পাঁচ মাস ধরে বেতন বন্ধ, চাকরি নিয়ে শঙ্কিত ইবির ডে লেবাররা

বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক

প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৩৪ পিএম

ইবি প্রতিনিধি 

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে (ইবি) দৈনিক হাজিরার ভিত্তিতে কর্মরত প্রায় ৩শতাধিক অস্থায়ী কর্মচারী (ডে লেবার) বেতন পাচ্ছেন না পাঁচ মাস ধরে। দৈনিক বেতন মাস শেষে দেওয়ার কথা থাকলেও তা না পেয়ে চরম আর্থিক সংকটে পড়েছেন তাঁরা। অভিযোগ উঠেছে ফ্যাসিবাদী সরকারের সময়ে কর্মরতদের পুনর্বাসন এবং অভ্যুত্থান পরবর্তীতে যারা কাজে যোগ দিয়েছিলেন তাদের চাকরি থেকে ছাঁটাই করছে প্রশাসন।

জানা যায়, দৈনিক মজুরিভিত্তিক (ডে-লেবার) ও চুক্তিভিত্তিক কর্মচারী নিয়োগের বৈধতা, প্রয়োজনীয়তা ও আর্থিক প্রভাব খতিয়ে দেখতে গত জুন মাসের ২১তারিখ উপ-উপাচার্য ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক ড. এমতাজ হোসেনকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

অভিযোগ উঠেছে ফ্যাসিবাদী সরকারের সময়ে যাঁরা কাজে যুক্ত হয়েছিলেন, তাঁদের পুনর্বাসন করা হচ্ছে। আর গণ-অভ্যুত্থানের পর যাঁরা কাজে যোগ দিয়েছিলেন তাদের চাকরি থেকে ছাঁটাই করছে প্রশাসন। এই ছাঁটাইয়ের লক্ষ্যে নিয়োগের উৎস এবং ইউজিসির অনুমোদনের অভাবসহ বিভিন্ন অজুহাত দেখানো হচ্ছে।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র ও কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ক্যাম্পাসে প্রায় ৩শতাধিক কর্মচারী দৈনিক হাজিরার ভিত্তিতে কাজ করছেন। এদের মধ্যে আছে নিরাপত্তা প্রহরী, মালী,অফিস সহকারী, ক্লিনার, সুইপার, পিয়ন ও অডিটোরিয়ামসহ বিভিন্ন স্থাপনার পরিচ্ছন্নতা কর্মীগণ। দৈনিক হাজিরার ভিত্তিতে তাদের বেতন ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা।

প্রায় ২৭ বছর বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিচ্ছন্নতা ও পরিচর্যার কাজ করা শহীদুল বলেন, 'গত চার মাস ধরে কোনো টাকা না পাওয়ায় তিনিসহ টিএসসিসি-এর ৩ জন কর্মচারীর চার মাসের বেতন জমেছে ৮২,৪০০ টাকা। তাঁর বকেয়া প্রায় ৩২ হাজার টাকা। তবে সোমবার (৫ অক্টোবর) অফিস থেকে ১০ হাজার টাকা দিয়ে বলেছে আর কাজে আসতে হবে না। তারা আমার বকেয়া টাকা পরিশোধতো করেইনি উল্টো ১০ হাজার টাকা দিয়ে তা লোন হিসেবে লিখে রেখেছে।'

আক্ষেপ করে তিনি বলেন, 'দীর্ঘ সময় কাজ করেও স্থায়ী হওয়ার সুযোগ মেলেনি। প্রশাসন নতুন লোক নিয়োগ দিবে শুনেছি তবে সঠিক জানি না। চাকরিতে না রাখলেও অন্তত কষ্টের পাওনা মিটিয়ে দেওয়া হোক। নাতি নাতনি আছে, বাসায় গেলে তারা মুখের দিকে চেয়ে থাকে। তাদের জন্য কিছুই নিয়ে যেতে পারি না। এই অবস্থা চলতে থাকলে টিএসসিসিতে আত্মহত্যা করা ছাড়া আমার কোন পথ নেই।'

নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক এক কর্মচারী বলেন, 'ফ্যাসিবাদী সরকারের সময় যাঁরা কাজে যোগ দিয়েছিলেন, প্রশাসন এখন তাঁদের সুকৌশলে পুনর্বাসন করছে। অথচ আমরা যারা গণ-অভ্যুত্থানের পর কাজ শুরু করেছি, আমাদের চাকরি থেকে ছাঁটাই করার চক্রান্ত চলছে। ছাঁটাই করার জন্য এখন নিয়োগের উৎস কিংবা ইউজিসির অনুমোদনের অভাবসহ নানা অজুহাত দাঁড় করানো হচ্ছে। মাসের পর মাস কাজ করেও আমরা বেতন পাচ্ছি না, আর উল্টো এখন আমাদের ছাঁটাইয়ের ভয় দেখানো হচ্ছে।'

