ইথিওপিয়ার রাজধানীতে হামলার অভিযোগ: তিগ্রাই সংঘাত কি আবার জাতীয় যুদ্ধে রূপ নিচ্ছে?
বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ০২ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০২ পিএম
বিশেষ প্রতিনিধিঃ সঞ্জয় মজুমদার, ২ অক্টোবর ২০২৬।
ইথিওপিয়ার রাজধানী আদ্দিস আবাবায় ৩০ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে একাধিক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যাওয়ার পর দেশটির উত্তরাঞ্চলে চলমান তিগ্রাই সংঘাত নতুন মাত্রা পেয়েছে। বিরোধী জোটের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র দাবি করেছে, রাজধানীতে ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে; তবে ওই দাবি স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হয়নি এবং ইথিওপিয়ার কর্তৃপক্ষও বিস্ফোরণের প্রকৃতি সম্পর্কে বিস্তারিত জানায়নি।
বিস্ফোরণের কয়েক ঘণ্টা আগে ইথিওপিয়ার ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড সিকিউরিটি সার্ভিস আদ্দিস আবাবা ও আশপাশের এলাকায় ড্রোন উড্ডয়ন নিষিদ্ধ করে। পরে গোয়েন্দা বিভাগের এক কর্মকর্তা তিনটি পৃথক স্থানে বিস্ফোরণের কথা নিশ্চিত করলেও এগুলো হামলা, নাকি সামরিক মহড়ার অংশ—তা স্পষ্ট করেননি। কূটনৈতিক সূত্র ও স্থানীয় বাসিন্দারা সামরিক সদর দপ্তরের কাছাকাছি বিস্ফোরণের শব্দ শোনার কথা জানিয়েছেন।
ঘটনার মধ্যেই ইথিওপিয়া ও ইরিত্রিয়ার সম্পর্ক আরও খারাপ হয়েছে। ১ অক্টোবর ইথিওপিয়া আদ্দিস আবাবায় থাকা ১০ জন ইরিত্রীয় কূটনীতিককে দেশ ছাড়ার নির্দেশ দেয় এবং ইরিত্রিয়ায় নিজেদের দূতাবাস বন্ধের ঘোষণা দেয়। ইথিওপিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইরিত্রিয়ার বিরুদ্ধে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে বৈরী কর্মকাণ্ড এবং জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি তৈরির অভিযোগ করেছে। ইরিত্রিয়া অভিযোগ অস্বীকার করে পাল্টা সব কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণা দিয়েছে।
এই উত্তেজনার কেন্দ্রে রয়েছে তিগ্রাই পিপলস লিবারেশন ফ্রন্ট বা টিপিএলএফকে ঘিরে নতুন সংঘাত। ২০২০ থেকে ২০২২ সালের ভয়াবহ তিগ্রাই যুদ্ধের অবসান ঘটানো প্রিটোরিয়া শান্তিচুক্তির প্রায় চার বছর পর সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে আবার বড় ধরনের লড়াই শুরু হয়। টিপিএলএফ ও ইথিওপিয়ার কেন্দ্রীয় সরকারের বাহিনী একাধিক এলাকায় সংঘর্ষে জড়িয়েছে। একই সময়ে টিপিএলএফসহ সাতটি সশস্ত্র গোষ্ঠী নিয়ে একটি বিরোধী জোট গঠিত হয়েছে, যারা প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদের সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে।
সংঘাত এখন শুধু তিগ্রাইয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। প্রতিবেশী আফার অঞ্চলেও সরকারি বাহিনী ও বিরোধী পক্ষের মধ্যে লড়াই হয়েছে। সংঘাতের কারণে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও যোগাযোগব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে আফার হয়ে জিবুতির দিকে যাওয়া ইথিওপিয়ার প্রধান বাণিজ্যপথে অস্থিরতা তৈরি হলে দেশের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমেও চাপ পড়তে পারে বলে সংঘাত পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ACLED সতর্ক করেছে।
ইরিত্রিয়ার ভূমিকা নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্যও পরস্পরবিরোধী। ইথিওপিয়ার সামরিক নেতৃত্ব এর আগে ইরিত্রিয়াকে টিপিএলএফকে সহায়তার অভিযোগ করেছে। ইরিত্রিয়া এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। ফলে তিগ্রাইয়ের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের সঙ্গে দুই দেশের সরাসরি বিরোধ যুক্ত হলে পরিস্থিতি আরও বিস্তৃত আঞ্চলিক সংকটে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সংঘাতের সবচেয়ে বড় চাপ পড়ছে সাধারণ মানুষের ওপর। তিগ্রাইয়ের বিভিন্ন এলাকায় যোগাযোগ, ব্যাংকিং ও অন্যান্য মৌলিক সেবা ব্যাহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। আগের যুদ্ধের সময় বাস্তুচ্যুত হয়ে থাকা মানুষদের একটি অংশ নতুন করে নিরাপত্তাহীনতায় পড়েছে। চিকিৎসা সহায়তা সংস্থা MSF জানিয়েছে, সেপ্টেম্বরের ২২ থেকে ২৫ তারিখের মধ্যে তিগ্রাইয়ের বিভিন্ন হাসপাতালে যুদ্ধজনিত আহত মানুষের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
জাতিসংঘ ইতোমধ্যে সংঘাত বন্ধ করে উত্তেজনা কমানো এবং আলোচনায় ফেরার আহ্বান জানিয়েছে। কিন্তু আদ্দিস আবাবা পর্যন্ত বিস্ফোরণের ঘটনা, তিগ্রাই ও আফারে নতুন করে লড়াই এবং ইথিওপিয়া–ইরিত্রিয়ার কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার ঘোষণা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
এখন মূল প্রশ্ন হলো, আদ্দিস আবাবার বিস্ফোরণ সত্যিই বিরোধী বাহিনীর হামলা ছিল কি না এবং থাকলে তারা রাজধানী পর্যন্ত আঘাত হানার সক্ষমতা কতটা অর্জন করেছে। এই প্রশ্নের উত্তর এখনো নিশ্চিত নয়। তবে উত্তরাঞ্চলের যুদ্ধ যদি রাজধানীর নিরাপত্তা, আফার–জিবুতি বাণিজ্যপথ এবং ইরিত্রিয়ার সঙ্গে সরাসরি সামরিক উত্তেজনার সঙ্গে যুক্ত হয়, তাহলে ২০২২ সালের শান্তিচুক্তির পর ইথিওপিয়ার সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা সংকটগুলোর একটি নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করতে পারে।প্রতিবেদনটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাংবাদিকতাগত সতর্কতা হলো “আদ্দিস আবাবায় হামলা হয়েছে” না লিখে “বিস্ফোরণ শোনা গেছে এবং বিরোধী পক্ষ হামলার দাবি করেছে, যা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হয়নি” বলা। এতে নিশ্চিত তথ্য ও পক্ষগুলোর দাবির পার্থক্য পরিষ্কার থাকে।