মিথ্যার কারখানা, গুজবের মহামারি: সত্যের সংকটে সমাজ ও রাষ্ট্র

বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক

প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৩২ পিএম

মিথ্যা শুধু ব্যক্তির চরিত্রকে কলুষিত করে না, কখনো কখনো বিপন্ন করে সমাজের শান্তি, রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা ও মানুষের পারস্পরিক বিশ্বাস। আর গুজব এমন এক সামাজিক ব্যাধি, যার সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে মুহূর্তেই; কিন্তু তার ক্ষত সারতে লেগে যায় বছরের পর বছর। মিথ্যাচার, অপপ্রচার ও গুজবের সম্মিলিত প্রভাবে তৈরি হয় সন্দেহ, বিভেদ, বিদ্বেষ ও সহিংসতার পরিবেশ। সত্যের সবচেয়ে বড় শক্তি তার নির্ভরযোগ্যতা, অথচ মিথ্যার বিপজ্জনক শক্তি তার পুনরাবৃত্তি ও প্রচারের কৌশলে।

সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করতে তথ্য-প্রমাণের প্রয়োজন হয়, কিন্তু মিথ্যা অনেক সময় প্রমাণ ছাড়াই মানুষের আবেগ, ভয় ও পূর্বধারণাকে পুঁজি করে ছড়িয়ে পড়ে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাষায়, ‘মিথ্যারও মাহাত্ম্য আছে।’ কথাটির তাৎপর্য এখানেই—পরিকল্পিতভাবে প্রচারিত মিথ্যা কখনো কখনো মানুষের কাছে সত্যের চেয়েও বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে। তবে কোনো মিথ্যা বারবার প্রচারিত হলেই তা সত্য হয়ে যায় না; বরং মানুষের বিচারবোধ দুর্বল হলে মিথ্যা সাময়িকভাবে সত্যের আসন দখল করে।

ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিল, ক্ষমতা দখল, প্রতিপক্ষকে ঘায়েল, সাম্প্রদায়িক বিভাজন সৃষ্টি এবং জনমত নিয়ন্ত্রণে গুজবকে বারবার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। নাৎসি জার্মানির প্রচারমন্ত্রী জোসেফ গোয়েবলসের নামের সঙ্গে মিথ্যার পুনরাবৃত্তির যে কৌশলটি বহুল আলোচিত, তা আধুনিক প্রচারযুদ্ধের একটি পরিচিত দৃষ্টান্ত। আজ সেই কৌশল আরও শক্তিশালী হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটাল প্রযুক্তির বিস্তারে।

বাংলাদেশেও গুজবের ভয়াবহ পরিণতির দৃষ্টান্ত রয়েছে। পদ্মা সেতু নির্মাণে মানুষের মাথা লাগবে—এমন ভিত্তিহীন গুজব ছড়িয়ে পড়ার পর ২০১৯ সালে রাজধানীর বাড্ডায় তাসলিমা বেগম রেনুকে ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে হত্যা করা হয়। একটি মিথ্যা সংবাদ কীভাবে একজন নিরপরাধ মানুষের জীবন কেড়ে নিতে পারে, এই ঘটনা তার নির্মম উদাহরণ। এখানে গুজব কেবল তথ্যগত বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেনি, মানুষের বিবেক ও বিচারবোধকেও পরাজিত করেছিল।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসেও গুজব ও অপপ্রচারের ব্যবহার নতুন নয়। ভাষা আন্দোলন, যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, রবীন্দ্রচর্চা, আইয়ুববিরোধী আন্দোলন এবং স্বাধীনতাপরবর্তী রাজনীতিকে ঘিরে বিভিন্ন সময়ে নানা ধরনের প্রচার ও পাল্টাপ্রচার দেখা গেছে। কখনো ধর্মীয় অনুভূতিকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে, কখনো জাতীয় পরিচয় ও সার্বভৌমত্ব নিয়ে ভয় ছড়ানো হয়েছে। ১৯৯১ সালের নির্বাচনকে সামনে রেখে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে দেশে আজানের পরিবর্তে উলুধ্বনি শোনা যাবে—এমন বক্তব্যের কথাও বাংলাদেশের রাজনৈতিক আলোচনায় বহুল উদ্ধৃত। এসব উদাহরণ দেখায়, রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় তথ্যের বদলে ভয় ও আবেগকে ব্যবহার করার প্রবণতা কতটা পুরোনো।

তবে গুজবের দায় কোনো একটি রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ক্ষমতাসীন, বিরোধী কিংবা স্বার্থসংশ্লিষ্ট যেকোনো পক্ষই যখন তথ্য বিকৃত করে, অর্ধসত্য প্রচার করে অথবা প্রতিপক্ষকে হেয় করতে মিথ্যার আশ্রয় নেয়, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো সমাজ। রাজনৈতিক মতপার্থক্য গণতন্ত্রের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য; কিন্তু মতপার্থক্যকে বিদ্বেষে এবং সমালোচনাকে মিথ্যাচারে রূপান্তর করা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির জন্য বিপজ্জনক।

