খাদ্য সংকটের নতুন বাস্তবতা: কৃষক, পুষ্টি ও নিরাপদ খাদ্যের প্রশ্ন

বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক

প্রকাশ: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৫১ এএম

একটি দেশের উন্নয়নের সবচেয়ে মৌলিক সূচকগুলোর একটি হলো—সেই দেশের মানুষ নিয়মিত, পর্যাপ্ত, নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাবার পাচ্ছে কি না। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, অবকাঠামো নির্মাণ কিংবা প্রযুক্তিগত অগ্রগতি যতই দৃশ্যমান হোক, মানুষের খাবারের নিশ্চয়তা যদি অনিশ্চিত হয়ে পড়ে, তবে উন্নয়নের ভিত নিয়েই প্রশ্ন ওঠে। বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় খাদ্যনিরাপত্তা তাই কেবল কৃষি মন্ত্রণালয় কিংবা খাদ্য মন্ত্রণালয়ের বিষয় নয়; এটি অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য, কৃষি, বাজারব্যবস্থা, সামাজিক সুরক্ষা এবং রাষ্ট্রীয় নীতির সমন্বিত প্রশ্ন।

সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক খাদ্যনিরাপত্তা বিশ্লেষণ সেই উদ্বেগকেই সামনে এনেছে। ইন্টিগ্রেটেড ফুড সিকিউরিটি ফেজ ক্লাসিফিকেশন—আইপিসির সর্বশেষ বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মে থেকে আগস্ট সময়ে বাংলাদেশে প্রায় ১ কোটি ৫৩ লাখ মানুষ, অর্থাৎ বিশ্লেষণভুক্ত জনসংখ্যার প্রায় ১৫ শতাংশ, তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার মধ্যে ছিল। এর মধ্যে প্রায় ৪ লাখ ৮৩ হাজার মানুষ ছিল জরুরি পর্যায়ে বা IPC Phase 4-এ। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর ২০২৬ সময়ে পরিস্থিতি কিছুটা অবনতির আশঙ্কা করা হয়েছে; সে সময়ে তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীন মানুষের সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৮১ লাখে এবং জরুরি পর্যায়ের মানুষের সংখ্যা প্রায় ৭ লাখ ৮৭ হাজারে পৌঁছাতে পারে।

এই পরিসংখ্যানকে কেবল একটি সংখ্যা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। প্রতিটি সংখ্যার পেছনে আছে একটি পরিবার, একটি শিশু, একজন কৃষক, একজন শ্রমজীবী মানুষ কিংবা একজন মা—যিনি হয়তো খাবারের পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছেন, পুষ্টিকর খাবার বাদ দিয়েছেন অথবা পরিবারের অন্য সদস্যদের জন্য নিজের খাবারের অংশ কমিয়েছেন।

 

খাদ্য আছে, কিন্তু সবার নাগালে কি?

বাংলাদেশ খাদ্য উৎপাদনে গত কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। ধান, মাছ, মাংস ও বিভিন্ন কৃষিপণ্যের উৎপাদন বেড়েছে। কিন্তু খাদ্যনিরাপত্তার অর্থ কেবল বাজারে খাদ্য থাকা নয়। মানুষের কাছে সেই খাদ্য কেনার সামর্থ্য থাকতে হবে, খাদ্য হতে হবে নিরাপদ ও পুষ্টিকর এবং সংকটের সময়েও সরবরাহব্যবস্থা স্থিতিশীল থাকতে হবে।

খাদ্যনিরাপত্তার এই চারটি মৌলিক স্তম্ভ হলো—লভ্যতা, প্রবেশগম্যতা, ব্যবহারযোগ্যতা এবং স্থিতিশীলতা। অর্থাৎ খাদ্য উৎপাদন ও সরবরাহ থাকতে হবে; মানুষের সেই খাদ্য কেনার বা পাওয়ার সামর্থ্য থাকতে হবে; খাদ্য হতে হবে নিরাপদ ও পুষ্টিসমৃদ্ধ; এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বাজারের অস্থিরতা কিংবা অর্থনৈতিক সংকটের সময়েও খাদ্যের ধারাবাহিকতা বজায় থাকতে হবে।

