সীমান্ত পেরিয়ে আসা সেই বাঘের খোঁজ ৫ দিনেও মেলেনি, আতঙ্কে সীমান্তবাসি
বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:২৩ এএম
হাসানুজ্জামান হাসান, লালমনিরহাট:
সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে তিনজনকে আহত করা সেই চিতা বাঘটিকে পাঁচ দিনেও খুঁজে পাওয়া যায়নি। সর্বশেষ সোমবার (২৬ অক্টোবর) রাতে লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার সিঙ্গিমারি এলাকায় কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা বাঘটিকে দেখতে পেয়েছেন বলে দাবি করেন। এই খবরে উপজেলার আমঝোল ও সিঙ্গিমারি সীমান্তসহ আশপাশের এলাকায় আতঙ্ক আরো ছড়িয়ে পড়ে। বাঘের ভয়ে রাতে ঘুমহীন সময় কাটান সাধারণ মানুষ।
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) এলাকাবাসী জানায়, সোমবার রাতে সিঙ্গিমারি এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা বাঘটিকে ঘোরাফেরা করতে দেখেছেন বলে জানান। এ খবর দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়লে পুরো এলাকায় আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। বাঘটি যাতে লোকালয়ে ঢুকে মানুষের ক্ষতি করতে না পারে, সেজন্য গ্রামের যুবকরা লাঠি ও টর্চলাইট নিয়ে সারারাত পাহারা দিয়েছেন।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) দুপুরে গাজীপুরের সাফারি পার্কের ভেটেরিনারি চিকিৎসক ডা. হাতেম সাজ্জাত মো. জুলকার নাইন বলেন, “সিঙ্গিমারিতে বাঘ দেখার খবর পাওয়ার পরপরই সেখানে বিশেষ টিম পাঠানো হয়েছে। ড্রোন ও থার্মাল ইমেজিং প্রযুক্তির ব্যবহারের পাশাপাশি স্থানীয়দের সহায়তায় তল্লাশি অভিযান আরো জোরদার করা হয়েছে। বন বিভাগ ও বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা দলের সদস্যরা ঘটনাস্থলে সার্বক্ষণিক অবস্থান করছেন।”
প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বিজিবি, পুলিশ ও বন বিভাগের যৌথ টহল অব্যাহত রয়েছে। এলাকাবাসীকে অহেতুক আতঙ্কিত না হয়ে সতর্ক থাকার এবং সন্ধ্যার পর একা চলাচল না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, বাঘ উদ্ধারের এই অভিযানে কৃষকদের ফসলি জমির যে ক্ষতি হয়েছে, তা তালিকাভুক্ত করে স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে যথাযথ সহায়তার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
এলাকাবাসী জানায়, গত রবিবার (২৫ অক্টোবর) বিকেলে উপজেলার গোতামারী ইউনিয়নের আমঝোল সীমান্তের ৯০৫ নম্বর আন্তর্জাতিক পিলারসংলগ্ন এলাকায় বাঘের আক্রমণে এক নারীসহ তিনজন আহত হন। আহতরা হলেন- আমঝোল গ্রামের শরিফা বেগম (৩৪), নজরুল ইসলাম (৪৩) ও আফসার আলী (৪০)। শরিফা বেগম ধানক্ষেতে ছাগল আনতে গেলে বাঘটি তার ওপর আক্রমণ করে; তাকে বাঁচাতে গিয়ে অন্য দুজনও আহত হন।
ঘটনার পর থেকেই স্থানীয় বাসিন্দারা এলাকাটি ঘিরে রাখেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিজিবির পক্ষ থেকে মাইকিং করে এলাকাবাসীকে সতর্ক করা হয় এবং নিরাপত্তার স্বার্থে ফাঁকা গুলি ছোড়া হয়। রবিবার মধ্যরাতে ড্রোনের ক্যামেরায় সীমান্তের জঙ্গলে বাঘটি দেখা গেলেও শেষ রাতের দিকে তা আওতার বাইরে চলে যায়। এরপর সোমবার রাতে সিঙ্গিমারিতে নতুন করে বাঘ দেখার পর পুরো অঞ্চলেই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
লালমনিরহাট ১৫ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মেহেদী ইমাম জানান, বাঘটিকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করার সর্বাত্মক চেষ্টা চালানো হচ্ছে। তিনি সবাইকে আতঙ্কিত না হয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।
বিভাগীয় বন ও সামাজিক বন বিভাগের কর্মকর্তা নুর ইসলাম মোবাইলে বলেন, “কয়েকটি স্থানে বাঘের চলাচলের চিহ্ন বা পদছাপ পাওয়া গেছে। ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত মানুষের উপস্থিতি ও কৌতূহলী ভিড়ের কারণে বাঘটি ভয় পেয়ে অন্য কোনো নিরাপদ স্থানে বা বনাঞ্চলে সরে গিয়ে থাকতে পারে।”
শুক্রবার হাতীবান্ধা উপজেলা নির্বাহী অফিসার দীপ জন মিত্র জানান, গত ৫ দিন ধরে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে অভিযান চালিয়েও বাঘের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। যেহেতু, দীর্ঘ এই তল্লাশিতে বাঘের কোনো উপস্থিতি বা অস্তিত্ব নিশ্চিত করা যায়নি, সে কারণে বন বিভাগের কর্মকর্তা ও যে দুটি বিশেষজ্ঞ টিম মাঠপর্যায়ে কাজ করছিল, তারা বৃহস্পতিবার তাদের কার্যক্রম শেষ করে চলে গেছেন।
তিনি জানান, গত কয়েকদিন ধরে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় জনগণের মধ্যে কিছুটা আতঙ্ক বিরাজ করছিল, তাদেরক ইতোমধ্যে বিশেষভাবে সতর্ক করা হয়েছে। সাধারণ মানুষের মনে স্বস্তি ফেরাতে এবং তাদের সচেতন করতে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন এলাকায় মাইকিং করা হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, যদি কেউ বাঘের বা অন্য কোনো বন্যপ্রাণীর কোনো ধরনের পায়ের ছাপ বা সন্দেহজনক চিহ্ন দেখতে পান, তবে যেন বিন্দুমাত্র আতঙ্কিত না হয়ে দ্রুত উপজেলা প্রশাসনকে বিষয়টি অবগত করেন।
সীমান্তবাসীর নিরাপত্তা নিয়ে তিনি বলেন, সীমান্তবাসীর সুরক্ষায় বিজিবি (বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ) সব সময় তাদের টহল কার্যক্রম অত্যন্ত কঠোরভাবে অব্যাহত রেখেছে। যে কারণে সীমান্তবাসীর চিন্তার বা আতঙ্কের কোনো কারণ নেই। বর্তমানে পুরো এলাকা সম্পূর্ণ নিরাপদ, স্বাভাবিক ও আশ্বস্তকর পরিস্থিতিতে রয়েছে।