ইতালির স্বপ্নে লিবিয়ায় বন্দি: ৩৯ লাখ টাকা খুইয়ে নিঃস্ব সাইদুলের পরিবার
বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৩৬ পিএম
নাজমুল হাসান, মাদারীপুরঃ
ঘরের দরজা খুললেই হয়তো ছেলে ফিরে আসবে এই আশায় প্রতিদিন দরজার দিকে তাকিয়ে থাকেন সূর্যবান বেগম। কখনো দরজার চৌকাঠ ধরে দাঁড়িয়ে থাকেন, কখনো পাশে বসে কাঁদেন। আবার কখনো নীরবে চোখের পানি মুছে মনে মনে প্রশ্ন করেন, ‘আমার ছেলে কোথায়? কেমন আছে? খেয়েছে তো?’
দুই মাস ধরে এমন অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে মাদারীপুর সদর উপজেলার কেন্দুয়া ইউনিয়নের ঘটকচর দত্তের হাট এলাকার সূর্যবান বেগমের। ইতালি যাওয়ার স্বপ্ন নিয়ে বিদেশে পাড়ি দেওয়া তাঁর ছেলে সাইদুল বেপারী (৩২) এখন লিবিয়ায় নিখোঁজ।
তাঁর কোনো সন্ধান না পাওয়ায় উৎকণ্ঠায় দিন কাটছে পুরো পরিবারের।
সরেজমিনে ওই এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, সাইদুলের ফেরার অপেক্ষায় পুরো পরিবার। শুধু মা নন, স্বামী ও বাবার অপেক্ষায় রয়েছেন সাইদুলের স্ত্রী, দুই সন্তান ও স্বজনরা।
সাইদুলের মা সূর্যবান বেগম জানান, ছেলেকে বিদেশে পাঠাতে পরিবারের জমিজমা বিক্রি করা হয়েছে।
পাশাপাশি ধারদেনা ও সুদের ওপরও টাকা নেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রায় ৩৯ লাখ টাকা খরচ হলেও ছেলের কোনো সন্ধান মিলছে না।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আমার ছেলে কোথায় আছে, কেমন আছে, কিছুই জানি না। প্রতিদিন দরজার দিকে তাকিয়ে থাকি।
মনে হয়, এই বুঝি আমার ছেলে এসে ডাকবে। আমি আমার ছেলেকে বুকের মধ্যে ফিরে পেতে চাই। ’
বাবার ফেরার অপেক্ষায় রয়েছে সাইদুলের চার বছরের মেয়ে ও ১১ মাস বয়সী ছেলে। চার বছরের মেয়েটি বাবার সঙ্গে কথা বলবে বলে মায়ের হাতে মোবাইল তুলে দেয়। কিন্তু ফোনের ওপাশ থেকে কোনো কণ্ঠ ভেসে আসে না।
বাবার কথা মনে পড়লেই কেঁদে ওঠে শিশুটি। আর ছোট ছেলেটি বুঝতেই পারে না, কেন তার বাবা নেই।
কোলে ছোট সন্তানকে নিয়ে স্বামীর ফেরার অপেক্ষায় রয়েছেন মেরি আক্তার। দুই সন্তানকে কীভাবে বড় করবেন এবং সংসারের খরচ কীভাবে চালাবেন—এসব চিন্তায় তাঁর প্রতিটি দিন কাটছে দুশ্চিন্তায়।
মেরি আক্তার বলেন, ‘আমার মেয়েটা প্রতিদিন আব্বুর সঙ্গে কথা বলতে চায়। মোবাইল সামনে এনে বলে, আব্বুর সঙ্গে কথা বলবে। কিন্তু আব্বু তো আর ফোনের ওপাশে নেই। আমি কীভাবে সন্তানদের মানুষ করব, বুঝতে পারি না। ’
স্বজন জলিল বেপারিসহ কয়েকজন জানান, সাইদুল বিদেশে যাওয়ার পর থেকেই পরিবারটি চরম আর্থিক সংকটে পড়েছে। পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি নিখোঁজ থাকায় প্রতিদিনের খাবার জোগাড় করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। স্থানীয়রা নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী পরিবারটিকে সহযোগিতা করছেন।
সাইদুলের ভাই মাহিদুল বেপারীর অভিযোগ, ইতালি পাঠানোর কথা বলে দালালচক্র তাঁর ভাইকে লিবিয়ায় নিয়ে গেছে। পরে সেখানে একটি চক্রের কাছে তাঁকে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, ভাইকে ফেরত পাওয়ার আশায় পরিবারের জমি-জায়গা ও ঘরবাড়ি বিক্রি করে প্রায় ৩৯ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। এখন পরিবারের থাকার মতোও তেমন কিছু নেই। তিনি এ ঘটনায় জড়িতদের বিচার এবং ভাইয়ের সন্ধান দাবি করেন।
