিয়ার শিল্প, পরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও আমদানি ব্যয়ের ওপর সরাসরি চাপ তৈরি করতে পারে।

ইউরোপের পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন হলেও ঝুঁকি কম নয়। হরমুজ থেকে ইউরোপে সরাসরি অপরিশোধিত তেলের প্রবাহ এশিয়ার তুলনায় অনেক কম; IEA-এর হিসাবে ২০২৫ সালে ওই প্রণালি দিয়ে যাওয়া অপরিশোধিত তেলের মাত্র প্রায় ৪ শতাংশ ইউরোপমুখী ছিল। কিন্তু বৈশ্বিক বাজার একটি আন্তঃসংযুক্ত ব্যবস্থা হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের সরবরাহ সংকটের প্রভাব ইউরোপের পরিশোধিত জ্বালানি, বিশেষ করে ডিজেলের বাজারেও পড়ছে। IEA বলছে, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউক্রেনের সংঘাতের কারণে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে।

সাম্প্রতিক বাজারচিত্র সেই চাপেরই প্রতিফলন। রয়টার্সের ২২ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে বলা হয়, ব্রেন্ট ফিউচার প্রায় ৯৯.৯৪ ডলার এবং WTI প্রায় ৯৫.৪৩ ডলারে লেনদেন হচ্ছিল। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, হরমুজ দিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা বেশি তেল প্রবাহের লক্ষণ দেখা গেলেও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা বাজারকে স্থিতিশীল হতে দিচ্ছে না।

IEA-এর ১৮ সেপ্টেম্বরের বিশ্লেষণ পরিস্থিতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেছে—বিশ্বের তেল মজুত দ্রুত কমছে। সংস্থাটির হিসাবে, গত ছয় মাসে বৈশ্বিক পর্যবেক্ষণযোগ্য তেল মজুত দৈনিক প্রায় ২.৮ মিলিয়ন ব্যারেল হারে কমেছে এবং যুদ্ধ শুরুর সময়ের তুলনায় মজুত প্রায় ৫০৭ মিলিয়ন ব্যারেল কম। IEA সদস্যদেশগুলো সংকট মোকাবিলায় ৩০০ মিলিয়নের বেশি ব্যারেল জরুরি মজুত বাজারে ছেড়েছে। ফলে দীর্ঘস্থায়ী সরবরাহ সংকট তৈরি হলে বাজারের ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে।

তবে সংকটের মধ্যে বিকল্প সরবরাহব্যবস্থারও বিকাশ ঘটছে। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত হরমুজ এড়িয়ে তেল পরিবহনের সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করেছে। IEA জানিয়েছে, সৌদি আরবের লোহিত সাগরীয় বন্দর ইয়ানবু এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহমুখী বিকল্প রুট ব্যবহার করে জুনে হরমুজের বাইরে দিয়ে উপসাগরীয় তেল রপ্তানি সর্বোচ্চ ৭.৮ মিলিয়ন ব্যারেল দৈনিক পর্যন্ত উঠেছিল; পরে লোহিত সাগর অঞ্চলের হামলার কারণে আগস্টে তা প্রায় ৫.৫ মিলিয়নে নেমে আসে।

এর অর্থ হলো, বিশ্ব অর্থনীতি এখন শুধু ‘হরমুজ খোলা না বন্ধ’—এই দ্বৈত সমীকরণের মধ্যে নেই। বরং তেল উৎপাদক দেশগুলো বিকল্প পাইপলাইন, বন্দর, মজুত এবং দীর্ঘতর সমুদ্রপথের ওপর নির্ভরতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে এশীয় আমদানিকারকরাও সরবরাহ উৎস বৈচিত্র্য করার প্রয়োজনীয়তা নতুন করে দেখছে। এই পরিবর্তনগুলো দীর্ঘস্থায়ী হলে ভবিষ্যতের জ্বালানি বাণিজ্যে নিরাপত্তা ও সরবরাহের নিশ্চয়তা মূল্য নির্ধারণের পাশাপাশি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

সমুদ্রপথের দিক থেকেও পরিস্থিতি পরিবর্তিত হচ্ছে। হরমুজের পাশাপাশি লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দাবের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। ফলে জাহাজ কোম্পানিগুলোকে নিরাপত্তা, বিমা, সময় ও জ্বালানি ব্যয়ের হিসাব নতুন করে করতে হচ্ছে। দীর্ঘ বা বিকল্প রুট ব্যবহারের প্রয়োজন হলে পণ্য পরিবহনের সময় ও ব্যয় বাড়তে পারে, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত আমদানি ব্যয় ও ভোক্তা মূল্যেও পৌঁছাতে পারে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, হরমুজ সংকটের সমাধান এখন সরাসরি ভূরাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। ২২ সেপ্টেম্বর ইরান জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র সামরিক চাপ কমালে এবং ইরানি বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ প্রত্যাহার করলে তারা সাত দিনের মধ্যে হরমুজ পুনরায় খুলতে প্রস্তুত। একই দিনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ওয়াশিংটন ও তেহরান একটি সমঝোতার দিকে এগোচ্ছে। তবে এখনো কোনো চূড়ান্ত চুক্তি হয়নি এবং হরমুজের স্বাভাবিক বাণিজ্যিক প্রবাহ পুরোপুরি ফিরেছে—এমন পরিস্থিতিও তৈরি হয়নি।

এই অবস্থায় হরমুজ সংকটকে শুধু মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক সংঘাত হিসেবে দেখলে এর অর্থনৈতিক মাত্রা আড়ালে পড়ে যায়। বাস্তবে এটি তেল, LNG, শিপিং, বীমা, শিল্প উৎপাদন ও ভোক্তা বাজার—সবকিছুকে একই ভূরাজনৈতিক সমীকরণের মধ্যে নিয়ে এসেছে। হরমুজের প্রবাহ দ্রুত স্বাভাবিক হলে বাজারে সরবরাহের চাপ কমতে পারে; বিপরীতে দীর্ঘস্থায়ী বিঘ্ন হলে বিকল্প রুট ও জ্বালানি উৎসের দিকে বিশ্বের নির্ভরতা আরও বাড়তে পারে।

আগামী কয়েক সপ্তাহ তাই বিশ্ব জ্বালানি অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ইরান–যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক যোগাযোগ কতটা এগোয়, হরমুজে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল কত দ্রুত স্বাভাবিক হয়, সৌদি ও আমিরাতের বিকল্প রুট কতটা কার্যকর থাকে এবং বৈশ্বিক তেল মজুত কতটা দ্রুত পুনর্গঠিত হয়—এসবের ওপর নির্ভর করবে বাজারের পরবর্তী দিক। হরমুজ সংকট শেষ পর্যন্ত সাময়িক সরবরাহ-ধাক্কা হয়ে থাকবে, নাকি বিশ্ব অর্থনীতিকে আরও বহুমুখী ও বিকল্পনির্ভর একটি নতুন জ্বালানি-মানচিত্রের দিকে ঠেলে দেবে—এখন সেটিই বড় প্রশ্ন।

যোগাযোগের ঠিকানা:

বাংলাদেশ বার্তা টুডে

৫৬, চানখারপুল লেন, নাজিমুদ্দিন রোড, বংশাল, ঢাকা-১১০০

ইমেইল: info@bangladeshbartatoday.com