বিশ্বের আস্থা পুনর্গঠন, সংঘাত প্রশমন ও বহুপাক্ষিক ব্যবস্থাকে কার্যকর করার চ্যালেঞ্জে বাংলাদেশের কূটনীতির সামনে নতুন সুযোগ

জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনে বাংলাদেশ: বৈশ্বিক আস্থার সংকটে ঢাকার কূটনৈতিক অগ্রাধিকার কী?

বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক

প্রকাশ: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:২০ এএম

বিশেষ প্রতিনিধি। সঞ্জয় মজুমদার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬:

 যুদ্ধ, মানবিক সংকট, জলবায়ু ঝুঁকি, বৈশ্বিক বৈষম্য এবং বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার ওপর আস্থার সংকটের মধ্যেই নিউইয়র্কে চলছে জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের উচ্চপর্যায়ের সপ্তাহ; আর এই অধিবেশনের সভাপতির আসনে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান ২ জুন ২০২৬ জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হন এবং তাঁর সভাপতিত্বের মূল প্রতিপাদ্য—“Restoring Trust, Managing Transformation: A United Nations That Delivers for All”—বর্তমান আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় আস্থা পুনর্গঠন ও কার্যকর বহুপাক্ষিকতার প্রশ্নকে সামনে এনেছে।

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ৮১তম অধিবেশন ৮ সেপ্টেম্বর শুরু হয়েছে এবং এর সাধারণ বিতর্ক অনুষ্ঠিত হচ্ছে ২২ থেকে ২৬ সেপ্টেম্বর এবং ২৮ সেপ্টেম্বর। ফলে ২৭ সেপ্টেম্বরের এই বিরতিতে ইতোমধ্যে বিশ্বনেতাদের বক্তব্য, বিভিন্ন উচ্চপর্যায়ের বৈঠক এবং বহুপাক্ষিক আলোচনার মধ্য দিয়ে যে অগ্রাধিকারগুলো সামনে এসেছে, সেগুলোর আলোকে বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থানও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

ড. খলিলুর রহমানের সভাপতিত্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এটি শুধু বাংলাদেশের একটি আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক দায়িত্ব নয়; বরং ১৯৩ সদস্যরাষ্ট্রের সাধারণ পরিষদের আলোচনায় ঐকমত্য তৈরির একটি প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব। জাতিসংঘের অফিসিয়াল তথ্য অনুযায়ী, সাধারণ পরিষদের ১৯৩ সদস্যের প্রত্যেকের একটি করে ভোট রয়েছে। সভাপতির দায়িত্বের মধ্যে সদস্যরাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে কাজ করা, অধিবেশনের বৈঠকে সভাপতিত্ব করা এবং বিভিন্ন উচ্চপর্যায়ের আলোচনাকে এগিয়ে নেওয়া অন্তর্ভুক্ত।

এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সামনে প্রথম বড় অগ্রাধিকার হচ্ছে বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার প্রতি আস্থা পুনর্গঠন। ড. খলিলুর রহমান ৮ সেপ্টেম্বর অধিবেশনের উদ্বোধনী বক্তব্যে বলেন, আস্থা শুধু চাওয়া যায় না; সিদ্ধান্ত, প্রতিশ্রুতি এবং জনগণের জন্য বাস্তব ফলাফলের মাধ্যমে তা অর্জন করতে হয়। তিনি জাতিসংঘকে আরও কার্যকর ও ভবিষ্যৎ উপযোগী করার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেছেন।

তাঁর কর্মসূচিতে ছয়টি আন্তঃসম্পর্কিত স্তম্ভ নির্ধারণ করা হয়েছে—সংঘাত বন্ধ করে মানুষের কণ্ঠকে গুরুত্ব দেওয়া, কাউকে ও কোনো দেশকে পিছিয়ে না রাখা, জলবায়ু ও বৈশ্বিক অঙ্গীকার বাস্তবায়ন, অধিকার ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা, অন্তর্ভুক্তিমূলক উদ্ভাবন এবং জনগণের অংশগ্রহণকে নতুনভাবে বিবেচনা করা। জাতিসংঘের সভাপতির দপ্তর বলছে, এই স্তম্ভগুলোকে আলাদা বিষয় হিসেবে নয়, বরং শান্তি, উন্নয়ন, জলবায়ু, অধিকার ও কার্যকর বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার পরস্পরনির্ভর অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বাংলাদেশের জন্য এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রোহিঙ্গা সংকট। ড. খলিলুর রহমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী হওয়ার আগে বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং রোহিঙ্গা বিষয়ক হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন—যা এই সংকটের কূটনৈতিক গুরুত্বের সঙ্গে তাঁর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার একটি প্রেক্ষাপট তৈরি করে।

