জাতিসংঘ
জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনে বাংলাদেশ: বৈশ্বিক আস্থার সংকটে ঢাকার কূটনৈতিক অগ্রাধিকার কী?
জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনে বাংলাদেশ: বৈশ্বিক আস্থার সংকটে ঢাকার কূটনৈতিক অগ্রাধিকার কী? বিশ্বের আস্থা পুনর্গঠন, সংঘাত প্রশমন ও বহুপাক্ষিক ব্যবস্থাকে কার্যকর করার চ্যালেঞ্জে বাংলাদেশের কূটনীতির সামনে নতুন সুযোগ বিশেষ প্রতিনিধি। সঞ্জয় মজুমদার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬: যুদ্ধ, মানবিক সংকট, জলবায়ু ঝুঁকি, বৈশ্বিক বৈষম্য এবং বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার ওপর আস্থার সংকটের মধ্যেই নিউইয়র্কে চলছে জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের উচ্চপর্যায়ের সপ্তাহ; আর এই অধিবেশনের সভাপতির আসনে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান ২ জুন ২০২৬ জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হন এবং তাঁর সভাপতিত্বের মূল প্রতিপাদ্য—“Restoring Trust, Managing Transformation: A United Nations That Delivers for All”—বর্তমান আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় আস্থা পুনর্গঠন ও কার্যকর বহুপাক্ষিকতার প্রশ্নকে সামনে এনেছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ৮১তম অধিবেশন ৮ সেপ্টেম্বর শুরু হয়েছে এবং এর সাধারণ বিতর্ক অনুষ্ঠিত হচ্ছে ২২ থেকে ২৬ সেপ্টেম্বর এবং ২৮ সেপ্টেম্বর। ফলে ২৭ সেপ্টেম্বরের এই বিরতিতে ইতোমধ্যে বিশ্বনেতাদের বক্তব্য, বিভিন্ন উচ্চপর্যায়ের বৈঠক এবং বহুপাক্ষিক আলোচনার মধ্য দিয়ে যে অগ্রাধিকারগুলো সামনে এসেছে, সেগুলোর আলোকে বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থানও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ড. খলিলুর রহমানের সভাপতিত্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এটি শুধু বাংলাদেশের একটি আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক দায়িত্ব নয়; বরং ১৯৩ সদস্যরাষ্ট্রের সাধারণ পরিষদের আলোচনায় ঐকমত্য তৈরির একটি প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব। জাতিসংঘের অফিসিয়াল তথ্য অনুযায়ী, সাধারণ পরিষদের ১৯৩ সদস্যের প্রত্যেকের একটি করে ভোট রয়েছে। সভাপতির দায়িত্বের মধ্যে সদস্যরাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে কাজ করা, অধিবেশনের বৈঠকে সভাপতিত্ব করা এবং বিভিন্ন উচ্চপর্যায়ের আলোচনাকে এগিয়ে নেওয়া অন্তর্ভুক্ত। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সামনে প্রথম বড় অগ্রাধিকার হচ্ছে বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার প্রতি আস্থা পুনর্গঠন। ড. খলিলুর রহমান ৮ সেপ্টেম্বর অধিবেশনের উদ্বোধনী বক্তব্যে বলেন, আস্থা শুধু চাওয়া যায় না; সিদ্ধান্ত, প্রতিশ্রুতি এবং জনগণের জন্য বাস্তব ফলাফলের মাধ্যমে তা অর্জন করতে হয়। তিনি জাতিসংঘকে আরও কার্যকর ও ভবিষ্যৎ উপযোগী করার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেছেন। তাঁর কর্মসূচিতে ছয়টি আন্তঃসম্পর্কিত স্তম্ভ নির্ধারণ করা হয়েছে—সংঘাত বন্ধ করে মানুষের কণ্ঠকে গুরুত্ব দেওয়া, কাউকে ও কোনো দেশকে পিছিয়ে না রাখা, জলবায়ু ও বৈশ্বিক অঙ্গীকার বাস্তবায়ন, অধিকার ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা, অন্তর্ভুক্তিমূলক উদ্ভাবন এবং জনগণের অংশগ্রহণকে নতুনভাবে বিবেচনা করা। জাতিসংঘের সভাপতির দপ্তর বলছে, এই স্তম্ভগুলোকে আলাদা বিষয় হিসেবে নয়, বরং শান্তি, উন্নয়ন, জলবায়ু, অধিকার ও কার্যকর বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার পরস্পরনির্ভর অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বাংলাদেশের জন্য এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রোহিঙ্গা সংকট। ড. খলিলুর রহমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী হওয়ার আগে বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং রোহিঙ্গা বিষয়ক হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন—যা এই সংকটের কূটনৈতিক গুরুত্বের সঙ্গে তাঁর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার একটি প্রেক্ষাপট তৈরি করে। রোহিঙ্গা প্রশ্নে ঢাকার মূল লক্ষ্য নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক সমর্থন ধরে রাখা। তবে সংকটটির স্থায়ী সমাধান শুধু মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল নয়; মিয়ানমারের পরিস্থিতি, নিরাপত্তা, নাগরিক অধিকার এবং প্রত্যাবাসনের বাস্তব পরিবেশ—সবকিছুর সঙ্গে বিষয়টি যুক্ত। ফলে জাতিসংঘের উচ্চপর্যায়ের আলোচনায় বাংলাদেশের জন্য মানবিক সংকটকে দীর্ঘমেয়াদি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত করে উপস্থাপন করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অগ্রাধিকার জলবায়ু পরিবর্তন ও উন্নয়ন। ৮১তম অধিবেশনের উচ্চপর্যায়ের সপ্তাহে জলবায়ু কার্যক্রম ও ন্যায্য রূপান্তর এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ঝুঁকি নিয়ে পৃথক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর অর্থনীতি, খাদ্যনিরাপত্তা, অভিবাসন ও মানবিক পরিস্থিতির ওপর চাপ বাড়ার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ এসব আলোচনায় নিজের বাস্তব অভিজ্ঞতা তুলে ধরার সুযোগ পাচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বৈষম্য ও উন্নয়ন অর্থায়নের প্রশ্ন। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, জলবায়ু অর্থায়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর, টেকসই উন্নয়ন এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় ন্যায্য অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ। জাতিসংঘের সভাপতির কর্মসূচিতে “No One Left Behind, No Country Left Out” এবং “Innovation with Inclusion”–এর মতো অগ্রাধিকার থাকার কারণে এসব বিষয় বহুপাক্ষিক আলোচনায় আরও দৃশ্যমান করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে জাতিসংঘ সংস্কারের প্রশ্নও বাংলাদেশের সভাপতিত্বের সময়ে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। যুদ্ধ ও মানবিক সংকট মোকাবিলায় জাতিসংঘের সক্ষমতা, নিরাপত্তা পরিষদ ও সাধারণ পরিষদের ভূমিকা, আন্তর্জাতিক আইন এবং সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ক রয়েছে। তবে সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশের ভূমিকা হবে সদস্যরাষ্ট্রগুলোর আলোচনার জন্য একটি কার্যকর ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ তৈরি করা; কোনো নির্দিষ্ট রাষ্ট্রের পক্ষে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া নয়। ড. খলিলুর রহমান নিজেও বলেছেন, তাঁর লক্ষ্য হবে মতপার্থক্য উপেক্ষা না করে অভিন্ন জায়গা খুঁজে বের করা। বর্তমান আন্তর্জাতিক বাস্তবতায় এই দায়িত্বের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, বাস্তুচ্যুতি, জলবায়ু বিপর্যয়, খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা এবং প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন—সবগুলো সংকট একে অপরের সঙ্গে যুক্ত। জাতিসংঘের সভাপতির দপ্তরও ৮১তম অধিবেশনের প্রেক্ষাপট হিসেবে সংঘাত, বৈষম্য, জলবায়ু জরুরি অবস্থা, আস্থার ক্ষয় এবং ঘৃণা ও বিভ্রান্তিকর তথ্যের বিস্তারের কথা উল্লেখ করেছে। