উপসম্পাদকীয়
রাজনীতিতে শিষ্টাচার: ভিন্নমত হোক যুক্তির, ভাষা হোক সভ্যতার
রাজনীতিতে শিষ্টাচার: ভিন্নমত হোক যুক্তির, ভাষা হোক সভ্যতার মোহাম্মদ হাসান পক্ষ-বিপক্ষ, মত-মতান্তর, ভিন্নমত কিংবা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার চেষ্টা—এসব রাজনীতির চিরাচরিত উপাদান। রাজনীতি যেখানে মত ও আদর্শের সংঘাতের ক্ষেত্র, সেখানে মতবিরোধ থাকবেই। পরনিন্দা, সমালোচনা কিংবা প্রতিপক্ষের রাজনৈতিক অবস্থানকে চ্যালেঞ্জ করাও গণতান্ত্রিক রাজনীতির অংশ। কিন্তু মতের অমিল যখন পারস্পরিক অশ্রদ্ধা, ব্যক্তিগত আক্রমণ, অশ্লীলতা ও রুচিহীন ভাষায় রূপ নেয়, তখন তা আর সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ থাকে না। বরং তা রাজনীতির সৌন্দর্য ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ—দুটোকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে। একসময় রাজনীতির মঞ্চে এমন কিছু স্লোগান উচ্চারিত হয়েছে, যা মানুষের মস্তিষ্কে ঝড় তুলেছে, চিন্তার খোরাক জুগিয়েছে, রাজনৈতিক আবেগকে নাড়া দিয়েছে। স্লোগান ছিল তীক্ষ্ণ, বক্তব্য ছিল কঠোর; কিন্তু ভাষায় ছিল ছন্দ, বক্তব্যে ছিল রাজনৈতিক বার্তা এবং প্রতিপক্ষের প্রতি ন্যূনতম শালীনতার সীমারেখা। এখন সেই রাজনৈতিক ভাষার জায়গায় কোথাও কোথাও ঢুকে পড়ছে অশ্লীলতা, কুরুচিপূর্ণ শব্দ, ব্যক্তিগত কটাক্ষ এবং এমন সব ‘শব্দবোমা’, যা উচ্চারণ করতেও বিবেকে বাধে। প্রশ্ন হলো—এ কোন রাজনৈতিক সংস্কৃতির দিকে আমরা এগোচ্ছি? মুখ মানুষের কথা বলার অন্যতম প্রধান মাধ্যম। তাই মুখ দিয়ে যা ইচ্ছা বলা যেমন সভ্যতার পরিচয় নয়, তেমনি যা ইচ্ছা খাওয়াও স্বাস্থ্যের জন্য ভালো নয়। কথারও একটি খাদ্যবিধি আছে—সেখানে যুক্তি থাকবে, সৌজন্য থাকবে, সংযম থাকবে। রাজনৈতিক বক্তব্য যত কঠোরই হোক, তাতে ব্যক্তিগত মর্যাদা ও সামাজিক শালীনতার সীমা অতিক্রম করার কোনো প্রয়োজন নেই। অশালীন ভাষায় হয়তো মুহূর্তের জন্য মাঠ গরম করা যায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘হাইপ’ তৈরি করা যায়, কয়েক দিনের জন্য ভাইরাল হওয়া যায়। কিন্তু ভাইরাল হওয়া আর মর্যাদা অর্জন করা এক কথা নয়। আলোচনায় আসা আর ইতিহাসে জায়গা করে নেওয়াও এক বিষয় নয়। সময়ের পরীক্ষায় টিকে থাকে যুক্তি, আদর্শ, নেতৃত্বের প্রজ্ঞা ও আচরণ; গালিগালাজ কিংবা কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য নয়। রাজনীতিতে শিষ্টাচার কোনো দুর্বলতা নয়; বরং এটি একজন রাজনীতিকের শক্তির পরিচয়। যে নেতা প্রতিপক্ষের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেও তাকে সম্মান করতে জানেন, তিনিই প্রকৃত অর্থে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির ধারক। কারণ গণতন্ত্রের সৌন্দর্যই হলো—আমি আপনার মতের সঙ্গে একমত নই, কিন্তু আপনার মত প্রকাশের অধিকারকে অস্বীকার করছি না। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে পরাজিত করার সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র গালি নয়, যুক্তি। অপমান নয়, তথ্য। হুমকি নয়, জনগণের আস্থা। একজন নেতার আচরণ তার কর্মীদের ওপরও গভীর প্রভাব ফেলে। নেতৃত্বে যদি শিষ্টাচার, সংযম ও সৌজন্য থাকে, কর্মীদের মধ্যেও তার প্রতিফলন ঘটে। বিপরীতে নেতৃত্ব যদি প্রতিপক্ষকে অপমান করাকে রাজনৈতিক যোগ্যতার মাপকাঠি বানিয়ে ফেলে, তাহলে কর্মীদের কাছ থেকেও সভ্য ও সংযত আচরণ প্রত্যাশা করা কঠিন। দলীয় ক্ষমতার মোহে কাউকে গালিগালাজ করলেই কেউ বড় নেতা হয়ে যান না। বড়জোর কিছুদিন আলোচনায় থাকা যায়। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে মানুষের শ্রদ্ধা অর্জন করা যায় না। দুঃখজনকভাবে সাম্প্রতিক সময়ে ভিন্নমতকে গালিগালাজ ও অপমান করার যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তার অনেকটাই উচ্চারণ বা লেখার অযোগ্য। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি অংশ এই প্রবণতাকে শুধু জায়গাই দিচ্ছে না, কোনো কোনো ক্ষেত্রে পরোক্ষভাবে উৎসাহও দিচ্ছে। ফলে যুক্তিনির্ভর রাজনৈতিক বিতর্কের পরিবর্তে ব্যক্তিকে একটি তকমা লাগিয়ে দেওয়া, অর্ধসত্য বা খণ্ডিত তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া, বিদ্বেষ উসকে দেওয়া এবং প্রতিপক্ষকে হেয় করাই যেন সহজ পথ হয়ে উঠেছে। এখানে সবচেয়ে বড় আশঙ্কার জায়গাটি হলো—এই ভাষা কেবল রাজনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। তা সমাজের বৃহত্তর অংশে ছড়িয়ে পড়ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিনিয়ত যে ভাষা ও আচরণ আমরা দেখি, তা তরুণ প্রজন্মের রাজনৈতিক ও সামাজিক মনোজগতেও প্রভাব ফেলছে। যুক্তির জায়গায় গালিগালাজ, মতবিরোধের জায়গায় অপমান এবং শ্রদ্ধার জায়গায় বিদ্বেষ প্রতিষ্ঠিত হলে একটি প্রজন্ম ধীরে ধীরে সহনশীলতা ও সংলাপের সংস্কৃতি হারিয়ে ফেলবে। কোনো সভ্য সমাজের জন্য এটি শুভ লক্ষণ নয়। এখানে এসে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার দিকেও তাকাতে হয়। দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাড়ছে, শিক্ষার হার বাড়ছে, উচ্চশিক্ষার সুযোগ বাড়ছে; কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—নৈতিক মানুষ কতটা বাড়ছে? শিক্ষিত হওয়া আর সুশিক্ষিত হওয়া এক বিষয় নয়। ডিগ্রি একজন মানুষকে শিক্ষিত পরিচয় দিতে পারে, কিন্তু নৈতিকতা তাকে প্রকৃত অর্থে মানুষ করে। দুর্নীতি, ঘুষ, প্রতারণা কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহার কেবল অশিক্ষিত মানুষের হাতে ঘটে না; বরং শিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত মানুষের একটি অংশও এসব অনিয়মের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। এখানেই আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার সাফল্য ও ব্যর্থতার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে। আমরা কি শুধু চাকরির বাজারের জন্য মানুষ তৈরি করছি, নাকি বিবেকবান নাগরিকও তৈরি করছি? আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় জ্ঞান ও দক্ষতার পাশাপাশি নৈতিক মূল্যবোধ, মানবিকতা, সহনশীলতা, দায়িত্ববোধ এবং উন্নত চরিত্র গঠনের বিষয়টি আরও বেশি গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে। কারণ একজন মানুষ কত বড় পদে গেলেন, কত ডিগ্রি অর্জন করলেন কিংবা কত অর্থ উপার্জন করলেন—এসবের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ তিনি মানুষ হিসেবে কতটা সৎ, দায়িত্বশীল ও মানবিক। রাজনীতির গুণগত পরিবর্তনের সঙ্গেও শিক্ষার এই সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। আমরা রাজনীতি নিয়ে যতটা আলোচনা করি, শিক্ষা নিয়ে ততটা করি না। ঘরে, বাইরে, অফিস-আদালতে, হাট-বাজারে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে—রাজনীতি নিয়ে আমাদের আগ্রহের কমতি নেই। অথচ একটি দেশের দীর্ঘমেয়াদি ভবিষ্যৎ নির্মাণে শিক্ষার ভূমিকা নিয়ে সেই মাত্রায় সামাজিক ও রাজনৈতিক আলোচনা খুব একটা দেখা যায় না। রাজনৈতিক সংস্কার নিয়ে যেমন আলোচনা হয়, তেমনি