ইউক্রেনের ড্রোন যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ছে ইউরোপের আকাশে—বদলে যাচ্ছে নিরাপত্তার সমীকরণ?
বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৪৭ এএম
বিশেষ প্রতিনিধি, সঞ্জয় মজুমদার:
কিয়েভ–মস্কো–ব্রাসেলস, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬: ইউক্রেন যুদ্ধের ড্রোন হামলা এখন যুদ্ধক্ষেত্রের সীমানা ছাড়িয়ে ইউরোপের নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। ২০ সেপ্টেম্বর রাশিয়ার বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে ইউক্রেনের বড় আকারের ড্রোন হামলার পর রাশিয়াও ইউক্রেনের একাধিক অঞ্চলে পাল্টা হামলা চালিয়েছে। একই সময়ে ন্যাটো সদস্যদেশ লিথুয়ানিয়ার আকাশসীমায় ড্রোন অনুপ্রবেশের ঘটনায় ইউরোপের পূর্বাঞ্চলীয় দেশগুলোর আকাশ প্রতিরক্ষা ও সীমান্ত নিরাপত্তা নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
রুশ কর্মকর্তাদের দাবি, মস্কো অঞ্চলের দিকে বিপুলসংখ্যক ড্রোন পাঠানো হয়েছিল এবং বেশির ভাগই প্রতিহত করা হয়। হামলায় একটি তেল শোধনাগারসহ কয়েকটি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। ইউক্রেনের পক্ষ থেকেও রুশ সামরিক ও জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে দূরপাল্লার ড্রোন ব্যবহারের সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়টি ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। এই প্রবণতা যুদ্ধকে শুধু সম্মুখসমরের বদলে দূরপাল্লার প্রযুক্তিনির্ভর সংঘাতে পরিণত করছে।
ইউরোপের জন্য সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা ঘটছে যুদ্ধের সীমান্তবর্তী আকাশসীমায়। ১৫ সেপ্টেম্বর লিথুয়ানিয়ার আকাশসীমায় প্রবেশ করা একটি ড্রোন ন্যাটোর যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করে। ড্রোনটির উৎস ও উদ্দেশ্য নিয়ে তদন্ত চললেও ঘটনাটি বাল্টিক অঞ্চলের আকাশ নজরদারি ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতার দুর্বলতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। রোমানিয়া ও মলদোভাতেও ইউক্রেন যুদ্ধের সঙ্গে সম্পর্কিত ড্রোন অনুপ্রবেশের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে ইউরোপের নিরাপত্তা নীতিতে ‘হাইব্রিড হুমকি’ একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হয়ে উঠছে। ড্রোনের পাশাপাশি সাইবার হামলা, নাশকতা, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় আক্রমণ এবং তথ্যযুদ্ধ—এসবকে একই নিরাপত্তা কাঠামোর আওতায় বিবেচনা করা হচ্ছে। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ ১৮ সেপ্টেম্বর ইউরোপের বিরুদ্ধে রাশিয়ার কথিত হাইব্রিড কর্মকাণ্ড বৃদ্ধির কথা উল্লেখ করে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো সুরক্ষার পরিকল্পনা তৈরির নির্দেশ দিয়েছেন। মস্কো এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নও বিষয়টিকে কেবল জাতীয় নিরাপত্তার সমস্যা হিসেবে দেখছে না। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লেয়েন এমন একটি সমন্বিত ইউরোপীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রস্তাব দিয়েছেন, যার মাধ্যমে ড্রোন হামলা, নাশকতা বা সাইবার আক্রমণের মতো হুমকিতে সদস্যদেশগুলো দ্রুত সমন্বিত প্রতিক্রিয়া জানাতে পারবে। এর ফলে ন্যাটোর সামরিক কাঠামোর পাশাপাশি ইইউর নিজস্ব নিরাপত্তা সহযোগিতার পরিধি বাড়ানোর প্রশ্ন সামনে এসেছে।