২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও বাংলাদেশে বিভিন্ন ঘটনা ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর তথ্য, পুরোনো ছবি ও ভিডিও নতুন ঘটনার নামে প্রচার, ভুয়া উদ্ধৃতি এবং সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টিকারী পোস্ট ছড়িয়ে পড়ার প্রবণতা আলোচনায় এসেছে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ঘটনা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কিংবা রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্য—যেকোনো সংবেদনশীল বিষয়কে কেন্দ্র করে সত্য-মিথ্যা যাচাই না করেই তথ্য ছড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলতে পারে। কোনো ঘটনার প্রকৃত চিত্র জানতে হলে আবেগনির্ভর পোস্ট নয়, নির্ভরযোগ্য তথ্য ও একাধিক সূত্রের ওপর নির্ভর করা জরুরি।

প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে গুজবের ধরনও পাল্টেছে। ছবি সম্পাদনা, পুরোনো ভিডিওকে সাম্প্রতিক ঘটনার বলে প্রচার, ভুয়া সংবাদমাধ্যমের ফটোকার্ড, কৃত্রিম কণ্ঠস্বর এবং ডিপফেক ভিডিওর মাধ্যমে এখন এমন সব বিভ্রান্তিকর উপাদান তৈরি করা সম্ভব, যা সাধারণ মানুষের পক্ষে সহজে শনাক্ত করা কঠিন। ফলে একটি অসত্য তথ্য মুহূর্তের মধ্যে হাজারো মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। অনেকেই যাচাই না করেই শেয়ার করছেন; কেউ করছেন রাজনৈতিক আবেগে, কেউ ব্যক্তিগত বিদ্বেষে, আবার কেউ নিছক কৌতূহলবশত।

গুজব ছড়ানোর পেছনে মানুষের মনস্তত্ত্বও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মানুষ অনেক সময় নিজের বিশ্বাস ও পূর্বধারণার সঙ্গে মিলে যায়—এমন তথ্য সহজে গ্রহণ করে। ভয়, ক্ষোভ, ধর্মীয় অনুভূতি ও রাজনৈতিক আনুগত্যও যাচাই-বাছাইয়ের ক্ষমতাকে দুর্বল করে দিতে পারে। তাই গুজব প্রতিরোধ শুধু প্রযুক্তিগত বিষয় নয়; এটি শিক্ষা, সচেতনতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধেরও প্রশ্ন।

এ ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংবাদ প্রকাশের আগে তথ্যের সত্যতা যাচাই, একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র ব্যবহার, ছবি ও ভিডিওর উৎস অনুসন্ধান এবং ভুল তথ্য প্রকাশিত হলে দ্রুত সংশোধন করা জরুরি। প্রতিটি সংবাদমাধ্যমে ফ্যাক্টচেকিং বা তথ্য যাচাইয়ের কার্যকর ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। একই সঙ্গে পাঠক ও দর্শকের মধ্যে গণমাধ্যম সাক্ষরতা বাড়াতে হবে, যাতে মানুষ সংবাদ, মতামত, বিজ্ঞাপন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারের পার্থক্য বুঝতে পারে।

সরকারেরও দায়িত্ব রয়েছে। গুজব প্রতিরোধের নামে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত না করে, প্রমাণভিত্তিক তদন্ত, স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশ এবং আইনানুগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্ল্যাটফর্মগুলোকে ভুয়া তথ্য ও বিদ্বেষমূলক প্রচার শনাক্তে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে। আর নাগরিক হিসেবে আমাদেরও মনে রাখতে হবে—যাচাই না করে কোনো তথ্য শেয়ার করা মানে অনিচ্ছায় হলেও গুজবের বিস্তারে ভূমিকা রাখা।

রাষ্ট্র ও সমাজের স্থিতিশীলতা রক্ষায় সত্যের বিকল্প নেই। রাজনৈতিক মতভেদ থাকবে, সমালোচনা থাকবে, বিতর্কও থাকবে; কিন্তু তা হতে হবে তথ্য, যুক্তি ও দায়িত্বশীলতার ভিত্তিতে। কারণ একটি মিথ্যা মুহূর্তের জন্য মানুষকে উত্তেজিত করতে পারে, কিন্তু সেই মিথ্যার কারণে সৃষ্ট ক্ষতি একটি পরিবার, একটি সম্প্রদায় কিংবা একটি রাষ্ট্রকে দীর্ঘদিন বহন করতে হতে পারে।

অতএব, গুজবের বিরুদ্ধে লড়াই কেবল সরকারের নয়, গণমাধ্যমের নয়, কোনো বিশেষ রাজনৈতিক পক্ষেরও নয়—এটি আমাদের সবার দায়িত্ব। মনে রাখতে হবে, মিথ্যা ছড়াতে একটি মুহূর্তই যথেষ্ট, কিন্তু সত্য প্রতিষ্ঠা করতে প্রয়োজন ধৈর্য, সাহস ও নিরলস প্রচেষ্টা। যে সমাজ সত্যকে সম্মান করতে শেখে, গুজবের বিষ সেই সমাজকে সহজে গ্রাস করতে পারে না।

লেখক: মোহাম্মদ হাসান, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

যোগাযোগের ঠিকানা:

বাংলাদেশ বার্তা টুডে

৫৬, চানখারপুল লেন, নাজিমুদ্দিন রোড, বংশাল, ঢাকা-১১০০

ইমেইল: info@bangladeshbartatoday.com