তিগ্রাই সংঘাত ছড়িয়ে পড়ছে আমহারা ও আফারেও; ইথিওপিয়ার সেনাপ্রধানের অভিযোগের জবাবে সুদানের অস্বীকৃতি, আঞ্চলিক যুদ্ধের আশঙ্কা বাড়ছে

উত্তর ইথিওপিয়ায় ফের যুদ্ধ: আলামাতা দখলের দাবি, বিদেশি হস্তক্ষেপ নিয়ে নতুন অভিযোগ

বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক

প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:৩৫ পিএম

বিশেষ প্রতিনিধিঃ সঞ্জয় মজুমদার।

ইথিওপিয়ার উত্তরাঞ্চলে তিগ্রাই বাহিনী ও কেন্দ্রীয় সরকারের মধ্যে নতুন করে শুরু হওয়া সংঘাত ২৮ সেপ্টেম্বর আরও তীব্র হয়েছে। সর্বশেষ প্রতিবেদনে ইথিওপিয়ার সরকারি বাহিনী ও তাদের মিত্র মিলিশিয়ারা তিগ্রাইয়ের দক্ষিণে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ আলামাতা শহর দখল করেছে বলে দাবি করেছে; দুটি কূটনৈতিক সূত্রও শহরটির পতনের কথা জানিয়েছে, যদিও রয়টার্স জানিয়েছে যে বাহিনী শহরটির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে কি না তা তাৎক্ষণিকভাবে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি। 

গত ২৩ সেপ্টেম্বর থেকে তিগ্রাইয়ে বড় ধরনের সংঘর্ষ শুরু হয়। TPLF-নেতৃত্বাধীন তিগ্রাই বাহিনী মেকেলে, আকসুম ও শিরে বিমানবন্দরের নিয়ন্ত্রণ নেয় বলে আফ্রিকান ইউনিয়ন জানিয়েছে। একই সময়ে সংঘর্ষ তিগ্রাইয়ের বাইরে আমহারা ও আফার অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ে। ২০২২ সালের নভেম্বরে স্বাক্ষরিত প্রিটোরিয়া শান্তিচুক্তির পর কয়েক বছর তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকার পর এই সামরিক উত্তেজনা আবার উত্তর ইথিওপিয়াকে বড় সংঘাতের দিকে ঠেলে দিয়েছে। 

সংঘাতের কারণ নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। ইথিওপিয়ার সরকার বলছে, TPLF নতুন করে আক্রমণ শুরু করেছে। তিগ্রাই নেতৃত্বের দাবি, ফেডারেল সরকারের সামরিক চাপ ও হামলার জবাবেই তাদের বাহিনী প্রতিরক্ষামূলক যুদ্ধ শুরু করেছে। TPLF-এর ভাইস প্রেসিডেন্ট আমানুয়েল আসেফা AFP-কে বলেছেন, তারা এখন “পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের” পরিস্থিতিতে রয়েছে। তবে সংঘর্ষের সামরিক ক্ষয়ক্ষতি ও বিভিন্ন এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রকাশ্য তথ্যের বড় অংশই পক্ষগুলোর দাবি-নির্ভর এবং স্বাধীনভাবে যাচাই করা কঠিন। 

নতুন সংঘাতের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে একটি বড় রাজনৈতিক সমীকরণ। ২০ সেপ্টেম্বর TPLF-সহ সাতটি সশস্ত্র ও রাজনৈতিক গোষ্ঠী Ethiopian Peoples’ Forces Alliance for Survival নামে জোট গঠনের ঘোষণা দেয়। এতে TPLF, Amhara Fano National Movement, Oromo Liberation Army, Afar Revolutionary Democratic Unity Frontসহ কয়েকটি সংগঠন রয়েছে। জোটটির ঘোষিত উদ্দেশ্য হলো প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদের সরকারকে সরিয়ে একটি অন্তর্বর্তী প্রশাসন প্রতিষ্ঠা করা। 

এই জোট গঠনের পর সংঘাতের ভৌগোলিক পরিধিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আফারে সামরিক তৎপরতা ইথিওপিয়ার প্রধান বাণিজ্যিক সরবরাহপথের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে, কারণ দেশটির আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বড় অংশ জিবুতির বন্দরনির্ভর। সংঘাতের কারণে এই সরবরাহপথে বিঘ্ন তৈরি হলে জ্বালানি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্য পরিবহনেও চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। 

