জাতিসংঘে নেতানিয়াহুর ভাষণ ঘিরে কূটনৈতিক বিভাজন: মধ্যপ্রাচ্য সংকটে বিশ্ব কতটা বিভক্ত?
বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৩৭ এএম
বিশেষ প্রতিনিধিঃ সঞ্জয় মজুমদার: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ভাষণ শুরু করার সময় বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরের সাধারণ পরিষদ হলে বহু দেশের প্রতিনিধি প্রতিবাদে বেরিয়ে যান। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওয়াকআউটের ফলে ভাষণের সময় হলের বড় একটি অংশ ফাঁকা হয়ে যায়; একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি ও কয়েকটি ইউরোপীয় দেশের প্রতিনিধিরা হলে অবস্থান করেন।
নেতানিয়াহুর ভাষণটি এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হয়, যখন গাজা যুদ্ধ, ইসরায়েলের সামরিক অভিযান, ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রশ্ন এবং ইরানকে ঘিরে আঞ্চলিক নিরাপত্তা—সবকিছুই আন্তর্জাতিক কূটনীতির কেন্দ্রে রয়েছে। এর আগে অধিবেশনে ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, জর্ডান, সিরিয়া, কাতার ও তুরস্কসহ বিভিন্ন দেশের নেতারা গাজা ও ফিলিস্তিন পরিস্থিতি নিয়ে ইসরায়েলের নীতির সমালোচনা করেছিলেন।
ভাষণের শুরুতেই ওয়াকআউটের প্রতিক্রিয়ায় নেতানিয়াহু প্রতিবাদকারী প্রতিনিধিদের কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেন। পরে তিনি ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপকে আত্মরক্ষার সঙ্গে যুক্ত করে দেশটির নিরাপত্তা ও সন্ত্রাসবিরোধী অবস্থানের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। তিনি গাজায় ইসরায়েলের কর্মকাণ্ড নিয়ে ওঠা গণহত্যার অভিযোগও প্রত্যাখ্যান করেন এবং ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ে ইসরায়েলের উদ্বেগকে পুনরায় সামনে আনেন।
ওয়াকআউটের ঘটনাটি শুধু একটি প্রতিবাদী দৃশ্য ছিল না; এটি মধ্যপ্রাচ্য সংকট নিয়ে জাতিসংঘের সদস্যরাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বিদ্যমান রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বিভাজনের দৃশ্যমান প্রকাশ হয়ে ওঠে। প্রায় ৭০টি দেশের প্রতিনিধিদল প্রতিবাদে অংশ নিয়েছিল বলে আনাদোলু এজেন্সি জানিয়েছে, যদিও বিভিন্ন প্রতিবেদনে অংশগ্রহণকারী দেশের সংখ্যা ও প্রতিনিধিত্বের ধরনে কিছু পার্থক্য রয়েছে। একই সময়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পশ্চিমা প্রতিনিধি হলে থেকে নেতানিয়াহুর বক্তব্য শোনেন।
এই বিভাজনের পেছনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন গাজা যুদ্ধ। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর ইসরায়েল গাজায় ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করে। ইসরায়েল বলছে, তাদের সামরিক কর্মকাণ্ডের মূল লক্ষ্য হামাসের সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস এবং ইসরায়েলি নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। অন্যদিকে ফিলিস্তিনি পক্ষ ও বহু আন্তর্জাতিক সমালোচক গাজায় বেসামরিক মানুষের ওপর যুদ্ধের প্রভাব, মানবিক সংকট এবং আন্তর্জাতিক আইনের সম্ভাব্য লঙ্ঘন নিয়ে গুরুতর অভিযোগ তুলে আসছে। নেতানিয়াহুর জাতিসংঘ ভাষণেও এই দুই বিপরীত বয়ানের সংঘাত স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইরান প্রশ্ন। নেতানিয়াহু তাঁর বক্তব্যে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও আঞ্চলিক হুমকির বিষয়টি জোরালোভাবে তুলে ধরেন। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ এবং আন্তর্জাতিক মহলের একটি অংশ সামরিক সংঘাতের পাশাপাশি কূটনৈতিক সমাধানের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। ফলে ইসরায়েলের নিরাপত্তা উদ্বেগ, ফিলিস্তিনি জনগণের অধিকার এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার প্রশ্ন একই কূটনৈতিক মঞ্চে পরস্পরের সঙ্গে সংঘর্ষে আসছে।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে এমন প্রকাশ্য বিভাজনের রাজনৈতিক তাৎপর্যও রয়েছে। জাতিসংঘের মঞ্চ ঐতিহাসিকভাবে বিরোধী পক্ষগুলোর বক্তব্য তুলে ধরার পাশাপাশি বহুপাক্ষিক কূটনীতির জায়গা হিসেবে কাজ করে। কিন্তু কোনো রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারপ্রধানের বক্তব্যের সময় ব্যাপক ওয়াকআউট হলে সেটি সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে সদস্যরাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক অবস্থানের গভীর পার্থক্যকে দৃশ্যমান করে তোলে। এবারের ঘটনাও সেই বাস্তবতাকেই সামনে এনেছে।
অন্যদিকে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস তাঁর ৮১তম সাধারণ পরিষদের ভাষণে চলমান যুদ্ধের অবসান, মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা এবং ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংকটে দুই-রাষ্ট্র সমাধানের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও কার্যকর করার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেছেন।
নিউইয়র্কের এই ঘটনাকে তাই কেবল একটি ভাষণকে ঘিরে প্রতিবাদ হিসেবে দেখলে মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তর কূটনৈতিক বাস্তবতা পুরোপুরি ধরা পড়ে না। গাজা যুদ্ধ, ইসরায়েলের নিরাপত্তা, ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের প্রশ্ন, ইরানের সঙ্গে সংঘাত এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রয়োগ—সবগুলো ইস্যু এখন একই সঙ্গে জাতিসংঘের কূটনৈতিক আলোচনায় যুক্ত। ফলে সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে, এই তীব্র মতপার্থক্য সত্ত্বেও সদস্যরাষ্ট্রগুলো আদৌ কোনো কার্যকর কূটনৈতিক সমঝোতা, মানবিক উদ্যোগ ও দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সমাধানের পথে এগোতে পারে কি না।
নেতানিয়াহুর ভাষণের সময় খালি হয়ে যাওয়া জাতিসংঘের আসনগুলো সেই প্রশ্নেরই একটি দৃশ্যমান প্রতীক হয়ে রইল—মধ্যপ্রাচ্য সংকটে বিশ্ব এখন শুধু মতভিন্ন নয়, বরং সমাধানের পথ নিয়েও গভীরভাবে বিভক্ত।
আরও পড়ুন
জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনে বাংলাদেশ: বৈশ্বিক আস্থার সংকটে ঢাকার কূটনৈতিক অগ্রাধিকার কী?
মাটিকাটা নৌকা বাইচে চ্যাম্পিয়ন গোবিন্দল গ্রামের ওসমান কসাই বাড়ির নৌকা
ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জে আল-হাসানাহ্ স্কুল অ্যান্ড কলেজ কতৃর্ক আয়োজিত বিজ্ঞান উৎসব ২০২৬ অনুষ্ঠিত