বাংলাদেশের বর্তমান সংকট মূলত এই চারটি স্তম্ভের আন্তঃসম্পর্কের জায়গাতেই। একদিকে খাদ্য উৎপাদন চলছে, অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি নিম্ন ও মধ্যআয়ের পরিবারের ক্রয়ক্ষমতায় চাপ তৈরি করছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ খাদ্য উৎপাদন ও সরবরাহকে ব্যাহত করছে। ফলে বাজারে খাদ্য থাকা সত্ত্বেও অনেক পরিবারের জন্য তা পর্যাপ্ত পরিমাণে ও নিয়মিত কেনা কঠিন হয়ে পড়ছে।

বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি—WFP-ও বাংলাদেশে খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা ও অপুষ্টিকে গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ মানুষ খাদ্যনিরাপত্তাহীন এবং প্রায় ১৬ লাখ শিশু তীব্র অপুষ্টির ঝুঁকিতে রয়েছে। আবহাওয়াজনিত অভিঘাত, মূল্যস্ফীতি, অর্থনৈতিক চাপ ও মানবিক সহায়তার ঘাটতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে।

 

খাদ্যনিরাপত্তা মানেই শুধু পেট ভরা নয়

খাদ্যনিরাপত্তার আলোচনায় একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা দরকার—পেট ভরা আর পুষ্টি নিশ্চিত হওয়া এক কথা নয়।

অনেক পরিবার হয়তো প্রতিদিন ভাত ও ডাল খেতে পারছে; কিন্তু মাছ, মাংস, ডিম, দুধ, ফলমূল ও শাকসবজির পর্যাপ্ততা নেই। ফলে ক্যালরির ঘাটতি না থাকলেও প্রোটিন, আয়রন, জিংক, ভিটামিন ও অন্যান্য মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টের ঘাটতি তৈরি হতে পারে।

এ কারণেই অপুষ্টি বাংলাদেশের জন্য দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ। একদিকে খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা, অন্যদিকে অতিপ্রক্রিয়াজাত বা পুষ্টিহীন খাদ্যাভ্যাস। WFP বাংলাদেশের পরিস্থিতিকে ‘ট্রিপল বার্ডেন অব ম্যালনিউট্রিশন’-এর প্রেক্ষাপটে দেখিয়েছে—যেখানে অপুষ্টি, মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টের ঘাটতি এবং অতিরিক্ত ওজন বা অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি একই খাদ্যব্যবস্থার ভেতরে উপস্থিত থাকতে পারে।

শিশুদের জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। IPC-এর ২০২৬ সালের তীব্র অপুষ্টি বিশ্লেষণে জানানো হয়েছে, বছরের বিভিন্ন সময়ে ৬–৫৯ মাস বয়সী প্রায় ৩৭ লাখ শিশুর তীব্র অপুষ্টির সম্ভাব্য ঝুঁকি রয়েছে; এর মধ্যে প্রায় ৭ লাখ ১১ হাজার শিশু গুরুতর তীব্র অপুষ্টির পর্যায়ে পড়তে পারে।

অর্থাৎ খাদ্যনিরাপত্তার প্রশ্নটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের প্রশ্নও।

 

কৃষক বাঁচলে খাদ্যব্যবস্থা বাঁচবে

খাদ্যনিরাপত্তার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন কৃষক। অথচ কৃষি উৎপাদনের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি বহন করেন তিনিই।

বীজ, সার, জ্বালানি, সেচ, শ্রম ও পরিবহন—সবকিছুর ব্যয় বাড়লে কৃষকের উৎপাদন খরচ বাড়ে। কিন্তু বাজারে ফসলের দাম সেই অনুপাতে না বাড়লে উৎপাদক ক্ষতিগ্রস্ত হন। আবার কোনো কোনো মৌসুমে অতিরিক্ত উৎপাদনের কারণে দাম পড়ে গেলে কৃষকের লোকসান হয়; অন্যদিকে ঘাটতির সময়ে ভোক্তাকে বেশি দাম দিতে হয়। এই বৈপরীত্য কৃষি বাজারব্যবস্থার একটি পুরোনো দুর্বলতা।

বাংলাদেশের কৃষি খাতের সাম্প্রতিক প্রবৃদ্ধির হারও উদ্বেগের কারণ। BBS-এর ২০২৪–২৫ অর্থবছরের সাময়িক হিসাবে কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধি ছিল ১.৭৯ শতাংশ, যা আগের অর্থবছরের ৩.৩০ শতাংশের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম।

এখানে প্রশ্নটি শুধু কৃষির প্রবৃদ্ধির নয়; প্রশ্ন হলো, কৃষক কি উৎপাদন করে টিকে থাকতে পারছেন?