ড্রোন যুদ্ধের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর অর্থনীতি। অপেক্ষাকৃত কম খরচে তৈরি ড্রোন দিয়ে ব্যয়বহুল সামরিক ও অবকাঠামোগত লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করা সম্ভব হওয়ায় প্রচলিত বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়ছে। একই সঙ্গে প্রতিটি আক্রমণ প্রতিহত করতে ব্যবহৃত ক্ষেপণাস্ত্র ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির ব্যয়ও বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে ইউরোপকে এখন শুধু উন্নত অস্ত্র কেনা নয়, কম ব্যয়ে বিপুলসংখ্যক ড্রোন শনাক্ত ও প্রতিহত করার প্রযুক্তিও উন্নত করতে হচ্ছে।
এর প্রভাব জ্বালানি বাজারেও পড়ছে। রাশিয়ার তেল শোধনাগার ও ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা সরবরাহব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। ২১ সেপ্টেম্বরের বাজার বিশ্লেষণে রাশিয়ার শোধনাগারগুলোর ওপর ড্রোন হামলা এবং বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে ডিজেল সরবরাহ ও দামের ওপর চাপের কথা উঠে এসেছে। এর প্রভাব পরিবহন, শিল্প উৎপাদন এবং ইউরোপীয় ভোক্তা বাজার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
তবে ড্রোন অনুপ্রবেশের প্রতিটি ঘটনাকে সরাসরি রাশিয়া–ন্যাটো সংঘাতের সূচনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। অনেক ক্ষেত্রেই হামলার উৎস, উদ্দেশ্য ও দায় নিয়ে তদন্ত প্রয়োজন হয়। ইউরোপীয় দেশগুলোর বর্তমান পদক্ষেপ মূলত সম্ভাব্য ঝুঁকি কমানো, আকাশসীমা পর্যবেক্ষণ এবং প্রতিরোধ সক্ষমতা বাড়ানোর দিকে কেন্দ্রীভূত।
তবু দীর্ঘমেয়াদে পরিবর্তনটি গুরুত্বপূর্ণ। ইউক্রেন যুদ্ধ ইউরোপকে এমন একটি নিরাপত্তা পরিবেশের মুখোমুখি করেছে যেখানে স্থলসীমান্তের পাশাপাশি আকাশসীমা, সাইবারস্পেস, জ্বালানি অবকাঠামো ও তথ্যপ্রবাহও নিরাপত্তার অংশ। ফলে প্রতিরক্ষা নীতির কেন্দ্রবিন্দু ধীরে ধীরে শুধু প্রচলিত সেনা ও অস্ত্র থেকে বহুমাত্রিক প্রতিরোধ ব্যবস্থার দিকে সরে যাচ্ছে।
এখন প্রশ্ন হলো, এই পরিবর্তন কতটা স্থায়ী হবে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে ইউরোপীয় দেশগুলোর প্রতিরক্ষা ব্যয়, ড্রোন প্রতিরোধ প্রযুক্তি, সীমান্ত নজরদারি এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো সুরক্ষায় বিনিয়োগ আরও বাড়তে পারে। বিপরীতে কূটনৈতিক সমাধানের অগ্রগতি হলে সামরিক চাপের পাশাপাশি ইউরোপের নিরাপত্তা স্থাপত্যে আলোচনার ভূমিকাও বাড়তে পারে।
ইউক্রেনের যুদ্ধ তাই শুধু কিয়েভ ও মস্কোর মধ্যে সংঘাতের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই। ড্রোন প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার ইউরোপকে নতুন একটি বাস্তবতার মুখোমুখি করেছে—ভবিষ্যতের যুদ্ধের সীমারেখা হয়তো মানচিত্রে আঁকা থাকবে, কিন্তু তার প্রভাব সীমান্তের অনেক বাইরে পৌঁছে যাবে।