নতুন সাত-গোষ্ঠীর জোট, একাধিক ফ্রন্টে লড়াই ও বিমানবন্দর দখলের খবরে উত্তর ইথিওপিয়ায় বাড়ছে উদ্বেগ

ইথিওপিয়ায় আবারও যুদ্ধের আশঙ্কা: টাইগ্রে থেকে আমহারা–আফার, ছড়িয়ে পড়ছে সংঘাত

বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক

প্রকাশ: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:০৬ এএম

বিশেষ প্রতিনিধিঃ সঞ্জয় মজুমদার

ইথিওপিয়ার উত্তরাঞ্চলে নতুন করে সংঘাত তীব্র হয়েছে। ২৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত টাইগ্রে, আমহারা ও আফার অঞ্চলের একাধিক এলাকায় সরকারি বাহিনী, টাইগ্রে-সংশ্লিষ্ট বাহিনী এবং বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে। সংঘাত পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ACLED জানিয়েছে, টাইগ্রে–আফার সীমান্ত ও আমহারার ওয়াগ হেমরা এবং নর্থ ওয়েলো এলাকায় লড়াই অব্যাহত ছিল। 

সংঘাতের মাত্রা বাড়ার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলোর একটি হলো মেকেলে, আকসুম ও শিরে বিমানবন্দরের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার দাবি। ACLED-এর স্থানীয় সূত্রগুলো ২৩ সেপ্টেম্বর এসব বিমানবন্দরের নিয়ন্ত্রণ টাইগ্রে ডিফেন্স ফোর্সেস (TDF) নেওয়ার কথা জানিয়েছে। এর পর ইথিওপিয়ান এয়ারলাইনস মেকেলে, আকসুম ও শিরেগামী ফ্লাইট সাময়িকভাবে স্থগিত করে। 

তবে সংঘাতের দায় নিয়ে পক্ষগুলোর বক্তব্য পরস্পরবিরোধী। টাইগ্রে-সংশ্লিষ্ট পক্ষের অভিযোগ, কেন্দ্রীয় সরকার তাদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করেছে। অন্যদিকে ইথিওপিয়ার কেন্দ্রীয় সরকার-সমর্থিত বক্তব্যে টাইগ্রে বাহিনীর হামলার কথা বলা হয়েছে। ফলে কোন পক্ষ প্রথম আক্রমণ শুরু করেছে—এটি স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা কঠিন। আল জাজিরাও জানিয়েছে, সংঘর্ষ দ্রুত টাইগ্রে থেকে প্রতিবেশী আফার ও আমহারায় ছড়িয়ে পড়ে। 

নতুন সংঘাতের রাজনৈতিক পটভূমিতেও বড় পরিবর্তন এসেছে। ২০ সেপ্টেম্বর Ethiopian Peoples’ Forces Alliance for Survival নামে সাতটি সশস্ত্র ও রাজনৈতিক গোষ্ঠী একটি জোট গঠনের ঘোষণা দেয়। এতে TPLF, Amhara Fano National Movement, Oromo Liberation Army এবং আরও কয়েকটি আঞ্চলিক সংগঠন রয়েছে। তাদের ঘোষিত লক্ষ্য প্রধানমন্ত্রী আবiy আহমেদের সরকারকে অপসারণ করা। 

এই জোটের গুরুত্ব শুধু সদস্যসংখ্যায় নয়, বরং এর মধ্যে আগে পরস্পরের বিরোধী থাকা গোষ্ঠীগুলোর উপস্থিতিতে। TPLF এবং আমহারা ফানো একসময় ইথিওপিয়ার ২০২০–২০২২ সালের যুদ্ধের ভিন্ন পক্ষ ছিল। Reuters-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন জোটটি কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা কেন্দ্রীকরণ ও আঞ্চলিক বৈষম্যের অভিযোগের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে; তবে সদস্যদের মধ্যে রাজনৈতিক ও আঞ্চলিক মতপার্থক্য এখনও রয়েছে। 

ACLED-এর পূর্ব আফ্রিকা বিষয়ক বিশ্লেষক ড. জালালে গেটাচেউ বিররু সতর্ক করেছেন যে জোটটি সফলভাবে সরকার উৎখাত করতে পারবে কি না, তা স্পষ্ট নয়। তাঁর মতে, সদস্যদের মধ্যে মতাদর্শগত পার্থক্য এবং অতীতের বৈরিতা রয়েছে; ফলে দীর্ঘমেয়াদে এই জোটের অভ্যন্তরীণ ঐক্যও একটি বড় প্রশ্ন। একই সঙ্গে তিনি একাধিক অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী উচ্চমাত্রার সহিংসতার ঝুঁকির কথা উল্লেখ করেছেন। 

মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতিও দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। ACLED ২৪ সেপ্টেম্বর টেকেজে নদীর কাছে পশ্চিম টাইগ্রেতে নতুন একটি সংঘাতের ফ্রন্ট খোলার খবর দিয়েছে। একই সময়ে আমহারার গাজগিবেলা, গিদান, লাস্তা ও রায়া কোবো এলাকায় সরকারি ও আঞ্চলিক বাহিনীর সঙ্গে Fano ও TDF-এর সংঘর্ষের তথ্য পাওয়া গেছে। আফারের ইয়ালো এলাকাতেও পরবর্তী সময়ে লড়াইয়ের খবর নথিভুক্ত হয়েছে। 

সংঘাতের আরেকটি গুরুতর দিক হলো বেসামরিক জনগণের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব। ACLED জানিয়েছে, ২২ সেপ্টেম্বর দক্ষিণ টাইগ্রের আলামাতা এলাকায় একাধিক ড্রোন হামলার খবর পাওয়া যায় এবং কয়েকটি স্কুল ও একটি হাসপাতাল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তথ্যও এসেছে; হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হয়নি। একই সঙ্গে উত্তরাঞ্চলে যোগাযোগব্যবস্থা বিঘ্নিত হওয়ায় ঘটনাস্থলের তথ্য যাচাই আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। 

হতাহতের সংখ্যা নিয়েও সতর্কতা জরুরি। ইথিওপিয়ার কেন্দ্রীয় বাহিনী নর্থ ওয়েলোতে ২৭২ জন TPLF যোদ্ধা নিহত এবং ২৬০ জন আহত হওয়ার দাবি করেছে বলে ACLED জানিয়েছে। কিন্তু সংস্থাটি স্পষ্ট করেছে, এসব সংখ্যা স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি। ফলে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে আসা হতাহতের পরিসংখ্যানকে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে উপস্থাপন করা যাচ্ছে না। 

আন্তর্জাতিক পর্যায়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। জাতিসংঘ মহাসচিব উত্তর ইথিওপিয়ায় বিমানবন্দর দখল এবং টাইগ্রের বাইরে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বলে ACLED-এর আন্তর্জাতিক সারসংক্ষেপে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সময়ে জাতিসংঘ ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন সংযম এবং আফ্রিকান ইউনিয়নের নেতৃত্বাধীন প্রক্রিয়ায় ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। 

এই পরিস্থিতির তাৎক্ষণিক প্রভাব শুধু সামরিক সংঘর্ষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বিমান চলাচল বন্ধ, যোগাযোগব্যবস্থার বিঘ্ন এবং নিরাপত্তাহীনতা উত্তর ইথিওপিয়ায় মানুষের চলাচল, চিকিৎসা, বাণিজ্য ও মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। সংঘাত যদি আরও বিস্তৃত হয়, তবে টাইগ্রে–আমহারা–আফার সীমান্তের বাইরে বৃহত্তর Horn of Africa অঞ্চলেও এর নিরাপত্তাগত প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখন—২০২২ সালের শান্তিচুক্তির পর যে সংঘাত থেমেছিল, সেটি কি আবার পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে রূপ নেবে, নাকি রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে নতুন করে উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে? বর্তমানে একাধিক ফ্রন্টে সংঘর্ষ, নতুন রাজনৈতিক-সামরিক জোট এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা পরিস্থিতিকে অত্যন্ত অনিশ্চিত করে তুলেছে। তবে বিমানবন্দর নিয়ন্ত্রণ, হতাহতের সংখ্যা কিংবা কোনো নির্দিষ্ট হামলার দায় সম্পর্কে মাঠপর্যায়ের দাবিগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই না হওয়া পর্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে দেখা জরুরি। 

উত্তর ইথিওপিয়ায় তাই এখন মূল প্রশ্ন শুধু কোথায় সংঘর্ষ হচ্ছে তা নয়—সংঘাতের পরিধি কতদূর বিস্তৃত হবে এবং বেসামরিক জনগণের নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করা যাবে, সেটিই হয়ে উঠছে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ।

যোগাযোগের ঠিকানা:

বাংলাদেশ বার্তা টুডে

৫৬, চানখারপুল লেন, নাজিমুদ্দিন রোড, বংশাল, ঢাকা-১১০০

ইমেইল: info@bangladeshbartatoday.com