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের জন্য কূটনৈতিক সাফল্য কেবল কতগুলো বৈঠক বা বক্তব্যের সংখ্যায় পরিমাপ করা যাবে না। বরং প্রশ্ন হবে—আন্তর্জাতিক মতপার্থক্যের মধ্যেও কতটা ঐকমত্য তৈরি করা সম্ভব, মানবিক সংকটগুলোকে কতটা কার্যকরভাবে আলোচনার কেন্দ্রে রাখা যায় এবং জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত ও উদ্যোগগুলো সাধারণ মানুষের জীবনে কতটা বাস্তব পরিবর্তন আনতে পারে। ২৭ সেপ্টেম্বরের অবস্থান থেকে সামনে তাকালে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে সভাপতির নিরপেক্ষতা ও দেশের জাতীয় স্বার্থ—এই দুই ক্ষেত্রের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা। একদিকে সভাপতির দায়িত্বে ১৯৩ সদস্যরাষ্ট্রের জন্য সমানভাবে কাজ করতে হবে; অন্যদিকে বাংলাদেশকে রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু ঝুঁকি, উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক স্বার্থের মতো জাতীয় ও আঞ্চলিক অগ্রাধিকারগুলো আন্তর্জাতিক আলোচনায় কার্যকরভাবে তুলে ধরতে হবে। ড. খলিলুর রহমানের বক্তব্যে সদস্যরাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আস্থা, ঐকমত্য এবং সংলাপের ওপর যে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, তা এই ভারসাম্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। শেষ পর্যন্ত ৮১তম সাধারণ পরিষদ বাংলাদেশের জন্য শুধু একটি কূটনৈতিক মর্যাদার অধ্যায় নয়; এটি বহুপাক্ষিক বিশ্বব্যবস্থায় বাংলাদেশের ভূমিকা দৃশ্যমান করার একটি বড় পরীক্ষা। নিউইয়র্কের সাধারণ পরিষদে ১৯৩ দেশের সমান ভোটের কাঠামোর মধ্যে বাংলাদেশের সভাপতিত্ব এখন এমন এক সময়ে, যখন বিশ্ব একদিকে আরও বেশি সহযোগিতা চাইছে, অন্যদিকে বড় শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও আস্থার সংকট সেই সহযোগিতাকেই কঠিন করে তুলছে। এই বাস্তবতায় ঢাকার কূটনৈতিক অগ্রাধিকার হবে—রোহিঙ্গা সংকট থেকে জলবায়ু ও উন্নয়ন, শান্তি থেকে জাতিসংঘ সংস্কার—প্রতিটি ইস্যুকে এমন বহুপাক্ষিক আলোচনার সঙ্গে যুক্ত করা, যার লক্ষ্য হবে বাস্তব ফলাফল এবং দীর্ঘমেয়াদি আন্তর্জাতিক সহযোগিতা।
জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশন: যুদ্ধ, জ্বালানি সংকট ও বিশ্বব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে মুখোমুখি বিশ্বনেতারা
জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশন: যুদ্ধ, জ্বালানি সংকট ও বিশ্বব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে মুখোমুখি বিশ্বনেতারা মধ্যপ্রাচ্য, ইউক্রেন, AI ও UN সংস্কার—নিউইয়র্কে কূটনীতির বড় পরীক্ষা বিশেষ প্রতিনিধিঃ সঞ্জয় মজুমদার। নিউইয়র্ক, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬: যুদ্ধ, জ্বালানি নিরাপত্তা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জলবায়ু সংকট ও বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে তীব্র আন্তর্জাতিক অনিশ্চয়তার মধ্যেই মঙ্গলবার নিউইয়র্কে শুরু হলো জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের উচ্চপর্যায়ের সাধারণ বিতর্ক। জাতিসংঘ সদর দপ্তরে ১৯৩ সদস্যরাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা বৈশ্বিক সংকটের সমাধান ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার পথ নিয়ে আলোচনা করছেন। সাধারণ বিতর্ক ২২ থেকে ২৬ সেপ্টেম্বর এবং ২৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলবে। এবারের অধিবেশনের আনুষ্ঠানিক প্রতিপাদ্য—“Restoring trust, managing transformation: A United Nations that delivers for all”—বিশ্ব রাজনীতির বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। যুদ্ধ ও ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা যখন কঠিন হয়ে উঠেছে, তখন জাতিসংঘ কতটা কার্যকরভাবে আস্থা পুনর্গঠন ও যৌথ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে পারে, সেটিই এবারের আলোচনার বড় প্রশ্ন। বাংলাদেশের কূটনীতিক ড. খলিলুর রহমান ৮১তম সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে অধিবেশন পরিচালনা করছেন। যুদ্ধের কূটনীতি সামনে সাধারণ বিতর্কের সবচেয়ে কঠিন আলোচনাগুলোর একটি হতে যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউক্রেন। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত, ইরানকে ঘিরে সামরিক উত্তেজনা এবং গাজা পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক কূটনীতিকে নতুন চাপের মুখে ফেলেছে। একই সঙ্গে ইউক্রেন যুদ্ধ অব্যাহত থাকায় ইউরোপীয় নিরাপত্তা, সামরিক সহায়তা, সীমান্ত ঝুঁকি ও ভবিষ্যৎ শান্তি-আলোচনা নিয়ে সদস্যরাষ্ট্রগুলোর অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবারের অধিবেশনে যুদ্ধের অবসান ও বেসামরিক জনগণের সুরক্ষার প্রশ্নের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘের ভূমিকা নিয়েও চাপ থাকবে। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের জন্যও এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি অধিবেশন। তাঁর মেয়াদ ২০২৬ সালের শেষদিকে শেষ হওয়ার কথা। ফলে বর্তমান সংকটগুলোর পাশাপাশি জাতিসংঘের পরবর্তী নেতৃত্ব, প্রতিষ্ঠানটির কার্যকারিতা এবং ভবিষ্যৎ সংস্কারের প্রশ্নও কূটনৈতিক আলোচনায় জায়গা করে নিচ্ছে। গুতেরেস সাম্প্রতিক বক্তব্যে বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বর্তমান বিশ্বের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। সংস্কারের প্রশ্নে জাতিসংঘের পরীক্ষা জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের কাঠামো ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ক এবারও আলোচনার কেন্দ্রে থাকতে পারে। সমালোচকদের একটি বড় প্রশ্ন—বর্তমান আন্তর্জাতিক শক্তির ভারসাম্য কি জাতিসংঘের বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোতে যথাযথভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে? এখানে শুধু নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কার নয়, উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতিনিধিত্ব, আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার এবং বৈশ্বিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে Global South-এর ভূমিকার প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। তবে সদস্যরাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সংস্কারের পদ্ধতি ও অগ্রাধিকার নিয়ে মতপার্থক্য থাকায় দ্রুত ঐকমত্যে পৌঁছানো সহজ হবে না। AI: নতুন প্রযুক্তি, নতুন কূটনৈতিক সীমারেখা এবারের অধিবেশনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আর শুধু প্রযুক্তি খাতের বিষয় নয়; এটি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা, অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা ও মানবাধিকারের সঙ্গেও যুক্ত হয়ে গেছে। জাতিসংঘ মহাসচিব গুতেরেস দীর্ঘদিন ধরেই AI ব্যবস্থাপনায় আন্তর্জাতিক সমন্বিত কাঠামোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলে আসছেন। একই সময়ে প্রযুক্তি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড, নিরাপত্তা পরীক্ষা ও ঝুঁকি-ব্যবস্থাপনা নিয়ে নিজস্ব প্রস্তাব সামনে আনছে। ২১ সেপ্টেম্বর OpenAI আন্তর্জাতিক প্রযুক্তিগত মানদণ্ড ও উন্নত AI ব্যবস্থার জন্য সমন্বিত কাঠামোর প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের জন্য মূলর প্রশ্নটি এখন প্রযুক্তি বন্ধ করা নয়; বরং কীভাবে উদ্ভাবন অব্যাহত রেখে এর ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ করা যায়। কারণ AI-এর দ্রুত বিস্তার একই সঙ্গে অর্থনৈতিক সুযোগ ও নতুন নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। যুদ্ধের সঙ্গে জ্বালানি সংকটের যোগসূত্র আন্তর্জাতিক সংঘাতের অর্থনৈতিক প্রভাবও এবারের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও জ্বালানি পরিবহনপথের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের পাশাপাশি ইউক্রেন যুদ্ধও ইউরোপীয় জ্বালানি বাজারের ওপর চাপ তৈরি করছে। বিশ্বনেতারা তাই শুধু যুদ্ধ বন্ধের কূটনীতি নয়, জ্বালানি সরবরাহের স্থিতিশীলতা, মূল্যস্ফীতি এবং খাদ্য ও পরিবহন ব্যয়ের মতো পারস্পরিকভাবে যুক্ত বিষয়গুলো নিয়েও আলোচনা করতে বাধ্য হচ্ছেন। জাতিসংঘের উচ্চপর্যায়ের সপ্তাহে ২৩ সেপ্টেম্বর