কাতারের মধ্যস্থতায় পৃথক আলোচনা, ইরানের সাত দিনের প্রস্তাব ঘিরে নতুন তৎপরতা; যুদ্ধবিরতি, হরমুজ ও পরমাণু ইস্যুতে সমঝোতার সম্ভাবনা নিয়ে বাড়ছে কূটনৈতিক চাপ

ইরান–যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের মাঝে কূটনীতির নতুন দরজা: হরমুজ খুলতে কি এবার সমঝোতার পথে তেহরান–ওয়াশিংটন?

বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক

প্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:০২ এএম

বিশেষ প্রতিনিধিঃ সঞ্জয় মজুমদার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে ইরান–যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত থামাতে নতুন করে কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়েছে। ২৮ সেপ্টেম্বরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, কাতারের মধ্যস্থতাকারীরা নিউইয়র্কে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচির সঙ্গে এবং পৃথকভাবে মার্কিন পক্ষের সঙ্গে সোমবার বা মঙ্গলবার আলোচনা করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। আলোচনায় ইরানের গত সপ্তাহে দেওয়া সাত দিনের প্রস্তাবের সংশোধিত সংস্করণ গুরুত্ব পাচ্ছে।

ইরানের প্রস্তাবের মূল বিষয়গুলোর একটি হলো হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করা এবং এর সঙ্গে সংঘাত বন্ধ ও পরবর্তী আলোচনার একটি কাঠামো তৈরি করা। তেহরান এর আগে জানিয়েছিল, মার্কিন সামরিক চাপ কমানো এবং ইরানি বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ প্রত্যাহারের মতো শর্ত পূরণ হলে এক সপ্তাহের মধ্যে হরমুজ পুনরায় খুলতে প্রস্তুত তারা।

তবে কূটনৈতিক উদ্যোগের পথটি এখনো অনিশ্চিত। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সাত দিনের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার কথা জানিয়েছেন। একই সময়ে নতুন করে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে আলোচনা চালানোর উদ্যোগ সামনে এসেছে। ফলে প্রকাশ্য রাজনৈতিক অবস্থান এবং পর্দার আড়ালের কূটনৈতিক যোগাযোগ—দুইটি প্রক্রিয়া পাশাপাশি চলছে।

এই পরিস্থিতিতে কাতারের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দোহা আগে থেকেই ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদানের একটি মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করেছে। এবার নিউইয়র্কে পৃথক বৈঠকের মাধ্যমে দুই পক্ষের অবস্থানের ব্যবধান কমানোর চেষ্টা চলছে। Reuters-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন আলোচনার কেন্দ্র হতে পারে ইরানের সংশোধিত সাত দিনের প্রস্তাব।

হরমুজ প্রণালিই এই কূটনৈতিক প্রচেষ্টার অন্যতম প্রধান কারণ। পারস্য উপসাগর থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি পরিবহনের জন্য এই সমুদ্রপথের গুরুত্ব অনেক। সংঘাতের কারণে এর চলাচল নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। ২৮ সেপ্টেম্বর Reuters জানিয়েছে, সম্ভাব্য কূটনৈতিক আলোচনার খবরে তেলের দাম দিনের সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে কিছুটা কমেছে। এর আগে ইরানের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের খবরে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৪ ডলারের বেশি বেড়েছিল।

এর অর্থ হলো, হরমুজ নিয়ে সামরিক বা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রভাব সরাসরি আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে পড়ছে। দীর্ঘ সময় ধরে নৌপথটি অনিশ্চিত থাকলে জ্বালানি পরিবহন, পণ্য পরিবহন ব্যয় এবং আমদানিনির্ভর দেশগুলোর অর্থনীতিতে চাপ বাড়তে পারে। বিপরীতে নিরাপদ নৌচলাচল পুনরায় শুরু হলে বাজারে অনিশ্চয়তা কিছুটা কমার সুযোগ তৈরি হবে।

তবে হরমুজ পুনরায় খোলা একাই সংকটের সমাধান নয়। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পরমাণু কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা, সামরিক চাপ এবং যুদ্ধবিরতির শর্ত নিয়েও বড় ধরনের মতপার্থক্য রয়েছে। ইরানের প্রস্তাবের সঙ্গে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা, তেল রপ্তানি এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক বিষয় যুক্ত রয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

অন্যদিকে ওয়াশিংটনের অবস্থানে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ। ফলে হরমুজ খুলে দেওয়ার বিনিময়ে কী ধরনের রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক ছাড় দেওয়া হবে, সেটিই আলোচনার অন্যতম কঠিন প্রশ্ন হয়ে উঠতে পারে।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন এই আলোচনার জন্য আলাদা কূটনৈতিক পরিবেশ তৈরি করেছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিউইয়র্কে অবস্থান করছেন এবং কাতারের মধ্যস্থতাকারীরা সেখানেই তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। একই সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরাও জাতিসংঘে উপস্থিত। ফলে আনুষ্ঠানিক বৈঠকের বাইরে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগের সুযোগও তৈরি হয়েছে।

সংকটের আরেকটি দিক হলো আঞ্চলিক নিরাপত্তা। হরমুজের পাশাপাশি ইয়েমেন ও বাব আল-মন্দাব ঘিরে উত্তেজনাও মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি ও বাণিজ্যপথকে প্রভাবিত করছে। ফলে ইরান–যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতা হলে তার প্রভাব শুধু দুই দেশের সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; উপসাগরীয় দেশ, জ্বালানি বাজার এবং আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্যের ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে।

২৯ সেপ্টেম্বরের দিকে তাকিয়ে তাই মূল প্রশ্ন কোনো চূড়ান্ত চুক্তি হয়েছে কি না, তা নয়। বরং প্রশ্ন হলো—প্রত্যাখ্যাত সাত দিনের প্রস্তাবকে সংশোধিত কাঠামোয় এনে কাতারের মধ্যস্থতায় দুই পক্ষ কি আলোচনার একটি গ্রহণযোগ্য ভিত্তি তৈরি করতে পারে?

বর্তমান তথ্য অনুযায়ী, সেই উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি। তবে আলোচনা আবার শুরু করার উদ্যোগ অন্তত এটুকু দেখাচ্ছে যে কূটনৈতিক যোগাযোগের পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। হরমুজ পুনরায় চালু, যুদ্ধবিরতি এবং পরমাণু ইস্যু যদি একই আলোচনার কাঠামোয় আনা যায়, তাহলে পরবর্তী ধাপে একটি বৃহত্তর সমঝোতার আলোচনা শুরু হতে পারে। আর যদি শর্তগুলোতে সমাধান না আসে, তাহলে হরমুজকে ঘিরে অনিশ্চয়তা আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার ওপর আরও চাপ তৈরি করতে পারে।

২৮ সেপ্টেম্বর রাত পর্যন্ত সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য হলো—কাতারের মধ্যস্থতায় নতুন আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে, কিন্তু ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কোনো চূড়ান্ত সমঝোতা এখনো হয়নি। আগামী ২৪ ঘণ্টায় নিউইয়র্কের কূটনৈতিক যোগাযোগ তাই মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের পাশাপাশি বিশ্ব জ্বালানি বাজার ও আন্তর্জাতিক কূটনীতির জন্যও নজরদারির গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে থাকছে।

যোগাযোগের ঠিকানা:

বাংলাদেশ বার্তা টুডে

৫৬, চানখারপুল লেন, নাজিমুদ্দিন রোড, বংশাল, ঢাকা-১১০০

ইমেইল: info@bangladeshbartatoday.com