এদিকে বিদেশি হস্তক্ষেপ নিয়ে ইথিওপিয়ার অভিযোগ আরও বিস্তৃত হয়েছে। ইথিওপিয়ার সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল বিরহানু জুলা ২৭ সেপ্টেম্বর অভিযোগ করেন, ইরিত্রিয়া, সুদান ও মিশর সরকারবিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সহায়তা করছে। তিনি ইরিত্রিয়াকে বিদেশি সমর্থন ও ইথিওপিয়ার সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে একটি সংযোগ হিসেবে উল্লেখ করেন। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে তিনি প্রকাশ্যে প্রমাণ দেননি। মিশর ও ইরিত্রিয়ার পক্ষ থেকে এ অভিযোগের বিষয়ে ভিন্ন অবস্থান রয়েছে, আর সুদানের সেনাবাহিনী অভিযোগকে সরাসরি “ভিত্তিহীন” বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। 

সুদানের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দেশটি নিজেই দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে রয়েছে। ইথিওপিয়া ও সুদানের মধ্যে সীমান্ত নিরাপত্তা, বিদ্রোহী গোষ্ঠী এবং নীল নদের পানি নিয়ে আগে থেকেই একাধিক বিরোধ রয়েছে। ফলে তিগ্রাইয়ের যুদ্ধ যদি সীমান্তের ওপারের রাজনৈতিক ও সামরিক সমীকরণের সঙ্গে যুক্ত হয়, তাহলে উত্তর-পূর্ব আফ্রিকার নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। তবে বর্তমানে এসব সম্ভাবনার সবগুলোকে নিশ্চিত সামরিক সম্পৃক্ততা হিসেবে দেখা যাচ্ছে না। 

ইরিত্রিয়ার বিষয়টি আরও সংবেদনশীল। ২০২০–২০২২ সালের তিগ্রাই যুদ্ধে ইরিত্রিয়ার বাহিনী ইথিওপিয়ার ফেডারেল সরকারের পাশে লড়েছিল। পরবর্তীতে আদ্দিস আবাবা ও আসমারার সম্পর্ক খারাপ হয়। বর্তমান সংঘাতে ইথিওপিয়া ইরিত্রিয়ার বিরুদ্ধে তিগ্রাই-সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীগুলোকে সহায়তার অভিযোগ তুলছে। বিশ্লেষকদের মধ্যে এ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে, কিন্তু ইরিত্রিয়ার প্রত্যক্ষ সামরিক সম্পৃক্ততার বিষয়ে প্রকাশ্য প্রমাণ সীমিত। 

মানবিক পরিস্থিতিও দ্রুত উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে। নতুন সংঘাতের মধ্যে আফার অঞ্চলে অন্তত ১ লাখ ৫০ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে বলে স্থানীয় একটি মানবিক সূত্রের হিসাব উদ্ধৃত করে Addis Standard জানিয়েছে। একই সময়ে তিগ্রাই ও উত্তরাঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটেছে, যার ফলে হতাহত, বাস্তুচ্যুতি ও মানবিক প্রয়োজনের নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ কঠিন হয়ে পড়েছে। 

আফ্রিকান ইউনিয়ন ইতোমধ্যে সংঘাত বন্ধ করে সরাসরি আলোচনায় ফেরার আহ্বান জানিয়েছে। AU কমিশনের চেয়ারম্যান মাহমুদ আলী ইউসুফ বলেছেন, ২০২২ সালের প্রিটোরিয়া চুক্তিই শান্তির ভিত্তি এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর উচিত এমন কোনো পদক্ষেপ না নেওয়া যা সংঘাত আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। তিনি হর্ন অব আফ্রিকার জন্য AU-এর উচ্চ প্রতিনিধি ও নাইজেরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট ওলুসেগুন ওবাসাঞ্জোকে জরুরি কূটনৈতিক উদ্যোগে যুক্ত করার কথাও জানিয়েছেন। 

২৮ সেপ্টেম্বরের পরিস্থিতিতে তাই উত্তর ইথিওপিয়ার যুদ্ধ এখন কেবল তিগ্রাইয়ের অভ্যন্তরীণ সংঘাত হিসেবে সীমাবদ্ধ আছে কি না, সেটিই বড় প্রশ্ন। আলামাতার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সরকারি বাহিনীর দাবি, আফার ও আমহারায় লড়াই, নতুন সশস্ত্র জোট এবং ইরিত্রিয়া–সুদান–মিশরকে ঘিরে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। তবে কোন পক্ষ শেষ পর্যন্ত কতটা ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণ করছে এবং বিদেশি রাষ্ট্রগুলো সরাসরি কতটা জড়িত, সে বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য এখনো সীমিত।

যোগাযোগের ঠিকানা:

বাংলাদেশ বার্তা টুডে

৫৬, চানখারপুল লেন, নাজিমুদ্দিন রোড, বংশাল, ঢাকা-১১০০

ইমেইল: info@bangladeshbartatoday.com