সার সংকটের মধ্যে জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি: চাপে কৃষি, ঝুঁকিতে খাদ্যনিরাপত্তা

বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক

প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:০৫ এএম

দেশের কৃষি খাত এখন এক অস্বাভাবিক চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে সার সংকট, অন্যদিকে দফায় দফায় জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি—সব মিলিয়ে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে ফসল ফলিয়েও কাঙ্ক্ষিত লাভের মুখ দেখা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। কৃষকের ঘাড়ে একের পর এক ব্যয়ের বোঝা চাপছে, অথচ উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করার নিশ্চয়তা এখনো দুর্বল। এই বাস্তবতা শুধু কৃষকের আয়-ব্যয়ের হিসাবকে সংকুচিত করছে না; এর প্রভাব পড়ছে দেশের খাদ্যনিরাপত্তা, গ্রামীণ অর্থনীতি এবং শেষ পর্যন্ত ভোক্তার জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপরও।

সবশেষ গত ২০ সেপ্টেম্বর সরকার ডিজেল, পেট্রোল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম লিটারপ্রতি আরও ২০ টাকা বাড়িয়েছে। নতুন দামে ডিজেল প্রতি লিটার ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৫৫ টাকা, পেট্রোল ১৬০ টাকা এবং অকটেন ১৬৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর আগে দাম ছিল যথাক্রমে ১১৫, ১৩৫, ১৪০ ও ১৪৫ টাকা। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়াকে এই মূল্যবৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে।

কিন্তু কৃষকের কাছে বিষয়টি কেবল আন্তর্জাতিক বাজারের হিসাব নয়; এটি সরাসরি তার জমি, সেচ, চাষাবাদ ও সংসারের হিসাবের সঙ্গে যুক্ত। চলতি বছরেই এটি জ্বালানি তেলের তৃতীয় দফা মূল্যবৃদ্ধি। এর আগে গত ১৯ এপ্রিল ডিজেলের দাম লিটারে ১৫ টাকা, কেরোসিন ১৮ টাকা, পেট্রোল ১৯ টাকা এবং অকটেন ২০ টাকা বাড়ানো হয়েছিল। পরে ১ জুন থেকে অকটেন, পেট্রোল ও কেরোসিনের দাম আরও ৫ টাকা করে বাড়ানো হয়। অর্থাৎ অল্প সময়ের ব্যবধানে জ্বালানি ব্যয়ের ওপর একাধিক ধাক্কা এসেছে।

এই ধারাবাহিক মূল্যবৃদ্ধির সবচেয়ে বড় অভিঘাত পড়ার আশঙ্কা কৃষি ও পরিবহন খাতে। কারণ বাংলাদেশের কৃষি এখনো জ্বালানি, বিশেষ করে ডিজেলনির্ভর। সেচ, জমি চাষ, ফসল কাটা, মাড়াই-ঝাড়াই এবং উৎপাদিত ফসল বাজারে পৌঁছে দেওয়া—কৃষির প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপেই জ্বালানি ব্যয়ের সরাসরি ভূমিকা রয়েছে।

বিশেষ করে ধান উৎপাদনে সেচ একটি অপরিহার্য উপাদান। দেশের সেচব্যবস্থার বড় একটি অংশ এখনো ডিজেলনির্ভর। ফলে ডিজেলের দাম বাড়লে শুধু সেচের খরচই বাড়ে না; এর সঙ্গে জমি প্রস্তুত, চাষ, ফসল কাটা, মাড়াই এবং পরিবহনের ব্যয়ও ধাপে ধাপে বেড়ে যায়। অর্থাৎ একটি লিটারের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব কৃষকের কাছে বহুগুণ হয়ে ফিরে আসে।

 

কৃষি অর্থনীতির বাস্তবতা হলো—কৃষক যখন উৎপাদন শুরু করেন, তখন তার হাতে ফসলের ভবিষ্যৎ বাজারদর থাকে না। কিন্তু সার, বীজ, কীটনাশক, শ্রম, সেচ, যন্ত্রপাতি ও পরিবহনের খরচ তাকে আগেই বহন করতে হয়। ফলে উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও বাজারে ফসলের দাম যদি একই অনুপাতে না বাড়ে, তাহলে সেই ব্যবধানটিই কৃষকের লোকসানে পরিণত হয়।

মাঠপর্যায়ের চিত্রও উদ্বেগজনক। শ্যালো মেশিন বা ডিজেলচালিত সেচযন্ত্রের মালিকদের জ্বালানি ব্যয় বেড়ে গেলে স্বাভাবিকভাবেই সেচের ভাড়া বাড়াতে হয়। কারণ আগের দামে সেচ দিলে তাদেরও ব্যয় ওঠে না। অন্যদিকে কৃষকের সামনে থাকে দুটি কঠিন বিকল্প—বাড়তি খরচ করে সেচ দেওয়া, অথবা সেচ কমিয়ে ফলন ঝুঁকির মধ্যে ফেলা। বিশেষ করে বর্গাচাষি ও প্রান্তিক কৃষকের জন্য এই সিদ্ধান্ত আরও কঠিন।