কৃষকের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা তাই ভোক্তার স্বার্থেরও অংশ। কৃষক উৎপাদন থেকে সরে গেলে কিংবা কৃষি অলাভজনক হয়ে পড়লে দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থাই দুর্বল হবে।

 

কৃষির সঙ্গে অর্থনীতির গভীর সম্পর্ক

বাংলাদেশের শ্রমবাজারেও কৃষির গুরুত্ব এখনও ব্যাপক। বিশ্বব্যাংকের ILO-ভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশের মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৪৪.৩ শতাংশ কৃষির সঙ্গে যুক্ত ছিল।

তাই কৃষিকে কেবল গ্রামীণ মানুষের জীবিকার খাত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কৃষির সঙ্গে যুক্ত রয়েছে খাদ্য সরবরাহ, গ্রামীণ অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, দারিদ্র্য হ্রাস এবং অভ্যন্তরীণ বাজারের স্থিতিশীলতা।

কৃষি খাত দুর্বল হলে তার প্রভাব শহরেও পৌঁছায়। খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ে, জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ে এবং নিম্নআয়ের মানুষের প্রকৃত আয় কমে যায়। ফলে কৃষি সংকট শেষ পর্যন্ত জাতীয় অর্থনীতির সংকটেও রূপ নেয়।

 

জমি রক্ষা না করলে ভবিষ্যৎ খাদ্য কোথা থেকে আসবে?

বাংলাদেশের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ আবাদযোগ্য জমির ওপর বাড়তে থাকা চাপ। নগরায়ণ, শিল্পায়ন, আবাসন ও অবকাঠামো সম্প্রসারণের প্রয়োজন রয়েছে; কিন্তু এর সঙ্গে কৃষিজমি সংরক্ষণের ভারসাম্য রক্ষা করাও জরুরি।

একটি জমি একবার স্থায়ীভাবে অকৃষি ব্যবহারে চলে গেলে সেটিকে আবার কৃষিতে ফিরিয়ে আনা সহজ নয়। ফলে কৃষিজমি সংরক্ষণ কেবল কৃষকের স্বার্থ নয়—এটি জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তার দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ।

এ ক্ষেত্রে ভূমি ব্যবহারের পরিকল্পনা, কৃষিজমি সুরক্ষা, জলাভূমি সংরক্ষণ এবং পরিকল্পিত শিল্পায়নকে একই নীতির আওতায় আনতে হবে।

 

জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত

বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা করলে জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি বাদ দেওয়ার সুযোগ নেই। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, খরা, নদীভাঙন, লবণাক্ততা ও আকস্মিক বন্যা কৃষি উৎপাদন ও মানুষের জীবিকাকে বারবার আঘাত করছে।

২০২৬ সালের IPC বিশ্লেষণেও জলবায়ু ও দুর্যোগপ্রবণ এলাকার খাদ্য ও পুষ্টি পরিস্থিতির ওপর বিশেষ চাপের চিত্র পাওয়া যাচ্ছে। একই সময়ে তীব্র অপুষ্টির বিশ্লেষণে ফ্ল্যাশ ফ্লাড, রোগের প্রাদুর্ভাব, অপর্যাপ্ত শিশুখাদ্য এবং পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধির দুর্বলতাকে কয়েকটি এলাকায় অবনতির কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

তাই আগামী দিনের কৃষিনীতি হতে হবে জলবায়ু-সহনশীল। লবণাক্ততা সহনশীল জাত, খরাসহিষ্ণু ফসল, পানি সাশ্রয়ী সেচ, আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, দুর্যোগ-সহনশীল অবকাঠামো এবং কৃষিবীমার মতো ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করতে হবে।

 

নিরাপদ খাদ্যও খাদ্যনিরাপত্তার অংশ

খাদ্য উৎপাদন করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। সেই খাদ্য নিরাপদ কি না, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

ভেজাল, অনিরাপদ রাসায়নিকের ব্যবহার, অস্বাস্থ্যকর সংরক্ষণ, দূষিত পানি, অপরিচ্ছন্ন বাজার এবং খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে অনিয়ম জনস্বাস্থ্যের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি করে।

