এলজিইডির ১ কোটি ৫৪ লাখ টাকার সড়ক নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগ, প্রতিবাদ করেও প্রতিকার নেই
বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ০৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:৫০ পিএম
জয়পুরহাট প্রতিনিধি: আব্দুল কাদের
একবার নয়, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগে স্থানীয়রা প্রতিবাদ করে কাজ বন্ধ করেছেন একাধিকবার।নিম্নমানের খোয়া সরিয়েও নেওয়া হয়েছে।কিন্তু কয়েক দিন পর সেই একই ধরনের খোয়া ও অন্যান্য উপকরণ দিয়ে আবারও শুরু হয়েছে সড়ক নির্মাণের কাজ।এমন অভিযোগ উঠেছে জয়পুরহাটের কালাই উপজেলায় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) তত্ত্বাবধানে চলমান একটি সড়ক নির্মাণ প্রকল্পে।
উপজেলার হারুঞ্জা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে উত্তর ভাবকি গুচ্ছগ্রাম পর্যন্ত ১ হাজার ২৪৫ মিটার সড়ক নির্মাণে নিম্নমানের ইটের খোয়া, গুঁড়া ইট,রাবিশ ও মাটিযুক্ত খোয়া ব্যবহারের অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের দাবি, নির্মাণসামগ্রীর মান নিয়ে আপত্তি জানালে কিছু নিম্নমানের খোয়া সরিয়ে নেওয়া হলেও পরে আবার একই ধরনের উপকরণ এনে কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে।এতে এক কোটি ৫৪ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিতব্য সড়কটির স্থায়িত্ব নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও এলজিইডির কর্মকর্তারা অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।তাঁদের দাবি,নিম্নমানের কোনো উপকরণ পাওয়া গেলে তা সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে এবং প্রকল্পের কাজ নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে।
উপজেলা এলজিইডি সূত্রে জানা যায়, হারুঞ্জা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে উত্তর ভাবকি গুচ্ছগ্রাম পর্যন্ত ১ হাজার ২৪৫ মিটার সড়কটি পিচঢালাইয়ের উপযোগী করতে এ প্রকল্প নেওয়া হয়েছে।২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রকল্পটির নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে ১ কোটি ৫৪ লাখ টাকা।
জয়পুরহাটের রাবা কনস্ট্রাকশন নামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজটি বাস্তবায়ন করছে।গত বছরের মে মাসে কাজ শুরু হয় এবং চলতি বছরের মার্চে শেষ হওয়ার কথা ছিল।নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় পরে আরও তিন মাস সময় বাড়ানো হয়েছে বলে জানানো হয়।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সড়কের বিভিন্ন অংশে শ্রমিকেরা নির্মাণকাজ করছেন।রাস্তার পাশে স্তূপ করে রাখা হয়েছে ইটের খোয়া।এসব খোয়ার মধ্যে ভাঙা ও মাটিযুক্ত খোয়ার পাশাপাশি পোড়ামাটির মতো দেখতে ইটের টুকরাও রয়েছে।কোথাও কোথাও বড় আকারের ইটের টুকরা দেখা যায়।নির্ধারিত মান অনুযায়ী প্রায় ৫০ মিলিমিটার বা ২ ইঞ্চি আকারের ইটের খোয়া ব্যবহারের কথা থাকলেও কোনো কোনো স্থানে ৩ থেকে ৪ ইঞ্চি আকারের বড় ইটের টুকরা ব্যবহার করা হচ্ছে।এসব খোয়া দিয়ে সড়কের মেকাডম বা বেজ তৈরির কাজও করা হয়েছে।স্থানীয়দের অভিযোগ,প্রকল্পের শিডিউলে মাটি ভরাট,বেড প্রস্তুত,বক্স কাটিং,এজিং, ক্যাম্বারিং,বালু ভরাট,ব্রিক ফ্ল্যাট সলিং, হেরিং বোন বন্ড ও প্যালাসাইডিংসহ বিভিন্ন কাজের কথা উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে সেগুলো যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে না।নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের আগে গুণগতমান পরীক্ষা করে তা নিশ্চিত করার কথা থাকলেও নমুনা পরীক্ষার প্রতিবেদন নথিতে সংরক্ষণ করা হয়েছে কি না,তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয় বাসিন্দারা আরও অভিযোগ করেন, সড়কের বেড তৈরিতে ১,২ ও ৩ নম্বর ইটের খোয়ার পাশাপাশি গড়াই ইটও ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব ইট সামান্য চাপ দিলেই গুঁড়া হয়ে যাচ্ছে। কোথাও কোথাও ইটের গুঁড়া ও রাবিশজাতীয় উপকরণও মিশিয়ে দেওয়া হচ্ছে বলে তাঁদের অভিযোগ।এ ছাড়া সড়কের কাজে ছয় ইঞ্চি বালু দেওয়ার কথা থাকলেও কোনো কোনো অংশে মাত্র এক ইঞ্চির মতো বালু দেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করেন তাঁরা।
স্থানীয় বাসিন্দা রুবেল বলেন-কাজের মান নিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীকে একাধিকবার জানানো হয়েছে।কিন্তু অভিযোগের পরও কাজ বন্ধ হয়নি। তাঁর অভিযোগ,নিম্নমানের ইটের সঙ্গে রাবিশ ব্যবহার করা হচ্ছে এবং প্রকৌশলীর উপস্থিতিতেই এসব উপকরণ দিয়ে কাজ করা হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা সিরাজুল ইসলাম বলেন, ঠিকাদার তাঁদের জানান,প্রকল্পের প্রাক্কলনে ৩ নম্বর ইট ব্যবহারের কথা রয়েছে। কিন্তু ৩ নম্বর ইটের পাশাপাশি গড়াই ইটও ব্যবহার করা হচ্ছে।এসব ইট দিয়ে কাজ করলে রাস্তা বেশি দিন টিকবে না।কিন্তু সরেজমিনে এসে কাজটি দেখেছেন কি না, আমরা জানি না।
উত্তর ভাবকি গ্রামের বাসিন্দা মহিউদ্দিন বলেন, নিম্নমানের ইট ব্যবহার না করার জন্য ঠিকাদারকে একাধিকবার বলা হয়েছে।এমনকি নিম্নমানের ইটবোঝাই একটি ট্রাক ফিরিয়েও দেয়া হয়েছিল। এরপরও একই ধরনের উপকরণ দিয়ে কাজ চলছে।এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তাদের ভূমিকা তদন্তের দাবি জানান তিনি।
স্থানীয় সোনিয়া আক্তার বলেন,আমরা ৪০ বছর ধরে এখানে বসবাস করছি।এখন পর্যন্ত কোনো রাস্তা হয়নি।এতো বছর পর রাস্তা হচ্ছে, তাও কাজের মান খুব নিম্ন। ইটগুলো সব ভাঙা।
সাইদুল ইসলাম বলেন,এক কোটি টাকার বেশি ব্যয়ের সড়কে খুবই নিম্নমানের খোয়া দিয়ে রাস্তার কাজ করা হচ্ছে। এমন নিম্নমানের খোয়া ব্যবহার করা হলে রাস্তার স্থায়িত্ব বেশি দিন থাকবে না। নির্মাণের পর দ্রুত রাস্তা নষ্ট হলে আবার জনগণের অর্থে সংস্কার করবে তারা।
এ বিষয়ে রাবা কনস্ট্রাকশনের স্বত্বাধিকারী আব্দুল কাইয়ুম বলেন,তিনি কাজ পাওয়ার পর তা জাহেদ হাসানের কাছে বিক্রি করে দিয়েছি। তিনি সাব- ঠিকাদার হিসেবে জাহেদ হাসান কাজ করছেন, তাই কাজের ভালো-মন্দের পুরো দায় তাঁর।
সাব-ঠিকাদার জাহেদ হাসান জানান, ‘পিরোজপুর থেকে এসে এই কাজ করতে গিয়ে শুরুতে ঠকেছি। লাভের আশায় কাজ নিয়ে বিপদে পড়েছি। যেসব জায়গায় বেশি খারাপ সামগ্রী দেওয়া হয়েছে, সেখান থেকে খোয়া তুলে নেওয়া হবে।’
দায়িত্বপ্রাপ্ত উপসহকারী প্রকৌশলী আবু জাফর বলেন,স্থানীয়দের অভিযোগ সত্য। আমরা সবসময় চেষ্টা করছি যাতে কাজ ভালো হয়।
উপজেলা প্রকৌশলী সুমন কুমার দেবনাথ জানান, অভিযোগ পেয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। বর্তমানে সড়কের কাজ বন্ধ রয়েছে। নিম্নমানের সামগ্রী অপসারণ করে উন্নতমানের সামগ্রী ব্যবহারের জন্য ঠিকাদারকে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দেওয়া হয়েছে।