মঙ্গাকবলিত নারীদের কর্মসংস্থানে বাধা পাকা সড়ক!

বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক

প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:০৯ পিএম

‎মোঃ শফিকুজ্জামান সোহেল, গঙ্গাচড়া,‎রংপুর প্রতিনিধি:

‎তিস্তা নদীর ভাঙন, বন্যা আর মঙ্গার সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করে বেঁচে থাকা রংপুরের গঙ্গাচড়ার চরাঞ্চলের দরিদ্র নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিতে নেওয়া হয়েছে সরকারি প্রকল্প। অথচ সেই প্রকল্পের নিয়োগেই তাঁদের বাদ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) পল্লী সড়ক রক্ষণাবেক্ষণ ও কর্মসংস্থান প্রকল্পের (আরআরএমইপি) আওতায় নোহালী ইউনিয়নে নারী কর্মী নিয়োগে অনিয়ম ও বৈষম্যের অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয়রা। তাঁদের দাবি, পর্যাপ্ত প্রচার না চালানো এবং চরাঞ্চলে পাকা সড়ক না থাকার অজুহাতে প্রকল্পের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে সবচেয়ে অসহায় নারীদের।

‎স্থানীয়দের অভিযোগ, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে চরাঞ্চলের নারীদের বাদ দেওয়ার কোনো সুস্পষ্ট নির্দেশনা না থাকলেও বাস্তবে তাঁদের আবেদন ও নিয়োগের সুযোগ দেওয়া হয়নি। এতে সরকারি প্রকল্পের সুফল থেকে বঞ্চিত হয়েছেন নদীভাঙনকবলিত এলাকার দরিদ্র নারীরা।

‎জানা গেছে, গঙ্গাচড়া উপজেলার নয়টি ইউনিয়নের মধ্যে সাতটিই তিস্তা নদী কবলিত। এসব ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলে বসবাসকারী মানুষের প্রধান সংকট নদীভাঙন, বন্যা ও কর্মসংস্থানের অভাব। বিশেষ করে নারীদের আয়ের সুযোগ অত্যন্ত সীমিত। এমন বাস্তবতায় সরকারি কর্মসংস্থান প্রকল্পটি তাঁদের জীবনে কিছুটা স্বস্তি ফেরানোর সুযোগ তৈরি করলেও নোহালী ইউনিয়নে নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে দেখা দিয়েছে বিতর্ক।

‎উপজেলা প্রকৌশলীর কার্যালয় থেকে গত ১৭ অক্টোবর প্রকাশিত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে প্রকল্পের আওতায় প্রতিটি ইউনিয়নে ১০ জন করে নারী কর্মী নিয়োগের কথা বলা হয়। বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, প্রার্থীর বয়স ২৫ বছরের বেশি ও ৪৫ বছরের কম হতে হবে। পাশাপাশি ভূমিহীন অথবা শূন্য দশমিক ৫ একরের কম জমির মালিক এবং শারীরিকভাবে কাজ করতে সক্ষম নারীরা আবেদন করতে পারবেন। দরিদ্র, বিধবা, স্বামী পরিত্যক্তা ও পরিবারপ্রধান নারীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়।

‎কিন্তু স্থানীয় নারীদের অভিযোগ, বিজ্ঞপ্তির শর্ত পূরণ করলেও চরাঞ্চলের বাসিন্দা হওয়ায় তাঁরা নিয়োগের সুযোগ পাননি।

‎তিস্তা নদী কবলিত চরাঞ্চলের মিনার বাজার গ্রামের আয়শা খাতুন বলেন, ‘আমরা চরাঞ্চলের মানুষ। সারা বছর অভাব-অনটনের সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকি। আমাদের মতো অসহায় নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ দিতেই সরকার প্রকল্প চালু করেছে। অথচ আমরাই সেই সুযোগ পেলাম না। চরাঞ্চলে পাকা রাস্তা নেই বলে যদি আমাদের নিয়োগ না দেওয়া হয়, তাহলে আমরা কীভাবে বাঁচব? আমরা কি এই দেশের নাগরিক নই? সরকারি প্রকল্পে আমাদেরও সমান অধিকার রয়েছে। আমরা এই বৈষম্যের তদন্ত ও পুনরায় নিয়োগ চাই।’