 

এর সঙ্গে যোগ হয়েছে সার, বীজ, কীটনাশক ও শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধির চাপ। ফলে একই জমিতে আগের তুলনায় বেশি অর্থ বিনিয়োগ করেও কৃষক নিশ্চিত নন যে ফসল বিক্রি করে সেই বিনিয়োগের ন্যায্য প্রতিফলন পাবেন। কৃষকের এই অনিশ্চয়তা দীর্ঘস্থায়ী হলে চাষাবাদে অনীহা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।

কৃষি উৎপাদনের ব্যয় বাড়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো যান্ত্রিকীকরণের সঙ্গে জ্বালানি ব্যয়ের সম্পর্ক। বর্তমানে জমি চাষ থেকে শুরু করে ধান কাটা, মাড়াই ও পরিবহনের বিভিন্ন পর্যায়ে যন্ত্রের ব্যবহার বেড়েছে। এটি কৃষির শ্রমনির্ভরতা কমিয়েছে এবং উৎপাদন প্রক্রিয়াকে দ্রুত করেছে। কিন্তু একই সঙ্গে ডিজেল বা অন্যান্য জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি যন্ত্রনির্ভর কৃষির ব্যয়কেও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

এখানেই একটি বড় নীতিগত প্রশ্ন সামনে আসে—কৃষির আধুনিকায়ন যদি জ্বালানি ব্যয়ের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়, তাহলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্য ওঠানামার প্রতিটি ধাক্কা কি কৃষককেই বহন করতে হবে?

এর উত্তর অবশ্যই নীতিনির্ধারণের জায়গায় খুঁজতে হবে।

 

কারণ কৃষক কেবল একজন উৎপাদক নন; তিনি দেশের খাদ্যব্যবস্থার অন্যতম প্রধান ভিত্তি। কৃষকের উৎপাদন ব্যাহত হলে তার অভিঘাত কেবল কৃষকের ঘরে সীমাবদ্ধ থাকে না। প্রথমে বাড়ে উৎপাদন ব্যয়, এরপর পরিবহন ব্যয়, তারপর পাইকারি ও খুচরা বাজারে তার প্রভাব পড়ে। শেষ পর্যন্ত বাড়তি ব্যয়ের একটি বড় অংশ ভোক্তার ওপর গিয়ে পড়ে। অর্থাৎ কৃষকের উৎপাদন ব্যয় ও ভোক্তার জীবনযাত্রার ব্যয় পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও কৃষক সবসময় সেই অনুপাতে ফসলের দাম পান না। কৃষিপণ্যের বাজারে মধ্যস্বত্বভোগী, সংরক্ষণব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, পরিবহন ব্যয় এবং বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে উৎপাদক ও ভোক্তার মধ্যে দামের যে ব্যবধান তৈরি হয়, তার একটি বড় অংশ কৃষককে বঞ্চিত করে।

এর ফলে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের সামনে ধীরে ধীরে একটি কঠিন বাস্তবতা তৈরি হয়—চাষাবাদ করে লোকসান করার চেয়ে কম জমিতে চাষ করা, কম সেচ লাগে এমন ফসল বেছে নেওয়া কিংবা কৃষির বাইরে অন্য পেশায় চলে যাওয়া তুলনামূলকভাবে নিরাপদ। দীর্ঘমেয়াদে এই প্রবণতা বাড়তে থাকলে কৃষিজমির ব্যবহার, গ্রামীণ কর্মসংস্থান এবং খাদ্য উৎপাদনের ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে।

 

এখানে খাদ্যনিরাপত্তার প্রশ্নটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। খাদ্যনিরাপত্তা শুধু পর্যাপ্ত খাদ্য উৎপাদনের বিষয় নয়; কৃষকের উৎপাদন সক্ষমতা ধরে রাখাও এর অপরিহার্য অংশ। কৃষক যদি ক্রমাগত লোকসানের মুখে পড়েন, তাহলে ভবিষ্যৎ উৎপাদন ধরে রাখা কঠিন হয়ে উঠবে। আর উৎপাদন কমলে আমদানিনির্ভরতা বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। 

আন্তর্জাতিক বাজারে তখন দাম, সরবরাহ ও ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার ঝুঁকিও দেশের খাদ্যবাজারে সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।

তাই জ্বালানি তেলের দাম আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নির্ধারণের প্রয়োজন থাকলেও কৃষিকে সেই বাজারঝুঁকির সম্পূর্ণ ভার বহন করতে দেওয়া যায় না। কৃষি একটি কৌশলগত খাত। এখানে ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিটি সিদ্ধান্তের সঙ্গে খাদ্যনিরাপত্তা ও কৃষকের সক্ষমতার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।