তাই নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে উৎপাদন থেকে ভোক্তার টেবিল পর্যন্ত একটি সমন্বিত নজরদারি ব্যবস্থা প্রয়োজন। বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সক্ষমতা ও মাঠপর্যায়ের নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন, স্বাস্থ্য বিভাগ, কৃষি বিভাগ, ভোক্তা অধিকার সংস্থা এবং আইন প্রয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদার করা দরকার।

 

বাজারব্যবস্থায় কৃষক ও ভোক্তার মাঝখানের দূরত্ব কমাতে হবে

কৃষক মাঠে যে দামে পণ্য বিক্রি করেন, শহরের ভোক্তা অনেক সময় তার চেয়ে অনেক বেশি দামে সেই পণ্য কেনেন। এই ব্যবধানের পেছনে পরিবহন, সংরক্ষণ, পাইকারি বাজার, খুচরা বাজারসহ নানা যৌক্তিক কারণ রয়েছে। কিন্তু অস্বচ্ছতা, অতিরিক্ত স্তরের মধ্যস্বত্বভোগী ও বাজারের তথ্যের অসমতাও অনেক ক্ষেত্রে মূল্যবৈষম্য বাড়ায়।

এখানে কৃষকের জন্য সরাসরি বাজারসংযোগ, কৃষক সমবায়, কৃষিপণ্যের ডিজিটাল বাজার, আধুনিক গুদাম ও কোল্ড-চেইন অবকাঠামো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বিশেষ করে পচনশীল পণ্য—সবজি, ফল, মাছ, দুধ ও অন্যান্য কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রে সংরক্ষণব্যবস্থা উন্নত করা গেলে উৎপাদন-পরবর্তী অপচয় কমবে এবং কৃষক ও ভোক্তা উভয়েই উপকৃত হতে পারেন।

 

তরুণদের কৃষিতে ফিরিয়ে আনা দরকার

কৃষিকে যদি কেবল কায়িক শ্রমের পেশা হিসেবে দেখা হয়, তবে শিক্ষিত তরুণদের বড় অংশ এ খাত থেকে দূরে থাকবে। কিন্তু আধুনিক কৃষি এখন শুধু লাঙল ও কাস্তের কৃষি নয়; এটি প্রযুক্তি, তথ্য, গবেষণা, উদ্যোক্তা, বাজার ও ব্যবস্থাপনার সমন্বিত ক্ষেত্র।

ড্রোন, স্যাটেলাইট ডেটা, মাটির গুণাগুণ বিশ্লেষণ, স্মার্ট সেচ, আবহাওয়ার পূর্বাভাস, কৃষি-অ্যাপ, অনলাইন বাজার ও যান্ত্রিকীকরণ—এসব প্রযুক্তি কৃষিকে নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার খাতে পরিণত করতে পারে।

তাই কৃষি শিক্ষা ও প্রশিক্ষণে প্রযুক্তি, ব্যবসা ব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ু-সহনশীল কৃষির ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন। কৃষিকে তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য লাভজনক ও মর্যাদাপূর্ণ খাত হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি করতে হবে।

 

নির্বাচনী ইশতেহারে কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তা

বাংলাদেশের সামনে জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক দলগুলো যখন নিজেদের কর্মসূচি ও ইশতেহার নিয়ে আলোচনা করবে, তখন কৃষি, খাদ্য ও পুষ্টিনিরাপত্তার বিষয়গুলো কীভাবে অগ্রাধিকার পায়, তা গুরুত্বপূর্ণ একটি নীতিগত প্রশ্ন হয়ে উঠবে।

কোনো নির্দিষ্ট দল বা রাজনৈতিক অবস্থানের পক্ষে না গিয়ে বলা যায়, যে কোনো নির্বাচনী ইশতেহারে কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থা নিয়ে পরিমাপযোগ্য, বাস্তবায়নযোগ্য এবং অর্থায়ন-সমর্থিত পরিকল্পনা থাকলে তা জনসাধারণের নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়ক হবে।

সেখানে কৃষকের ন্যায্য মূল্য, কৃষিঋণের সহজপ্রাপ্যতা, ফসলবীমা, কৃষিজমি সংরক্ষণ, কৃষিপণ্যের সংরক্ষণ ও বাজারব্যবস্থা, নারী কৃষকের অধিকার, তরুণ উদ্যোক্তা, কৃষি গবেষণা, জলবায়ু-সহনশীল প্রযুক্তি, নিরাপদ খাদ্য এবং পুষ্টিকর খাদ্যের সহজপ্রাপ্যতার মতো বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা যেতে পারে।