‎নিয়োগ প্রক্রিয়ায় প্রচারের ঘাটতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা। নোহালী ইউনিয়নের বাসিন্দা শাহানা খাতুন বলেন, ইউনিয়নের নয়টি ওয়ার্ডের মধ্যে মাত্র দুটি ওয়ার্ডে মাইকিং করা হয়েছে। ফলে অনেক নারী নিয়োগের বিষয়টি জানতেই পারেননি। প্রচারের সময় বয়সসীমা ২৫ থেকে ৪০ বছর বলা হলেও বিজ্ঞপ্তিতে ৪৫ বছর পর্যন্ত আবেদনের সুযোগ ছিল। এতে অনেক যোগ্য নারী আবেদন করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।

‎একই ইউনিয়নের মজিদা বেগম বলেন, সব ওয়ার্ডে সমানভাবে প্রচার চালানো উচিত ছিল। লটারিতে নির্বাচিত ১০ জনের মধ্যে একই ওয়ার্ডের চারজন থাকায় বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। প্রকৃত দরিদ্র ও অসহায় নারীরা নিয়োগ পেয়েছেন কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

‎এ বিষয়ে নোহালী ইউনিয়ন পরিষদের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য রেজাউল হক বলেন, নারী কর্মী নিয়োগের বিষয়ে তিনি অবগত ছিলেন না। সব ওয়ার্ডের জনপ্রতিনিধিদের জানিয়ে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণার মাধ্যমে নিয়োগ কার্যক্রম পরিচালনা করা উচিত ছিল।

‎অন্যদিকে, চরাঞ্চলের নারীদের নিয়োগ না দেওয়ার কারণ হিসেবে পাকা সড়ক না থাকার কথা জানিয়েছেন নোহালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আশরাফ আলী। তিনি বলেন, চরাঞ্চলে পাকা রাস্তা নেই। এ কারণে সেখানকার নারীদের নিয়োগ দেওয়া হয়নি।

‎নিয়োগ কার্যক্রমে উপসহকারী প্রকৌশলী মামুন মিয়া, কমিউনিটি অর্গানাইজার মো. ফিরোজ মামুন এবং উপজেলা প্রকৌশলীর কার্যালয়ের সার্ভেয়ার মো. পারভেজ মাহমুদ উপস্থিত ছিলেন। এদিকে নিয়োগ কার্যক্রম নিয়ে সাংবাদিকেরা প্রশ্ন করলে সার্ভেয়ার পারভেজ মাহমুদের বিরুদ্ধে তাঁদের লাঞ্ছিত করার অভিযোগ উঠেছে।

‎উপজেলা প্রকৌশলী জয়া স্যানাল বলেন, সংশ্লিষ্ট পরিপত্রে চরাঞ্চলের নারীদের নিয়োগ দেওয়ার বিষয়ে উল্লেখ নেই। ওই এলাকায় দুই কিলোমিটারের মধ্যে কোনো সড়ক নেই। তবে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির শর্তে চরাঞ্চলের নারীদের বাদ দেওয়ার বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা না থাকার কথা জানিয়ে এ সিদ্ধান্তের নীতিগত ভিত্তি জানতে চাইলে তিনি পরে কার্যালয়ে গিয়ে কথা বলার অনুরোধ জানান।

‎এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জেসমিন আক্তার বলেন, নারী কর্মী নিয়োগের বিষয়টি এলজিইডি দেখভাল করে। এ বিষয়ে কেউ লিখিত অভিযোগ দিলে তদন্ত করা হবে।

‎নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে চরাঞ্চলের নারীদের বাদ দেওয়ার সুস্পষ্ট কোনো শর্ত না থাকা সত্ত্বেও পাকা সড়ক না থাকার কারণ দেখিয়ে তাঁদের নিয়োগের বাইরে রাখার সিদ্ধান্ত কতটা বিধিসম্মত, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে প্রচার-প্রচারণা, যোগ্যতা যাচাই ও নির্বাচনের পুরো বিষয়টি তদন্ত করে প্রকৃত সুবিধাবঞ্চিত নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।

যোগাযোগের ঠিকানা:

বাংলাদেশ বার্তা টুডে

৫৬, চানখারপুল লেন, নাজিমুদ্দিন রোড, বংশাল, ঢাকা-১১০০

ইমেইল: info@bangladeshbartatoday.com