টিএসসিসির আরেক নারী কর্মচারী হাসি রানি জানান, 'বাড়ি থেকে আসা-যাওয়ায় প্রতিদিন ৪০ টাকা করে খরচ হয়। বেতন না পেয়েও এ খরচ চালিয়ে কাজে আসতে হচ্ছে। এতে সন্তান ও পরিবারের ন্যূনতম চাহিদা মেটানোও কঠিন হয়ে পড়েছে। সংসার চলছে, ধার দেনা করে। প্রশাসনের কাছে বারবার মিনতি করেও কোন লাভ হচ্ছে না।'

পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের একটি দলের তদারকির দায়িত্বে থাকা আলতাফ বলেন, 'তাঁর দলে তিনিসহ ১৩ জন কর্মী আছেন, যাদের মধ্যে ৮ জন নারী ও ৫ জন পুরুষ। তাঁর দলের এক মাসের বেতন বকেয়া আছে। তবে অন্যান্য বিভাগের কর্মীদের পাঁচ থেকে ছয় মাসের বেতন বাকি বলে জানান তিনি।'

এর মধ্যে জানা গেছে কিছু কর্মচারী দুই মাসের বেতন পেয়েছেন। আবার কিছু কর্মচারী জানিয়েছেন তাদের সাপ্তাহিক ভাবে ৫০০ করে ২৫০০ টাকা দেওয়া হয়, যা আগে মাসিক ভাবে দেওয়া হতো। এ সংখ্যাটা ১৪ থেকে ১৫ জন হবে। 

এস্টেট অফিসের প্রধান মোহা: আলাউদ্দিন বলেন, 'নিয়ম অনুযায়ী বিভিন্ন বিভাগের চাহিদা সাপেক্ষে রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের নোটিশের পর সাময়িক অনুমোদন দিয়ে অতীতে এসব নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে দীর্ঘ ২০ থেকে ৩০ বছর ধরে কাজ করা পুরোনো কর্মচারীর পাশাপাশি ২০১৮-১৯ সালের দিকে নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মীও রয়েছেন। এ খাতের জন্য আলাদা কোনো বাজেট বরাদ্দ না থাকায় অন্যান্য খাত থেকে অর্থ সমন্বয় করে তাদের বেতন দিতে হয়; মূলত পরিচ্ছন্নতাকর্মীসহ সীমিত সংখ্যক পদের বাইরে বাকিদের কোনো সুনির্দিষ্ট বাজেট না থাকায় এই সংকটের সৃষ্টি হয়েছে।

​সম্ভবত আগামী সিন্ডিকেট মিটিংয়ে এসব চুক্তিভিত্তিক কর্মচারীদের কাজের ধারাবাহিকতা ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ফয়সালা হতে পারে।

​এ বিষয়ে কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. ইদ্রিস আলী ডে-লেবারদের বেতন আটকে থাকার ব্যাপারে মন্তব্য করবেন না জানিয়ে উপাচার্যের সাথে যোগাযোগ করতে বলেন।

​তবে পরবর্তীতে আবারও জিজ্ঞাসা করলে জানান, 'ডে-লেবারদের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বা নিয়মতান্ত্রিক নিয়োগ হয় না। পূর্বের উপাচার্য সাদা কাগজের দরখাস্তে স্বাক্ষর এবং দৈনন্দিন কাজের প্রয়োজনে লোক নিয়েছিলেন, যা কোনো স্থায়ী চাকরি নয়। তবে এখন ইউজিসির অনুমোদন ব্যতীত এবং নির্দিষ্ট বাজেট ছাড়া নিয়োগ সম্ভব নয়। আর এ সংক্রান্ত নির্দিষ্ট বাজেট না থাকায় সমস্যা তৈরি হয়েছে।'

​এ বিষয়ে আগামী সিন্ডিকেটে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানান কোষাধ্যক্ষ ড. ইদ্রিস আলী

যোগাযোগের ঠিকানা:

বাংলাদেশ বার্তা টুডে

৫৬, চানখারপুল লেন, নাজিমুদ্দিন রোড, বংশাল, ঢাকা-১১০০

ইমেইল: info@bangladeshbartatoday.com