শুধু প্রতিশ্রুতি যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সময়সীমা, বাজেট, বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান এবং অগ্রগতি পরিমাপের স্বচ্ছ কাঠামো।

 

কৃষকের অধিকার মানেই ভোক্তার অধিকার

কৃষকের স্বার্থ ও ভোক্তার স্বার্থকে পরস্পরের বিপরীত হিসেবে দেখার প্রবণতা পরিহার করতে হবে। কৃষক ন্যায্য দাম পেলে উৎপাদনে উৎসাহিত হন; উৎপাদন স্থিতিশীল হলে সরবরাহ বাড়ে; সরবরাহ স্থিতিশীল হলে বাজারও তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রাখা সহজ হয়।

অন্যদিকে ভোক্তাকে সুরক্ষা দিতে হলে শুধু বাজারে দাম কমানোর চেষ্টা যথেষ্ট নয়। উৎপাদন খরচ, কৃষকের ন্যায্য আয়, পরিবহন, সংরক্ষণ, বাজারের প্রতিযোগিতা এবং সরবরাহব্যবস্থার দক্ষতা—সবকিছু একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।

এই ভারসাম্যই হতে পারে টেকসই খাদ্যনীতির ভিত্তি।

 

শেষ কথা

বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তার সামনে আজ যে চ্যালেঞ্জ, তা কেবল খাদ্যের ঘাটতির প্রশ্ন নয়। এটি ক্রয়ক্ষমতা, কৃষকের আয়, উৎপাদন ব্যয়, পুষ্টি, নিরাপদ খাদ্য, জলবায়ু পরিবর্তন, কৃষিজমি, বাজারব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার সম্মিলিত সংকেত।

আইপিসির সাম্প্রতিক পূর্বাভাস যদি বাস্তবে রূপ নেয় এবং বছরের শেষ দিকে প্রায় ১ কোটি ৮১ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার মধ্যে পড়ে, তবে তা নিঃসন্দেহে নীতি-নির্ধারকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা।

এখন প্রয়োজন সংকট দেখা দেওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়া নয়; বরং সংকটের আগেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গড়ে তোলা।

কৃষককে ন্যায্য মূল্য দিতে হবে। কৃষিজমি রক্ষা করতে হবে। উৎপাদন ব্যয় কমাতে হবে। কৃষিতে গবেষণা ও প্রযুক্তির বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় সামাজিক সুরক্ষা জোরদার করতে হবে। শিশু ও মায়ের পুষ্টিকে জাতীয় অগ্রাধিকারে রাখতে হবে। বাজারে খাদ্যের পাশাপাশি নিরাপত্তা ও গুণগত মান নিশ্চিত করতে হবে।

সবচেয়ে বড় কথা, খাদ্যকে শুধু পণ্য হিসেবে নয়—মানবিক অধিকার, জনস্বাস্থ্য ও জাতীয় স্থিতিশীলতার ভিত্তি হিসেবে দেখতে হবে।

কৃষক শুধু খাদ্য উৎপাদনকারী নন; তিনি দেশের খাদ্যব্যবস্থার প্রথম সারির অংশীদার। তাঁর ঘামেই মাঠে শস্য জন্মায়, সেই শস্যেই শহর-গ্রামের কোটি মানুষের জীবন চলে। তাই কৃষকের নিরাপত্তা মানেই খাদ্যনিরাপত্তার নিরাপত্তা; খাদ্যনিরাপত্তা মানেই মানুষের ভবিষ্যতের নিরাপত্তা।

একটি রাষ্ট্রের উন্নয়নের শেষ হিসাব হয় তার মানুষের জীবনযাত্রায়। সেই হিসাবের প্রথম প্রশ্নটি খুব সহজ—মানুষ কি পর্যাপ্ত, নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাবার পাচ্ছে?

এই প্রশ্নের উত্তর নিশ্চিত করাই এখন বাংলাদেশের অন্যতম বড় জাতীয় দায়িত্ব।

লেখক: মোহাম্মদ হাসান, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

যোগাযোগের ঠিকানা:

বাংলাদেশ বার্তা টুডে

৫৬, চানখারপুল লেন, নাজিমুদ্দিন রোড, বংশাল, ঢাকা-১১০০

ইমেইল: info@bangladeshbartatoday.com