রোহিঙ্গা প্রশ্নে ঢাকার মূল লক্ষ্য নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক সমর্থন ধরে রাখা। তবে সংকটটির স্থায়ী সমাধান শুধু মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল নয়; মিয়ানমারের পরিস্থিতি, নিরাপত্তা, নাগরিক অধিকার এবং প্রত্যাবাসনের বাস্তব পরিবেশ—সবকিছুর সঙ্গে বিষয়টি যুক্ত। ফলে জাতিসংঘের উচ্চপর্যায়ের আলোচনায় বাংলাদেশের জন্য মানবিক সংকটকে দীর্ঘমেয়াদি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত করে উপস্থাপন করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অগ্রাধিকার জলবায়ু পরিবর্তন ও উন্নয়ন। ৮১তম অধিবেশনের উচ্চপর্যায়ের সপ্তাহে জলবায়ু কার্যক্রম ও ন্যায্য রূপান্তর এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ঝুঁকি নিয়ে পৃথক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর অর্থনীতি, খাদ্যনিরাপত্তা, অভিবাসন ও মানবিক পরিস্থিতির ওপর চাপ বাড়ার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ এসব আলোচনায় নিজের বাস্তব অভিজ্ঞতা তুলে ধরার সুযোগ পাচ্ছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বৈষম্য ও উন্নয়ন অর্থায়নের প্রশ্ন। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, জলবায়ু অর্থায়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর, টেকসই উন্নয়ন এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় ন্যায্য অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ। জাতিসংঘের সভাপতির কর্মসূচিতে “No One Left Behind, No Country Left Out” এবং “Innovation with Inclusion”–এর মতো অগ্রাধিকার থাকার কারণে এসব বিষয় বহুপাক্ষিক আলোচনায় আরও দৃশ্যমান করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

একই সঙ্গে জাতিসংঘ সংস্কারের প্রশ্নও বাংলাদেশের সভাপতিত্বের সময়ে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। যুদ্ধ ও মানবিক সংকট মোকাবিলায় জাতিসংঘের সক্ষমতা, নিরাপত্তা পরিষদ ও সাধারণ পরিষদের ভূমিকা, আন্তর্জাতিক আইন এবং সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ক রয়েছে। তবে সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশের ভূমিকা হবে সদস্যরাষ্ট্রগুলোর আলোচনার জন্য একটি কার্যকর ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ তৈরি করা; কোনো নির্দিষ্ট রাষ্ট্রের পক্ষে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া নয়। ড. খলিলুর রহমান নিজেও বলেছেন, তাঁর লক্ষ্য হবে মতপার্থক্য উপেক্ষা না করে অভিন্ন জায়গা খুঁজে বের করা।

বর্তমান আন্তর্জাতিক বাস্তবতায় এই দায়িত্বের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, বাস্তুচ্যুতি, জলবায়ু বিপর্যয়, খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা এবং প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন—সবগুলো সংকট একে অপরের সঙ্গে যুক্ত। জাতিসংঘের সভাপতির দপ্তরও ৮১তম অধিবেশনের প্রেক্ষাপট হিসেবে সংঘাত, বৈষম্য, জলবায়ু জরুরি অবস্থা, আস্থার ক্ষয় এবং ঘৃণা ও বিভ্রান্তিকর তথ্যের বিস্তারের কথা উল্লেখ করেছে।

এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের জন্য কূটনৈতিক সাফল্য কেবল কতগুলো বৈঠক বা বক্তব্যের সংখ্যায় পরিমাপ করা যাবে না। বরং প্রশ্ন হবে—আন্তর্জাতিক মতপার্থক্যের মধ্যেও কতটা ঐকমত্য তৈরি করা সম্ভব, মানবিক সংকটগুলোকে কতটা কার্যকরভাবে আলোচনার কেন্দ্রে রাখা যায় এবং জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত ও উদ্যোগগুলো সাধারণ মানুষের জীবনে কতটা বাস্তব পরিবর্তন আনতে পারে।

২৭ সেপ্টেম্বরের অবস্থান থেকে সামনে তাকালে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে সভাপতির নিরপেক্ষতা ও দেশের জাতীয় স্বার্থ—এই দুই ক্ষেত্রের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা। একদিকে সভাপতির দায়িত্বে ১৯৩ সদস্যরাষ্ট্রের জন্য সমানভাবে কাজ করতে হবে; অন্যদিকে বাংলাদেশকে রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু ঝুঁকি, উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক স্বার্থের মতো জাতীয় ও আঞ্চলিক অগ্রাধিকারগুলো আন্তর্জাতিক আলোচনায় কার্যকরভাবে তুলে ধরতে হবে। ড. খলিলুর রহমানের বক্তব্যে সদস্যরাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আস্থা, ঐকমত্য এবং সংলাপের ওপর যে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, তা এই ভারসাম্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।

শেষ পর্যন্ত ৮১তম সাধারণ পরিষদ বাংলাদেশের জন্য শুধু একটি কূটনৈতিক মর্যাদার অধ্যায় নয়; এটি বহুপাক্ষিক বিশ্বব্যবস্থায় বাংলাদেশের ভূমিকা দৃশ্যমান করার একটি বড় পরীক্ষা। নিউইয়র্কের সাধারণ পরিষদে ১৯৩ দেশের সমান ভোটের কাঠামোর মধ্যে বাংলাদেশের সভাপতিত্ব এখন এমন এক সময়ে, যখন বিশ্ব একদিকে আরও বেশি সহযোগিতা চাইছে, অন্যদিকে বড় শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও আস্থার সংকট সেই সহযোগিতাকেই কঠিন করে তুলছে। এই বাস্তবতায় ঢাকার কূটনৈতিক অগ্রাধিকার হবে—রোহিঙ্গা সংকট থেকে জলবায়ু ও উন্নয়ন, শান্তি থেকে জাতিসংঘ সংস্কার—প্রতিটি ইস্যুকে এমন বহুপাক্ষিক আলোচনার সঙ্গে যুক্ত করা, যার লক্ষ্য হবে বাস্তব ফলাফল এবং দীর্ঘমেয়াদি আন্তর্জাতিক সহযোগিতা।

যোগাযোগের ঠিকানা:

বাংলাদেশ বার্তা টুডে

৫৬, চানখারপুল লেন, নাজিমুদ্দিন রোড, বংশাল, ঢাকা-১১০০

ইমেইল: info@bangladeshbartatoday.com