স্থানীয় বাসিন্দা রুমিচা বেগম বলেন, সাইদুলের পরিবার কখনো স্থানীয়দের সহায়তায় খাবার জোগাড় করতে পারে, আবার সহায়তা না মিললে শিশুদের নিয়ে অনাহারে থাকতে হয়। তাঁর দাবি, সরকার যেন পরিবারটির পাশে দাঁড়ায় এবং সাইদুলের সন্ধানে উদ্যোগ নেয়।
আরেক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, ‘ওদের যা ছিল, অনেক কিছুই বিক্রি করে টাকা দেওয়া হয়েছে। এখন সম্পদও নেই, ছেলেটাও নেই। আমরা দিন এনে দিন খাই, তারপরও যতটুকু পারি পরিবারটিকে সহযোগিতা করি। আমরা চাই, সাইদুল কোথায় আছে, কী অবস্থায় আছে—তা দ্রুত জানা যাক। ’
পরিবারের অভিযোগ, ঘটকচর এলাকার মৃত বাদশা ফরাজীর ছেলে আনোয়ার ফরাজী ২৩ লাখ টাকার বিনিময়ে সাইদুলকে ইতালি পাঠানোর প্রলোভন দেখান। চুক্তি অনুযায়ী ২০২৫ সালের ৬ মে অগ্রিম ১২ লাখ টাকা নেওয়া হয়। পরে একই বছরের ৯ জুন শ্রীলঙ্কা ও দুবাই হয়ে ইতালির উদ্দেশ্যে সাইদুলকে নেওয়া হলেও তাঁকে লিবিয়ায় পাঠানো হয় বলে অভিযোগ পরিবারের।
স্বজনদের দাবি, লিবিয়ায় নেওয়ার পর সাইদুলকে একটি স্থানীয় চক্রের কাছে জিম্মি করা হয়। তাঁকে নির্যাতনের ভয় দেখিয়ে ব্যাংক অ্যাকাউন্টসহ বিভিন্ন মাধ্যমে ধাপে ধাপে পরিবারের কাছ থেকে আরও টাকা নেওয়া হয়। সব মিলিয়ে প্রায় ৩৯ লাখ টাকা দেওয়ার পরও গত দুই মাস ধরে সাইদুলের সঙ্গে পরিবারের কোনো যোগাযোগ নেই।
স্থানীয়ভাবে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করেও কোনো ফল না পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত আইনের আশ্রয় নেয় পরিবার। সাইদুলের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ থাকার ঘটনায় গত ১১ সেপ্টেম্বর তাঁর বড় ভাই সামাদ হোসেন বাদী হয়ে আনোয়ার ফরাজী, শিল্পী আক্তার, বাদল জমাদ্দার, সাহেব আলী জমাদ্দার, মামুন বেপারী, ইভা বেগম ও ছলে বেগমসহ সাতজনের বিরুদ্ধে ‘মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান অপরাধ প্রতিরোধ ও দমন ট্রাইব্যুনাল, মাদারীপুরে’ মামলা করেন।
তবে টাকা নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অভিযুক্ত আনোয়ার হোসেন ওরফে আনু। তিনি বলেন, ‘আমি তাদের কাছ থেকে টাকা-পয়সা নেইনি। ’ অভিযুক্ত আনোয়ারের স্ত্রী শিল্পী আক্তারও পরিবারের দাবি করা টাকার পরিমাণ নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন। তার দাবি, ‘তাদের কাছ থেকে ১৯ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে। ’
মাদারীপুর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল কালাম আজাদ বলেন, সাইদুল নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় পরিবার আদালতে মামলা করেছে বলে তাঁরা জানতে পেরেছেন। আদালতের নির্দেশনা থানায় পৌঁছালে বিষয়টি নিয়মিত মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করা হবে। এরপর জড়িতদের আইনের আওতায় আনার ব্যবস্থা নেওয়া হবে।