জলবায়ু ও ন্যায্য জ্বালানি রূপান্তর নিয়েও বিশেষ বৈঠক রয়েছে। জলবায়ু ও উন্নয়নও বাদ যাচ্ছে না যুদ্ধের ছায়ার মধ্যেও জলবায়ু পরিবর্তন ও টেকসই উন্নয়ন এবারের কর্মসূচিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। ২৩ সেপ্টেম্বর জলবায়ু কার্যক্রম ও ন্যায্য রূপান্তর নিয়ে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক এবং ২৪ সেপ্টেম্বর সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির অস্তিত্বগত হুমকি নিয়ে বিশেষ বৈঠক নির্ধারিত রয়েছে। এর সঙ্গে উন্নয়নশীল দেশগুলোর ঋণ, খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা এবং জলবায়ু অর্থায়নের প্রশ্নও যুক্ত। ফলে যুদ্ধ ও নিরাপত্তার পাশাপাশি উন্নয়ন ও জলবায়ুকে কীভাবে বৈশ্বিক শান্তির সঙ্গে যুক্ত করা যায়, সেটিও আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা ৮১তম সাধারণ পরিষদ এমন সময়ে বসছে যখন আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একাধিক সংকট একই সঙ্গে সক্রিয়। ইউক্রেন ও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা, AI-এর দ্রুত বিস্তার, জলবায়ু পরিবর্তন এবং জাতিসংঘ সংস্কারের দাবি—প্রতিটি ইস্যু আলাদাভাবে জটিল; আবার একটির সঙ্গে অন্যটির সরাসরি সম্পর্কও রয়েছে। ফলে নিউইয়র্কের এবারের কূটনৈতিক তৎপরতার সাফল্য শুধু কতগুলো বক্তব্য দেওয়া হলো, তার ওপর নির্ভর করবে না। বাস্তব প্রশ্ন হবে—বিশ্বনেতারা কি যুদ্ধ ও সংঘাতের বাইরে গিয়ে যৌথ সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারবেন, নাকি ভূরাজনৈতিক বিভাজনই বহুপাক্ষিক সহযোগিতার সীমা নির্ধারণ করবে? জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনের সামনে তাই দ্বৈত পরীক্ষা। একদিকে তাৎক্ষণিক সংকট মোকাবিলা, অন্যদিকে ভবিষ্যতের আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার চেষ্টা। যুদ্ধ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিভক্ত বিশ্বে কূটনীতির জন্য নিউইয়র্কের এই সপ্তাহ সেই ব্যবধান কতটা কমাতে পারে—এখন নজর সেদিকেই।
শরীফ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্তে জাতিসংঘের সহযোগিতা চেয়েছে সরকার
ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও জুলাই অভ্যুত্থানের অন্যতম সংগঠক শহিদ শরীফ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডের তদন্ত এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয়ের সহযোগিতা চেয়েছে বাংলাদেশ।
রাষ্ট্র কর্তৃক নির্যাতন বা গুমের শিকার ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের অধিকার নিশ্চিত করলো জাতিসংঘ
রাষ্ট্র কর্তৃক নির্যাতন বা গুমের শিকার ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের অধিকার কার্যকরভাবে নিশ্চিতে CAT এর অনুচ্ছেদ ১৪(১) এ বাংলাদেশ কর্তৃক প্রদত্ত ডিক্লেয়ারেশন প্রত্যাহারের প্রস্তাব জাতিসংঘে গৃহীত
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনই সংকটের একমাত্র কার্যকর সমাধান: প্রধান উপদেষ্টা
প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন যে দশ লক্ষেরও বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থীর মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে তাদের নিজ দেশে প্রত্যাবাসনই এই সংকটের একমাত্র কার্যকর এবং টেকসই সমাধান। তিনি তাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসন সহজতর করার জন্য জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থাকে সক্রিয়ভাবে কাজ চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
ইরানের পরমাণু কর্মসূচি ঘিরে আবার জারি হচ্ছে জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা
ইরানের উপর জাতিসংঘের আরোপ করা যে অর্থনৈতিক ও সামরিক নিষেধাজ্ঞা এক দশক আগে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে একটি চুক্তির পরে তুলে নেওয়া হয়েছিল, সেটি পুনরায় আরোপ করতে যাচ্ছে।