এই পরিস্থিতিতে কয়েকটি পদক্ষেপ বিশেষভাবে বিবেচনা করা যেতে পারে।

 

প্রথমত, কৃষিতে ব্যবহৃত ডিজেলের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক ভর্তুকি বা বিশেষায়িত সহায়তা ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। সাধারণ ভর্তুকির পরিবর্তে প্রকৃত কৃষকের কাছে সুবিধা পৌঁছানোর জন্য কৃষক কার্ড, ডিজিটাল নিবন্ধন বা নির্দিষ্ট বরাদ্দব্যবস্থা ব্যবহার করা যেতে পারে। এতে ভর্তুকির অপচয় কমিয়ে প্রকৃত উৎপাদককে সহায়তা দেওয়া সম্ভব হবে।

দ্বিতীয়ত, সৌরচালিত সেচপাম্প এবং বিদ্যুৎচালিত সেচব্যবস্থা সম্প্রসারণের উদ্যোগ আরও জোরদার করতে হবে। দীর্ঘমেয়াদে ডিজেলনির্ভরতা কমাতে পারলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার প্রভাবও কৃষিতে কমানো সম্ভব হবে। বিশেষ করে যেখানে সৌরসেচ অর্থনৈতিকভাবে কার্যকর, সেখানে সহজ ঋণ, ভর্তুকি ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়া যেতে পারে।

তৃতীয়ত, উৎপাদন ব্যয়ের বাস্তব পরিবর্তন বিবেচনায় নিয়ে সরকারি কৃষিপণ্য সংগ্রহের মূল্য নির্ধারণ করতে হবে। কৃষকের উৎপাদন ব্যয় ও বাজারদরের মধ্যে একটি যৌক্তিক সম্পর্ক তৈরি না হলে শুধু উৎপাদন বাড়ানোর আহ্বান দিয়ে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন।

 

চতুর্থত, কৃষিপণ্য পরিবহনে জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পর্যবেক্ষণ করতে হবে। পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির সুযোগ নিয়ে কোনো পর্যায়ে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি হচ্ছে কি না, তা বাজার তদারকির আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে কৃষকের উৎপাদনস্থল থেকে বাজার পর্যন্ত সরবরাহব্যবস্থা আরও দক্ষ ও কম ব্যয়বহুল করা প্রয়োজন।

পঞ্চমত, প্রান্তিক ও বর্গাচাষিদের জন্য সহজ শর্তে কৃষিঋণ, পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা এবং ফসলবিমার আওতা বাড়ানো দরকার। কারণ বড় কৃষক বাড়তি ব্যয় কিছুটা সামাল দিতে পারলেও ক্ষুদ্র কৃষকের জন্য সামান্য অতিরিক্ত ব্যয়ও বড় আর্থিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

সবশেষে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—কৃষিকে কেবল উৎপাদনের পরিসংখ্যান দিয়ে দেখা যাবে না। কৃষকের আয়, উৎপাদন ব্যয়, বাজারে প্রবেশাধিকার, জ্বালানি ব্যয় এবং ন্যায্য মূল্য—সবকিছুকে একই নীতিকাঠামোর মধ্যে বিবেচনা করতে হবে।

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পেছনে আন্তর্জাতিক বাজারের বাস্তবতা থাকতে পারে। কিন্তু সেই বাস্তবতার অভিঘাত কতটা কৃষকের ওপর পড়বে, সেটি নীতিনির্ধারণের বিষয়। কৃষককে যদি প্রতিবার বাজারের প্রতিকূলতার সঙ্গে একা লড়তে হয়, তাহলে উৎপাদন টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে। আর কৃষকের উৎপাদন সক্ষমতা দুর্বল হলে শেষ পর্যন্ত তার প্রভাব পড়বে প্রতিটি পরিবারের খাদ্যব্যয় এবং দেশের খাদ্যনিরাপত্তায়।

তাই এখন প্রয়োজন শুধু দাম সমন্বয় নয়, কৃষকের সক্ষমতা রক্ষার সমন্বিত নীতি। কারণ কৃষকের উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখা মানে শুধু একজন কৃষককে রক্ষা করা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে গ্রামীণ অর্থনীতি, খাদ্য সরবরাহ এবং কোটি মানুষের জীবনযাত্রার স্থিতিশীলতা।

লেখক: মোহাম্মদ হাসান, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

যোগাযোগের ঠিকানা:

বাংলাদেশ বার্তা টুডে

৫৬, চানখারপুল লেন, নাজিমুদ্দিন রোড, বংশাল, ঢাকা-১১০০

ইমেইল: info@bangladeshbartatoday.com