শিক্ষা সংস্কার নিয়েও সমান গুরুত্বে আলোচনা হওয়া প্রয়োজন। কারণ সৎ, দায়িত্বশীল ও নৈতিক নাগরিক ছাড়া কোনো সংস্কারই স্থায়ী হতে পারে না। রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান বদলানো সম্ভব, আইন পরিবর্তন করা সম্ভব, নীতিমালা সংশোধন করা সম্ভব; কিন্তু মানুষের নৈতিক চরিত্রের পরিবর্তন ছাড়া এসব উদ্যোগের সুফল দীর্ঘস্থায়ী করা কঠিন। তাই রাজনৈতিক সংস্কারের আলোচনায় ‘শিষ্টাচার’কে প্রান্তিক কোনো বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। রাজনৈতিক শিষ্টাচার আসলে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির অন্যতম ভিত্তি। প্রতিপক্ষকে সম্মান করা, ভিন্নমত সহ্য করা, যুক্তির মাধ্যমে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করা, ভুল হলে তা স্বীকার করার মানসিকতা তৈরি করা—এসবই সভ্য রাজনীতির লক্ষণ। আমাদের মনে রাখতে হবে, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ শত্রু নয়। আজ যে ব্যক্তি আপনার প্রতিপক্ষ, আগামীকাল কোনো জাতীয় স্বার্থে তার সঙ্গে একই টেবিলে বসতে হতে পারে। মতের অমিল থাকতেই পারে; কিন্তু সম্পর্কের দরজা বন্ধ করে দেওয়া গণতন্ত্রের পথ নয়। বরং গণতন্ত্রের শক্তি হলো মতের ভিন্নতা সত্ত্বেও সহাবস্থান। রাজনীতিতে প্রতিযোগিতা থাকবে, তর্ক থাকবে, তীব্র সমালোচনা থাকবে। কিন্তু সেই প্রতিযোগিতা যেন চরিত্রহননে পরিণত না হয়, সমালোচনা যেন অশ্লীলতায় না নামে এবং প্রতিবাদ যেন অসভ্য ভাষার আশ্রয় না নেয়—এই সীমারেখাটি আমাদের নিজেদেরই রক্ষা করতে হবে। কারণ ভাষা শুধু শব্দের সমষ্টি নয়; ভাষা একটি সমাজের রুচি, সংস্কৃতি ও মানসিকতার প্রতিচ্ছবি। আজ আমরা যে ভাষা ব্যবহার করছি, আগামী প্রজন্ম সেই ভাষাই উত্তরাধিকার হিসেবে পাবে। তাই রাজনীতিকদের দায়িত্ব শুধু রাষ্ট্র পরিচালনা বা ক্ষমতার রাজনীতি করা নয়; সমাজের ভাষা ও আচরণের মানও নির্ধারণ করা। নেতারা যদি সংযত হন, কর্মীরাও সংযম শিখবেন। নেতারা যদি যুক্তি দিয়ে কথা বলেন, কর্মীরাও যুক্তির মূল্য বুঝবেন। আর নেতারা যদি গালিগালাজকে রাজনৈতিক হাতিয়ার বানান, তাহলে সেই বিষ সমাজের সর্বস্তরে ছড়িয়ে পড়বে। সুতরাং সময় এসেছে রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নতুন করে শিষ্টাচারের চর্চা ফিরিয়ে আনার। ভিন্নমত থাকবে, মতবিরোধ থাকবে, কঠোর সমালোচনাও থাকবে—কিন্তু ভাষা হবে সভ্য, বক্তব্য হবে যুক্তিনির্ভর এবং আচরণ হবে দায়িত্বশীল। রাজনীতিকে যদি সত্যিই জনকল্যাণের হাতিয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হয়, তাহলে গালির বদলে যুক্তি, বিদ্বেষের বদলে সহনশীলতা, অপমানের বদলে সম্মান এবং অশালীনতার বদলে শিষ্টাচারকে রাজনৈতিক সংস্কৃতির মানদণ্ড করতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থাকে শুধু পরীক্ষার ফল, সনদ কিংবা চাকরির বাজারের প্রয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে নৈতিক ও মানবিক মানুষ তৈরির অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। কারণ শিক্ষা যদি বিবেক তৈরি না করে, রাজনীতি যদি শিষ্টাচার শেখাতে না পারে এবং সমাজ যদি ভিন্নমতকে সম্মান করতে না শেখে—তাহলে উন্নয়নের বাহ্যিক চাকচিক্য যতই বাড়ুক, একটি সভ্য রাষ্ট্র নির্মাণ সম্ভব হবে না। দিনশেষে রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার ক্ষমতা নয়, মানুষের আস্থা। আর সেই আস্থা অর্জনের প্রথম শর্ত—শিষ্টাচার। লেখক: মোহাম্মদ হাসান, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।