বাংলাবাজারে শেখ মুজিবুর রহমানের ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বিক্রিকে কেন্দ্র করে ইউপিএলের বিক্রয়কেন্দ্রে উত্তেজনা; দুই কর্মীকে পুলিশ ফাঁড়িতে নেওয়ার পর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে

‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বিক্রিতে ইউপিএল কর্মী আটক, উগ্রবাদী বই নিয়ে উঠল প্রশ্ন

বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক

প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:৫২ পিএম

বিশেষ প্রতিনিধিঃ সঞ্জয় মজুমদার।

ঢাকার পুরান বাংলাবাজারে শেখ মুজিবুর রহমানের ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বিক্রিকে কেন্দ্র করে সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর বিকেলে দ্য ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেডের (ইউপিএল) বিক্রয়কেন্দ্রে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। বইটি নিষিদ্ধ দাবি করে কয়েকজন ব্যক্তি বিক্রয়কেন্দ্রের শাটার নামিয়ে দেন এবং ইউপিএলের দুই কর্মীকে পুলিশ ফাঁড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়।

ঘটনার বিষয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা যায়, সোমবার বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে দুই ব্যক্তি ইউপিএলের বাংলাবাজার বিক্রয়কেন্দ্রে গিয়ে ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বইটির বিক্রি নিয়ে আপত্তি জানান। তাঁদের সঙ্গে আরও কয়েকজন যোগ দেন। একপর্যায়ে বিক্রয়কেন্দ্রের শাটার নামিয়ে দেওয়া হয় এবং ইউপিএলের দুই কর্মীকে পুলিশ ফাঁড়িতে নেওয়া হয়। তবে তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা হয়েছে বলে জানা যায়নি।

সূত্রাপুর থানার ওসি মতিউর রহমান সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, ঘটনাস্থলে আসা ব্যক্তিরা নিজেদের স্থানীয় বিএনপির সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে পরিচয় দিয়েছিলেন। তবে তাঁদের দলীয় পরিচয় স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হয়েছে কি না, সে বিষয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে কোনো বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। ফলে এ ঘটনাকে কোনো রাজনৈতিক দলের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত বা নির্দেশ হিসেবে উপস্থাপন করার সুযোগ নেই।

ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ কি বাংলাদেশে নিষিদ্ধ? প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ইউপিএল বইটি বিক্রি করে আসছিল এবং প্রতিষ্ঠানটির বক্তব্য হলো, বইটির ওপর কোনো সরকারি নিষেধাজ্ঞার নোটিশ তাদের দেওয়া হয়নি। ইউপিএল জানিয়েছে, কোনো বই নিষিদ্ধ হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আইনগত সিদ্ধান্ত ও নির্দেশনা অনুসরণ করা হবে।

ইউপিএলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, কোনো বই বিক্রি বন্ধ করার জন্য প্রকাশক বা বিক্রেতার ওপর ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগ গ্রহণযোগ্য নয়। প্রতিষ্ঠানটি আরও বলেছে, আইনগতভাবে নিষিদ্ধ না হওয়া বই বিক্রির ক্ষেত্রে এ ধরনের হস্তক্ষেপ প্রকাশনা শিল্পের জন্য উদ্বেগের বিষয়।

এই ঘটনার পাশাপাশি বাংলাদেশে উগ্রবাদী মতাদর্শের সঙ্গে যুক্ত লেখকদের বই প্রকাশ্য বাজারে পাওয়া যাচ্ছে—এমন অভিযোগও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সাম্প্রতিক একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে আল-কায়েদা ও অন্যান্য জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন লেখক ও প্রচারকের বই বাংলাদেশের বাজারে বিক্রির দাবি করা হয়েছে। প্রতিবেদনে কয়েকটি বইয়ের নামও উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। কোনো লেখক আন্তর্জাতিকভাবে সন্ত্রাসী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বা কোনো সংগঠনের মতাদর্শ প্রচার করেছেন—এ কারণে তাঁর লেখা প্রতিটি বই স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাংলাদেশে নিষিদ্ধ হয়ে যায় না। একইভাবে কোনো বইয়ে সহিংসতা বা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে উসকানি থাকলে সেটি আইনগতভাবে আলাদা বিষয়। তাই প্রতিটি বইয়ের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট আইনি অবস্থান ও বিষয়বস্তু যাচাই করা প্রয়োজন।

এই জায়গাতেই ইউপিএল-কাণ্ডটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি করেছে। যদি কোনো বই নিষিদ্ধ হয়ে থাকে, তাহলে সেই নিষেধাজ্ঞার সরকারি প্রজ্ঞাপন, আদালতের আদেশ বা সংশ্লিষ্ট আইনগত ভিত্তি কী? আর যদি নিষিদ্ধ না হয়ে থাকে, তাহলে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী কীভাবে একটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের বিক্রি বন্ধ করে দিতে পারে? এই দুই প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর ছাড়া ঘটনাটির আইনগত চরিত্র নির্ধারণ কঠিন।

এদিকে চলচ্চিত্র নির্মাতা তানভীর মোকাম্মেল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিযোগ করেছেন, বাংলাদেশ বিমানের ইন-ফ্লাইট বিনোদন ব্যবস্থায় তাঁর ‘লালসালু’ ও ‘চিত্রা নদীর পাড়ে’ চলচ্চিত্র দুটি আর প্রদর্শন করা হচ্ছে না। তিনি এ সিদ্ধান্তের কারণ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তবে বাংলাদেশ বিমানের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা ছাড়া এই ঘটনাকে সরকারি নিষেধাজ্ঞা বা চলচ্চিত্র দুটির ওপর আনুষ্ঠানিক নিষেধাজ্ঞা হিসেবে চূড়ান্তভাবে বর্ণনা করা ঠিক হবে না।

‘লালসালু’ ও ‘চিত্রা নদীর পাড়ে’ বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে পরিচিত দুটি কাজ এবং দুটিই জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছে। কিন্তু বিমান কর্তৃপক্ষের প্রদর্শন তালিকা থেকে কোনো চলচ্চিত্র বাদ দেওয়া এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে চলচ্চিত্র নিষিদ্ধ করা একই বিষয় নয়। এ পার্থক্য সংবাদ প্রতিবেদনে স্পষ্ট রাখা জরুরি।

বাংলাবাজারের ঘটনাটি তাই এখন মূলত তিনটি প্রশ্ন সামনে এনেছে—বই নিষিদ্ধ করার বৈধ প্রক্রিয়া কী, প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের ওপর বেআইনি চাপ প্রয়োগ হলে পুলিশের ভূমিকা কী হওয়া উচিত, এবং উগ্রবাদী প্রচারসামগ্রীর ক্ষেত্রে আইন কীভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে।

একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বইয়ের বৈধতা নির্ধারণের দায়িত্ব কোনো ব্যক্তিগত গোষ্ঠীর হাতে থাকতে পারে না। একইভাবে কোনো বই বা লেখকের বিষয়ে অভিযোগ থাকলে তার আইনগত নিষ্পত্তি হওয়া উচিত নির্দিষ্ট প্রমাণ, আইন এবং যথাযথ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। ইউপিএল-কাণ্ডের পর এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে এই বিষয়গুলোর স্পষ্ট ব্যাখ্যাই সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।

যোগাযোগের ঠিকানা:

বাংলাদেশ বার্তা টুডে

৫৬, চানখারপুল লেন, নাজিমুদ্দিন রোড, বংশাল, ঢাকা-১১০০

ইমেইল: info@bangladeshbartatoday.com